স্মৃতি: প্রকাশিত রবীন্দ্র-কবিতা।
মুরলী আছে? মুরলী আছে?” খোঁজ করছেন কথাশিল্পী।
আর্য পাবলিশিং-এর পরিচালক শশাঙ্কমোহন চৌধুরী হঠাৎ খেয়াল করেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পকেটে উঁকি দিচ্ছে একটি রিভলভার। সদ্য লাইসেন্স পাওয়া ওই আগ্নেয়াস্ত্রটি নিয়ে লেখক তখন বেশ কিছু দিন ঘোরাঘুরি করছিলেন। সেদিন তিনি এসেছিলেন বরদা এজেন্সি অর্থাৎ ‘কালি-কলম’ পত্রিকার অফিসে, কিন্তু ভুল করে ঢুকেছিলেন পাশের আর্য পাবলিশিং-এ। তবে শরৎচন্দ্র ক্রোধ বা প্রতিশোধ জাতীয় কোনও মানসিকতা নিয়ে সেদিন আসেননি। তাঁর অন্য পকেটেই ছিল ‘সতী’ গল্পের পাণ্ডুলিপি, ‘কালি-কলম’কে দেবেন। কিন্তু কোথায় মুরলী! অগত্যা সেই পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি চলে গেলেন ভবানীপুরে, ‘বঙ্গবাণী’-তে।
ওদিকে মুরলীধর বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সকালবেলার ট্রেনে গিয়ে পৌঁছেছেন পানিত্রাস, শরৎচন্দ্রের ভিটেতে। গিয়ে শোনেন, শরৎবাবু সকালবেলার ট্রেনে কলকাতায় গিয়েছেন। তা হলে দেখা হবে না! ‘সতী’ গল্প প্রকাশের সুযোগ হারাল ‘কালি-কলম’।
জন্মের প্রথম শুভক্ষণ
১৩৩৩ বঙ্গাব্দের কথা, বৈশাখের এক আলো-ঝলমলে দিনে ‘কালি-কলম’ প্রথম প্রকাশিত হয়। ডাবল ক্রাউন সাইজ়। সম্পাদক এক সঙ্গে তিন জন— প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও মুরলীধর বসু। পত্রিকার কর্মাধ্যক্ষ বরদা এজেন্সির মালিক শিশিরকুমার নিয়োগী। মুদ্রিত হয় এক হাজার কপি। তিন দিনের মধ্যে সমস্ত বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
প্রকাশকালেই ‘কালি-কলম’ যে আজকের ভাষায় ‘ব্লকবাস্টার’, তার পিছনে ‘কল্লোল’ পত্রিকার ভূমিকা আছে। তত দিনে ‘কল্লোল’-এর বয়স তিন বছর পেরিয়ে গেছে। পাঠকদের উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় ‘কল্লোল ক্লাব’ গড়ে উঠছে। এই যখন অবস্থা, কল্লোলের দুই ‘সেলেব্রিটি’ লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র ও শৈলজানন্দ এবং আরও অনেকে মিলে ভাবছেন, আলাদা একটি পত্রিকা প্রকাশের কথা। ‘কল্লোলযুগ’ গ্রন্থে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, “কিন্তু প্রেমেন শৈলজার অর্থের প্রয়োজন তখন অত্যন্ত। তাই তাঁরা ঠিক করলেন আলাদা একটা কাগজ বের করবেন।”
মুরলীদা
পত্রিকার স্টিয়ারিং যাঁর হাতে ছিল, তিনি মুরলীধর বসু। তিনি নিজে তেমন লেখালিখি না করলেও তাঁর সাহিত্যপ্রেম ছিল প্রবল। তাঁর স্ত্রী নীলিমা বসু ‘কল্লোল’ পত্রিকার লেখক ছিলেন। সেই সময়ের বিখ্যাত লেখকরাও ছিলেন মুরলীধরের বন্ধুবান্ধব। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে তিনি ‘স্যর’, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ডাকতেন ‘মুরলীদা’ বলে।
মুরলীধর মনে করতেন, তাঁর স্ত্রী নীলিমা বসু এক জন সুলেখক। কিন্তু ‘কল্লোল’-এ তাঁর লেখা সেভাবে প্রকাশিত হচ্ছে না দীনেশরঞ্জন দাশের জন্য। তাই দীনেশরঞ্জন এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার প্রতি তাঁর ক্ষোভ। প্রেমেন্দ্র মিত্ররা যে এক সময় ‘কল্লোল’ ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাতে একটি বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন মুরলীধর নিজে। বরদা এজেন্সির তখন প্রকাশক হিসেবে বেশ নামডাক। তার মালিক শিশিরকুমার নিয়োগী ‘কালি-কলম’-এর সম্পাদক ও লেখক হিসেবে আমন্ত্রণ করলে প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ অচিরেই সাড়া দেন সেই ডাকে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে
‘কালি-কলম’ প্রথম থেকেই সাধারণ মাসিক পত্রিকা রূপে প্রকাশিত হয়। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, রঙ্গব্যঙ্গ, সমালোচনা, সমাচার ইত্যাদি সব কিছুই স্থান পেত এতে। সেই সময়ের সমস্ত খ্যাত লেখকই ছিলেন লেখক-তালিকায়। প্রচ্ছদপটে পত্রিকাকে ‘সচিত্র’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সে জন্যই চিত্র-মুদ্রণে পত্রিকাটির আগ্রহ দেখা যায়। একরঙা ছবি ছাপা হত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, গানের স্বরলিপি বা গানের সংগ্রহ পত্রিকাটিতে স্থান পেয়েছিল।
বার বার প্রেস বদল হলেও পত্রিকার ছাপার মান ছিল উৎকৃষ্ট। ছাপায় ভুল থাকত না। আর পত্রিকা প্রকাশের দিনক্ষণের ব্যাপারেও অনিয়ম চোখে পড়ত না। অন্নদাশঙ্কর রায় রচনার মান এবং ব্যবস্থাপনায় ‘কল্লোল’-এর থেকে ‘কালি-কলম’কে এগিয়ে রেখেছিলেন।
সব বুঝি যায়!
“দেখতে তো সুধী-সজ্জনের মতই মনে হচ্ছে। আপনাদের এ কাজ?
‘পড়েছেন আপনি?’
‘ড্যাম ইট— আমি পড়ব ও সব ন্যাস্টি স্ল্যাং? কোনো রেসপেক্টেবল লোক বাংলা পড়ে?’
‘তা তো ঠিকই। তবে আমাদেরটা যদি পড়তেন –’”
‘কালি-কলম’-এ প্রকাশিত লেখার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে। তাঁদের লালবাজারে তলব হয়, সেখানে ঢুকেই মুরলীধর, শৈলজানন্দের এমন অভিজ্ঞতা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘চিত্রবহা’ এবং নিরুপম গুপ্তের লেখা ‘শ্রাবণ-ঘন-গহন মোহে’। কাশীর মহেন্দ্র রায় ‘কালি-কলম’-এ প্রকাশিত শৈলজার ‘দিদিমণি’, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’-কে ‘অশ্লীল লেখা’ মনে করেন। সেই নিয়ে মুরলীধরের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়। মুরলীধরের কথায় প্রবন্ধ লিখেও আপত্তি জানান মহেন্দ্র রায়। সে প্রবন্ধের পাল্টা জবাব দেন নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, সত্যসন্ধ সিংহ ছদ্মনামে। পুলিশ হানা দেয় ‘কালি-কলম’-এর অফিসে। মুরলীধর, শিশিরকুমার এবং শৈলজাকে পরদিন লালবাজারে গিয়ে দেখা করতে বলে। অবশ্য তারা পুলিশ কোর্টে আনলে জামিন পান। মামলা ওঠে জোড়াবাগান কোর্টে। ম্যাজিস্ট্রেট অবশ্য ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেন।
বাণিজ্যে বসতে…
পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষে সম্পাদক হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্র আর থাকেননি। ‘কালি-কলম’-এ যে আর্থিক এবং কর্তৃত্বের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তা রক্ষিত হয়নি। আর তৃতীয় বছরে শৈলজানন্দ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো তিনিও ‘কল্লোল’-এ ফিরে আসেন। সম্পাদক মুরলীধর পত্রিকা আরও এক বছর চালিয়ে যান। শিশিরকুমার নিয়োগী এবং বরদা এজেন্সি প্রবল আর্থিক লোকসান হওয়ায় পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়।
শেষকথা
বিশ শতকের বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে ‘কল্লোল’-এর পাশাপাশি ‘কালি-কলম’ও হয়ে উঠেছিল প্রকাশ এবং প্রেরণার অন্য নাম। পত্রিকাটিকে ‘কল্লোল’-এর প্রতিস্পর্ধী নয়, বরং পরিপূরক বলা যায়।
গ্রন্থঋণ: অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোল যুগ’; জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ‘কল্লোলের কাল’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে