চিত্রভাষ: প্যালেস্টাইনি শিল্পী ব্যাংকসির ‘আর্মড পিস ডাভ’। ডান দিকে, ফরাসি শিল্পী সেথ গ্লোবপেন্টারের তুলিতে সেই ছোট্ট ইউক্রেনীয় মেয়েটি।
দেওয়াল জুড়ে নামের বিস্তার— অহমিকার লতাগুল্মে ভরা এক জঙ্গল, যেন মানসিক ঝড়বৃষ্টির পর পর ঋতুতে ফুটে উঠেছে আর সেই ঝড় নিউ ইয়র্কের উপর দিয়ে বয়ে গেছে এক অলিখিত ইতিহাসের মতো।” (‘দ্য ফেথ অব গ্রাফিতি’, নরমান মেইলার)
পৃথিবীর মানচিত্র এই মুহূর্তে রক্তে আঁকা হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের মেঘ, গাজ়ার আকাশ ধোঁয়ায় ঢাকা, ইউক্রেনের শহরগুলো কামানের গর্জনে কাঁপছে, সুদানের মাঠে শুধুই মানুষের মৃতদেহ। সর্বত্রই যুদ্ধক্ষেত্রে রাষ্ট্র কথা বলছে অস্ত্রের ভাষায়। তবুও মানুষ দেওয়ালে লিখে চলেছে তার নিজের কবিতা। ভাঙা দেওয়ালের গায়ে, ধুলোমাখা কংক্রিটের বুকে, মানবতার হয়ে লিখছে এক নীরব, অপ্রতিরোধ্য বার্তা— আমরা এখনও বর্তমান, আমরা এখনও মানুষ, আমরা আজও স্বপ্ন দেখি। এই সময়ের যুদ্ধে গ্রাফিতি পেয়েছে নতুন মাত্রা। ডিজিটাল যুগে দেওয়ালের এই শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমের পর্দায়ও। গাজ়ার এক ধ্বংসস্তূপের দেওয়ালে আঁকা মুখ মুহূর্তের মধ্যে দেখছে লক্ষ-কোটি চোখ। আর তখনই এই দেওয়ালের শিল্প, স্থানীয় বার্তাবাহক থেকে হয়ে ওঠে বৈশ্বিক সাক্ষ্য।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শিল্পকলা তো কোনও রাজদরবারে বা অভিজাত চিত্রশালায় চিত্রিত হয়নি। সে শিল্প লুকিয়ে আছে ফ্রান্সের লাস্কো গুহার পাথুরে গায়ে, স্পেনের আলতামিরার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যেখানে আজ থেকে পঁচিশ হাজার বছর আগে কোনও অজানা মানুষ তার হাতের ছাপ রেখে গেছে। সে ছাপ ছিল মানুষের অস্তিত্বের প্রতীক। নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ রাখার প্রবৃত্তি মানুষের সবচেয়ে গভীর স্তরে প্রোথিত। যখনই কোনও শক্তি মানুষের কণ্ঠরোধ করেছে, মানুষ শিল্পকে মাধ্যম বানিয়েছে। ক্রমশ দেওয়াল হয়ে উঠেছে উন্মুক্ত ক্যানভাস, সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর, তার উন্মুক্ত পত্রিকা, তার নীরব প্রতিবাদের মঞ্চ। গ্রাফিতি এ রকমই এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার— ভাষাগত বিদ্রোহ, সাংস্কৃতিক স্মৃতির সংরক্ষণাগার।
অবরুদ্ধ নগরীর প্রেক্ষাপটে, যেখানে বুলেটের বর্ষণ, যেখানে রাস্তায় বেরোনো মৃত্যুর আমন্ত্রণ এক দৈনন্দিন ঘটনা, সেখানে দেওয়ালের লেখা হয়ে ওঠে এক বিশেষ বার্তাবাহক। বেইরুট, বেথলেহেম, সারায়েভো, গাজ়া, ওয়ারশ, আলেপ্পো— ইতিহাসের প্রতিটি অবরুদ্ধ শহরের ভগ্ন দেওয়াল যেন মানুষের রং, রক্ত আর স্বপ্নের নীরব দিনলিপি হয়ে রয়েছে।
২০১২ সাল। সিরিয়ার আলেপ্পো শহর তখন প্রায় ধ্বংসস্তূপ। পাশাপাশি দুটো ভবনের মাঝখানের গলি, যেখানে স্নাইপারের দৃষ্টি পৌঁছয় না, সেখানে কেউ স্প্রে-পেন্ট দিয়ে লিখে রেখেছে, ‘মৃত্যুর আগে মোরো না’। মৃত্যুর ছায়ার নীচে দাঁড়িয়ে এই বার্তা লেখার সাহস কার? শিল্পীর নাম জানা যায় না। হয়তো পরদিনই মারা গেছেন তিনিও। কিন্তু দেওয়ালটি থেকে গেছে আরও কয়েক বছর, সাক্ষী থেকেছে মানবিক প্রতিরোধের। যুদ্ধকালীন গ্রাফিতি একটি সামষ্টিক মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণিত করে, নিজ মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখে। দেওয়ালের এই শিল্প নিঃশব্দে বলে যায়: আমরা এখনও আছি, আমরা এখনও মানুষ, আমরা এখনও শান্তির আশায় অপেক্ষা করি।
প্যালেস্টাইনের পশ্চিম তটের বিচ্ছেদপ্রাচীর এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই প্রাচীর আজ হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ উন্মুক্ত গ্যালারি। ব্যাংকসি থেকে শুরু করে অসংখ্য অজানা প্যালেস্টাইনি শিল্পী এই প্রাচীরকে পরিণত করেছেন এক জীবন্ত ইস্তাহারে।
গ্রাফিতির জগতে বর্ণমালা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শুধু চিত্র নয়, শব্দ ও অক্ষর নিজেরাই হয়ে ওঠে শিল্পের উপাদান। এই প্রক্রিয়াকে ‘ক্যালিগ্রাফিতি’ বলা হয়। ক্যালিগ্রাফি ও গ্রাফিতির এই মিলনে ভাষা পায় এক নতুন শারীরিক অস্তিত্ব। অক্ষর আর শুধু অর্থের বাহক নয়, সে নিজেই হয়ে ওঠে দৃশ্যমান এক সত্তা। মিশরীয় শিল্পী এল-সিদ তাঁর ক্যালিগ্রাফিতি আন্দোলনের মাধ্যমে আরবি হরফকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন। আরবি বর্ণমালার বাঁকানো, প্রবাহিত রূপ— যা সেকাল থেকে আধ্যাত্মিকতার প্রতীক— তাঁর হাতে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা। কায়রো থেকে বেইরুট, তাঁর অক্ষরগুলো দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে মুক্তির বার্তা নিয়ে।
প্যালেস্টাইনি কবি মাহমুদ দারউইশ বলেছিলেন, প্যালেস্টাইনিদের প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল তাদের ভাষা। ভাষা কেড়ে নেওয়া যায় না, কারণ ভাষা মানুষের ভিতরে বাস করে। কিন্তু যখন সেই ভাষাকে দেওয়ালে লেখা হয়, তখন সে ভাষা ব্যক্তিগত থেকে হয়ে ওঠে সামষ্টিক, নশ্বর থেকে হয়ে ওঠে প্রায়-অমর। দেওয়ালের অক্ষর বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়, বোমায় মুছে যায়। যত দিন কোনও দৃষ্টির স্পর্শ তাকে ছুঁয়ে থাকে, তত দিন সে বেঁচে থাকে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইজ়রায়েলি আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজ়া হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট ভূখণ্ডগুলোর একটি। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৬১,৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, গাজ়ার প্রায় সব প্রধান শিল্পকলা কেন্দ্র— এলতিকা, শাবাবিক এবং আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস বিভাগ, ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও শিল্পীরা থেমে যাননি। ইব্রাহিম মাহনা তাঁর বোমা-বিদ্ধ বাড়ির এক কোণে একটি ছোট স্টুডিয়ো বানিয়েছেন। মানবিক সাহায্যের বাক্সে, ইউএনআরডব্লিউ-এর আটার বস্তায় তিনি এঁকে চলেছেন গাজ়ার মানুষের মুখ। তাঁর কথায়, “দখলদাররা শুধু জমি নেয় না, আমাদের মুছে ফেলতে চায়। আটার বস্তায় ছবি আঁকা মানে আমাদের গল্পটা আবার দাবি করা।” আঠারো বছরের হুসেইন আল-জেরজাউয়ি, পাঁচ বার বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরেও, আটার বস্তায় এঁকে চলেছেন গাজ়ার দৈনন্দিন জীবনের ছবি।
গাজ়ার দেওয়ালে এখন ফুটে উঠেছে ‘হান্দালা’। ১৯৬৯ সালে প্যালেস্টাইনি কার্টুনিস্ট নাজি আল-আলি সৃষ্ট সেই ন্যাড়ামাথার শিশু, যার পিঠ সব সময় দর্শকের দিকে। সে প্রতীক হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের। অবরুদ্ধ নাজ়ারেতে ইজ়রায়েলি পুলিশ বার বার দেওয়ালের ছবি মুছে দিয়েছে, কিন্তু শিল্পীরা বার বার ফিরে এসে একই ছবি আঁকেন। এই মুছে ফেলা এবং আবার আঁকার চক্রটি নিজেই এক প্রতিরোধের কাব্য।
বিশ্ব জুড়ে শিল্পীরা গাজ়ার সঙ্গে একাত্মতা জানাতে নেমেছেন রাস্তায়। ‘আনমিউট গাজ়া’ নামের একটি প্রকল্পে শেপার্ড ফেইরি-সহ (যিনি বারাক ওবামার বিখ্যাত ‘হোপ’ পোস্টার তৈরি করেছিলেন) ডজনখানেক শিল্পী গাজ়ার চিত্রসাংবাদিকদের তোলা ছবি পেন্টিংয়ে রূপান্তরিত করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ২৯টি দেশের ৮০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এই শিল্পের ঢেউ।
মাদ্রিদের রেইনা সোফিয়া মিউজ়িয়মে, যেখানে পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ ঝুলে আছে, সেই একই ভবনের গায়ে গ্রিন পিস-এর সঙ্গে মিলে ‘আনমিউট গাজ়া’ একটি বিশাল ব্যানার টাঙিয়ে দিয়েছে— গাজ়ার ছবি সংবলিত। গুয়ের্নিকা যেমন স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের বর্বরতাকে ক্যানভাসে ধরে রেখেছিল, আধুনিক শিল্পীরাও তেমনি গাজ়ার যন্ত্রণাকে সারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরছেন।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৬। সারায়েভো অবরোধের চার বছর। পৃথিবীর ইতিহাসে আধুনিক যুগের দীর্ঘতম শহর-অবরোধ। এই চার বছরে ১২,০০০-এরও বেশি মানুষ মারা গেছেন, লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু এই অবরোধের মধ্যেও সারায়েভোর দেওয়ালগুলো কথা বলে চলেছে নিরন্তর। শিল্পীরা মিলেছেন রাতের অন্ধকারে, স্প্রে-পেন্ট হাতে নিয়ে। বোমা-বিদ্ধ ভবনের গায়ে ফুল ফুটেছে রঙিন আঁচড়ে, ভাঙা জানালার পাশে হাসি আঁকা হয়েছে।
বসনিয়ান শিল্পী সাফেত জেকো তাঁর যুদ্ধকালীন শিল্পকর্মে দেখিয়েছেন, কী ভাবে ধ্বংসের মাঝেও সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাঁর কথায়, “আমি চাই আমার শিল্প এমন এক প্রয়োজনীয় নৈতিক পুনর্জাগরণকে শক্তিশালী করুক, যা এই অসহনীয় উদাসীনতার পর্দা ভেঙে দিতে পারে।” যুদ্ধ ও হিংসার সময় মানুষ অন্যের বেদনার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে, শিল্প সেই উদাসীনতার আবরণ ভেদ করে সহমর্মিতার আলো ফিরিয়ে আনে। শিল্প মানুষের নৈতিক চেতনা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তাই তাঁর কাছে ছবি আঁকা মানে শেষ পর্যন্ত মানুষের পক্ষে, মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো।
আজকের গাজ়ায় যখন ধুলো উড়ছে, যখন হাসপাতালের ভিতরেও বোমা পড়ছে, তখনও তার দেওয়ালে ভরে উঠছে ছবি। শিশুরা আঁকছে তাদের স্বপ্নের বাড়ি, বড়রা আঁকছেন মুক্তির মানচিত্র। গাজ়ার শিল্পী মোহাম্মদ আল-হাওয়াজরি, তাঁর সারিয়ালিস্ট গ্রাফিতিতে যুদ্ধের বাস্তবতাকে রূপান্তরিত করেছেন অদ্ভুত এক স্বপ্নময় জগতে। মাছ উড়ছে আকাশে, ঘোড়া হাঁটছে মেঘের উপর দিয়ে। যেন বলছে, বাস্তব যতই কঠোর হোক, কল্পনাকে কেউ হত্যা করতে পারে না।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের শহরগুলোর দেওয়াল হয়ে উঠেছে আর এক যুদ্ধক্ষেত্র— রঙের, স্মৃতির, মানবতার। বোমা-পড়া ভবনের ভাঙা কঙ্কালে ব্যাংকসি এঁকেছেন একটি ছোট ছেলেকে, যে জুডোয় এক জন বড় মানুষকে ছুড়ে ফেলছে। ছবিটি নিঃশব্দে বলে দেয় ইউক্রেনের গল্প। কিয়েভের বিখ্যাত গ্রাফিতি দল ‘ইটিসি’-এর সদস্যরা আক্রমণের পর তাঁদের পেন্টের কাজকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছেন। দেওয়ালে শিল্পকলা আঁকার বদলে এখন তাঁরা সামরিক গাড়িতে ক্যামোফ্লাজ রং করছেন। যে দক্ষতা এক দিন শহরের সৌন্দর্য বাড়াত, সেই দক্ষতাই এখন সৈনিকদের বাঁচাচ্ছে শত্রুর চোখ থেকে। শুধু রঙের ব্যবহার পাল্টেছে, কিন্তু সেই একই প্রবৃত্তি: শিল্পকে জীবনের সেবায় লাগানো।
খারকিভের শিল্পী গামলেত জিনকোভস্কি, যাঁর কাজে লেখার উপাদানের বৈচিত্রই মূল, যুদ্ধের পর থেকে ইউক্রেনীয় ভাষার অক্ষরকে করেছেন প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের এই লড়াইয়ে ভাষাও এক রণক্ষেত্র। ইউক্রেনীয় পরিচয়কে টিকিয়ে রাখার লড়াই, সংস্কৃতি মুছে ফেলার বিরুদ্ধে সাহিত্যিক প্রতিরোধ।
ফরাসি শিল্পী সেথ গ্লোবপেন্টার যুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন দিনের মাথায় প্যারিসের দেওয়ালে এঁকেছিলেন একটি ছোট ইউক্রেনীয় মেয়েকে। সেই মেয়ে যেন জিজ্ঞেস করছে, পৃথিবী কেন চুপ? সারা পৃথিবীর দেওয়ালে ইউক্রেনের রং— হলুদ এবং নীল, একটি মানচিত্রের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছিল সহানুভূতিরও বৈশ্বিক বিবেকের স্বাক্ষর।
বাংলাদেশে দেওয়াল-লেখার এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার দেওয়ালে লেখা, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ এই সব স্লোগান ছিল জনযুদ্ধের ইস্তাহার, মুক্তির প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবরোধের মধ্যে, ভয় আর অনিশ্চয়তার মাঝে, এই লেখাগুলো মানুষকে জানান দিয়েছিল— তারা একা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিটি আন্দোলনে দেওয়ালকে ব্যবহার করেছেন প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। ভাষা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান, এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন, প্রতিটি সামাজিক টানাপড়েনের সময় ঢাকার দেওয়ালগুলো হয়ে উঠেছে এক অলিখিত সংবাদপত্র, নগর-কবিতার পাতা। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় দেওয়ালে আঁকা ম্যুরালগুলো হয়ে উঠেছিল সেই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য-দলিল। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের হাতে আঁকা ম্যুরালগুলো, আবু সাইদের হয়ে ওঠা প্রতিরোধের প্রতীক, গণহত্যার বিরুদ্ধে ক্রোধ ও বেদনার রং, সেই সময়ের স্মৃতিকে ধরে রেখেছে। এই ম্যুরালগুলো যেন ইতিহাসের পাতা, পাল্টা বয়ান, মানুষের নিজস্ব আর্কাইভ।
ফরাসি দার্শনিক জাক র্যাঁসিয়ার তাঁর ‘দ্য পলিটিক্স অব এস্থেটিক্স’ গ্রন্থে বলেছেন, শিল্পের রাজনৈতিক শক্তি নিহিত তার ‘দৃশ্যমানতার বিতরণ’ পরিবর্তন করার ক্ষমতায়। কোন জিনিস দেখা যাবে, কোন কণ্ঠ শোনা যাবে, এই প্রশ্নই রাজনীতির মূল প্রশ্ন। গ্রাফিতি এই অর্থে একটি গভীর রাজনৈতিক কাজ। তা সেই মানুষদের দৃশ্যমান করে তোলে, যাদের অদৃশ্য রাখার চেষ্টা চলছে।
পম্পেই শহরের ধ্বংসস্তূপে খননকাজে পাওয়া গেছে দু’হাজার বছর আগের গ্রাফিতি। রোমান সৈনিকরা লিখে গেছেন তাঁদের প্রেমের কথা, ক্রোধের কথা, রসিকতাও। এগুলোই তো সেই যুগের সবচেয়ে খাঁটি দলিল, যা লেখা হয়েছিল জীবন যাপনের আবেগে।
শিল্পের মতোই তার দমনও রাজনৈতিক। নাজ়ারেতে ইজ়রায়েলি পুলিশ বার বার প্যালেস্টাইনপন্থী গ্রাফিতি মুছে দিচ্ছে। আমেরিকায় ইউনিয়ন স্টেশনের বাইরে, হোয়াইট হাউসের কাছে লাফায়েত পার্কে প্রো-প্যালেস্টাইনি গ্রাফিতি দ্রুত মুছে ফেলছেন কর্তৃপক্ষ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা হ্যামিলটন হলের নাম বদলে রেখেছিলেন ‘হিন্দ’স হল’, ইজ়রায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত ছয় বছরের শিশু হিন্দ রাজাবের স্মৃতিতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই নাম মুছে দিয়েছে।
মুছে দেওয়া এবং আবার লেখা, এই চক্রটিই হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। ক্ষমতা ভয় পাচ্ছে, ভয় না পেলে মুছবে কেন? প্রতিটি পুনরায় আঁকা বলে দিচ্ছে— মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সত্যিকারের মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
রাশিয়ায় যুদ্ধবিরোধী গ্রাফিতি আঁকা ভয়ানক ঝুঁকির কাজ। তবুও মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের কিছু দেওয়ালে রাতের অন্ধকারে লেখা হয়েছে ‘নো টু ওয়ার’। এই লেখকরা নাম জানায় না, মুখ দেখায় না, তবু তাদের লেখা টিকে থাকে যতক্ষণ না কর্তৃপক্ষ মুছে দেন। এই নামহীন সাহস হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ শিল্পকর্ম।
আধুনিক যুগের অবরুদ্ধ শহরগুলোতেও একই ঘটনা ঘটছে। গবেষকরা সংগ্রহ করছেন, ফোটোগ্রাফাররা ক্যামেরায় ধারণ করছেন। এই গ্রাফিতিগুলো ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদদের কাছে হয়ে উঠবে সেই যুগের মূল্যবান সাক্ষ্য। পোশাকি ইতিহাস রাজাদের কথা বলে, কিন্তু দেওয়ালের ইতিহাস বলে সাধারণ মানুষের কথা, ভয় পাওয়া মানুষের কথা, তবুও আশা হারায়নি এমন মানুষের কথা। অবরোধ চলতে থাকবে, যুদ্ধ চলতে থাকবে, মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হতে থাকবে। তবু যত দিন দেওয়াল আছে, যত দিন মানুষের হাতে রং আছে, তত দিন এই নীরব প্রতিবাদও চলতে থাকবে।
গ্রাফিতি একটি সম্পর্ক। শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মধ্যে, জীবিত এবং মৃতদের মধ্যে। এই সম্পর্কের মধ্যে ভাষার চেয়েও বেশি আছে মানবিক অস্তিত্বের এক অদম্য জেদ, এক অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা: আমি ছিলাম, আমি ভেঙে পড়িনি, আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে