India's first Chowkidar

বাংলাই দিয়েছিল দেশের প্রথম মহিলা চৌকিদার

হুগলির সাহসী চৌকিদার ছিলেন বৈকুণ্ঠ সর্দার। তিনি অকালে মারা গেলে স্ত্রী দ্রবময়ী পড়লেন মহাসঙ্কটে। আবেদন করলেন চৌকিদারির জন্য। ইংরেজ কর্তারা বিস্মিত। এক জন মহিলা করবেন চৌকিদারি, এও কি সম্ভব!

সুব্রত মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫০
Share:

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

চৌকিদার বললেই যে বলিষ্ঠ পুরুষের ছবি মনে আসে, সে ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের এক বিধবা মহিলা। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের হাতেই তুলে নিয়েছিলেন লাঠির গোছা, চৌকিদারি সামলানোর জন্য। পরাধীন দেশে সম্ভবত তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম মহিলা চৌকিদার।

ব্রিটিশ শাসকদের আগে সুলতানি ও নবাবি আমলে গ্রাম ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। গণ্যমান্য প্রবীণ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হত পঞ্চায়েত। সমাজে তাঁরা সালিশ বিচার করে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন। তাঁদের কাজে সহযোগিতার জন্য নিযুক্ত হত চৌকিদার। তাঁরা এক হাতে লণ্ঠন, অন্য হাতে বল্লম বা লাঠি নিয়ে পাহারা দিতেন। এঁদের দলপতি ছিলেন দফাদার। চৌকিদারের মাথায় থাকত কালো পাগড়ি, দফাদারের মাথায় লাল পাগড়ি। এঁদের দেখলে চোর-ডাকাত পালাত। লর্ড মেয়ো পল্লি অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসন পাকাপোক্ত করতে ১৮৭০ সালে গ্রাম-চৌকিদার আইন পাশ করেন। আইনগত ভিত্তির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা পায়। ১৬ থেকে ১৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠন করা হয় ইউনিয়ন বোর্ড। প্রতি ইউনিয়নে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা-সহ গ্রামের সকল খবর রাখা ও ট্যাক্স আদায়ের জন্য নিয়োগ করা হয় চৌকিদার। করের সামান্য অংশ থেকে তাঁদের বেতন দেওয়া হত।

ব্রিটিশ আমলে চৌকিদার ছিলেন গ্রামাঞ্চলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মচারী। ১৮৫৬ পর্যন্ত জমিদারের মাধ্যমে চৌকিদার নিয়োগ প্রথা প্রচলিত ছিল। ১৮৫৬ সালের স্থানীয় পুলিশ আইন অনুসারে পঞ্চায়েতের সদস্যদের মনোনয়ন এবং চৌকিদার নিয়োগের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকদের উপর অর্পণ করা হয়। ১৮৭০ সাল থেকে চৌকিদারি বাংলার সকল গ্রামে সম্প্রসারণ করা হয়। তখন থেকে চৌকিদাররা জেলা প্রশাসকের তরফে নিয়মিত বেতন পাওয়া শুরু করেন।

হুগলি জেলা এক সময় ছিল ডাকাতের জন্য কুখ্যাত। গঙ্গার কাছে বলে এখান থেকে নৌকা করে ডাকাতি করার সুবিধা হত। ‘হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ’ বইয়ে সুধীরকুমার মিত্র লিখেছেন, বলাগড়ের ডাকাতের কথা। ডাকাতের সঙ্গে ছিল পথঘাটে ঠগীদের উৎপাত। হুগলি ও বর্ধমান ছিল ডাকাতির মূল আখড়া। গ্রামের চৌকিদারের অন্যতম দায়িত্ব ছিল ডাকাত, চোর, দুষ্কৃতী দমন। খুব সহজ কাজ ছিল না একা হাতে ডাকাতদলের মোকাবিলা করা। প্রায়শই দলবদ্ধ দস্যুদের আক্রমণে চৌকিদারের জীবনহানির খবর আসত। কিন্তু বৈকুণ্ঠ সর্দার ছিলেন ডাকাত দমনে সিদ্ধহস্ত এক চৌকিদার। তখন হুগলি জেলার উত্তরভাগ এবং বর্ধমানের দক্ষিণ দিকে ডাকাত ও দস্যুদের উপদ্রব অরাজকতার সৃষ্টি করেছিল। “চিতেমার পুকুর, সরালের দিঘী, উচালনের দিঘী, বারবাকপুরের দিঘী— এই সকল স্থানে দিনের বেলায় দস্যুরা সামান্য পয়সার লোভে নরহত্যা করতে পিছপা হত না।” তখন বৈকুণ্ঠ সর্দারের একটা বড় ভূমিকা ছিল। এসব দুষ্কৃতী ও দস্যুদের শায়েস্তা করায় দক্ষ ছিলেন তিনি।

এহেন বৈকুণ্ঠ সর্দার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর স্ত্রী দ্রবময়ী সময় সময় স্বামীর চৌকিদারির কাজ দেখাশোনা করতেন। কিন্তু বৈকুণ্ঠ সর্দার আর সুস্থ হয়ে উঠলেন না। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী আর শিশুপুত্র রঙ্গলাল পড়লেন অকূল পাথারে। কী ভাবে সংসার চলবে, ভরণপোষণের ভারই বা কে নেবে— সে নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। গ্রামের লোকের পরামর্শে সদ্যবিধবা দ্রবময়ী চণ্ডালিনী তাঁর স্বামীর চৌকিদারির কাজ নিজে করার জন্য দরখাস্ত করলেন কালনা শহরে। এমন দরখাস্ত ইতিপূর্বে ইংরেজ সরকারের ঘরে কখনও আসেনি। এক বিধবা গ্রাম্য বাঙালি মহিলা, সে কিনা দরখাস্ত করেছে চৌকিদারির মতো কাজ করার জন্য!

সে আমলে চৌকিদারি ছিল বাস্তবিক পক্ষেই গুন্ডা দমন বা অ্যান্টি-রাউডি সেকশনের সমতুল্য কাজ। দ্রবময়ী চণ্ডালিনী লাঠিখেলা জানেন শুনে কর্তারা তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন বর্ধমান শহরে। সেখানে তাঁকে দিতে হবে লাঠিখেলার পরীক্ষা, তাও কাছারির খোলা মাঠে, লোকসমক্ষে। রবিবারের এক সকালে বর্ধমান সদরের কাছারির মাঠ লোকে ভরে উঠল এক বিধবা মহিলার লাঠিখেলা দেখার জন্য।

পরীক্ষা নিতে উপস্থিত বর্ধমান জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট। দু’জনেই ইংরেজ সাহেব। তাঁরা পরীক্ষা নেবেন, সত্যিই দ্রবময়ী চণ্ডালিনী লাঠি খেলায় দক্ষ, সত্যিই কি তিনি চৌকিদারির মতো কঠিন পেশা সামলাতে পারবেন, নাকি পুরোটাই আবেগপ্রণোদিত। যথাসময়ে কাছারির মাঠে বিধবা দ্রবময়ী সাদা থান কাছা দিয়ে পরে লাঠি হাতে দাঁড়ালেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। তাঁর সুঠাম পেশিবহুল চেহারা দেখেই বোঝা যায়, ছোটবেলা থেকেই তিনি শরীরচর্চায় দক্ষ। কিন্তু পুরুষ লাঠিয়ালের বিরুদ্ধে লড়াই করে কি জিততে পারবেন? কাছারির মাঠ জুড়ে সেই গুঞ্জন।

দ্রবময়ীর সঙ্গে লাঠি খেলতে এল দু’জন পুলিশ কনস্টেবল, এক সঙ্গে। আর দ্রবময়ী মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিতে শুরু করলেন তার লাঠি খেলা। দু’হাতে দু’গাছা লাঠি ধরে ক্রমাগত প্রতিহত করতে থাকলেন কনস্টেবলের লাঠির উপর্যুপরি আক্রমণ। দু’জন কনস্টেবলের সমবেত লাঠির আক্রমণ দ্রবময়ী প্রতিহত তো করলেনই, তাঁর লাঠির আঘাতে ছিটকে গেল কনস্টেবলদের হাতের লাঠি। লাঠি চালনায় পারদর্শী কনস্টেবলদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দিতে খুব সময় নিলেন না দ্রবময়ী।

ইংরেজ সাহেবরা মুগ্ধ হলেন বিধবার পোশাকে দ্রবময়ীর লাঠি চালানো দেখে। তাঁকে তৎক্ষণাৎ বহাল করা হল স্বামীর চাকরিতে। দেশে সেই প্রথম মহিলা চৌকিদার হলেন দ্রবময়ী। সম্ভবত তিনিই এই পেশায় প্রথম মহিলা।

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি দ্রবময়ী চৌকিদার হয়ে সামলেছিলেন অসংখ্য তস্কর দস্যু ও নরহত্যাকারী দুষ্কৃতীর আক্রমণ। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে অক্ষয়চন্দ্র সরকার ‘আর্যাবর্ত’ মাসিক পত্রিকায় দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর বিবরণ লিখেছিলেন। সে সময় বাংলায় স্থানে স্থানে যে মহিলাদের শরীরচর্চা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হত, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ দ্রবময়ী। সে যুগে বাংলার গ্রামীণ মহিলারা ডাকাত ও দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ‘বাংলার ডাকাত’ বইতে লিখছেন, “সেকালে পুরুষদের মত সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরাও লাঠি ধরিতে, তলোয়ার চালাইতে, বর্শা ছুড়িয়া মারিতে শিক্ষা করিতেন। না করিয়া উপায়ও ছিল না। কখন ডাকাত পড়ে, কখন পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিরা গ্রাম লুট করে তাহার তো ঠিক ছিল না।”

বাংলার মহিলারা যে লাঠি ও অস্ত্রচালনায় দক্ষ ছিলেন তার প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশের শ্যামপুরের জমিদার উদয়নারায়ণ এক বার বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিলেন তাঁর পত্নী দয়াময়ী। সেই সময় রহিম খাঁ-র ডাকাত দল বাড়ি আক্রমণ করে— “ডাকাতদল বাড়ি আক্রমণ করেছে জানতে পেরে দয়াময়ী শক্ত করে কাঁচুলী পরিলেন, পুরুষদের মত কাপড় পরিলেন। তারপর এক হাতে তীক্ষ্ণ দীর্ঘ তরবারি আর অন্য হাতে বল্লম লইয়া চলিলেন ডাকাত তাড়াইতে। দয়াময়ীর বর্শা ছুটিয়া এক ডাকাতকে মেরে ফেললে অন্যান্য দস্যুরা ভয়ে পালায়।”

এ থেকেই বোঝা যায়, সেকালে মহিলারাও যথেষ্ট শক্তিশালী ও অস্ত্রচালনে দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন নিজের ও পরিবারের ধন-প্রাণ-সম্মান রক্ষা করার তাগিদে।

ছবি: রৌদ্র মিত্র

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন