অশ্রুক্ষরণ: এক বিন্দু অশ্রুজলের যন্ত্রণা অশ্রুসিক্ত সেই চিবুক জানে, আর জানে আহত পাঁজর।
রোদনভরা এ বসন্ত, সখী, কখনো আসেনি বুঝি আগে’… এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শুনে চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরে যায়, কেন তা আজও জানি না। শুধু তো এই গানটি নয়, আরও অনেক গান শুনেই অশ্রুধারা বয়ে যায়। যেমন যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা-দিদি’ কবিতাটি প্রসঙ্গে নবনীতা দেব সেন লিখেছিলেন, “কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার মনে ভীষণ কষ্ট হতো। অনেক বছর পরে, যখন আমি বড়, কাজলাদিদির গানের রেকর্ড বেরিয়ে গেছে, গানটি শুনলেই আমার ভেতরে ভেতরে ছোটবেলার মতোই কান্না পেত। তারপরে দেখি, আমার দুই কচি কচি কন্যারও কাজলাদিদির রেকর্ডটি শুনলেই ঠোঁট কেঁপে যায়— টলটলে জল এসে যায় চোখে— ওরাও ওই গানটি শুনতে পারে না, আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। অবিকল আমারই মতন। এই কবিতাটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ছোটদের চোখে জল আনছে…।”
একটা বয়স ছিল, যখন মনে পাক ধরেনি। অল্পেই চোখ ভিজে আসত। নিজের বা বন্ধুদেরও ক্ষেত্রেও দেখেছি, ব্যতিক্রম হয়তো ছিল কেউ কেউ, কিছু শাশ্বত মৃত্যুবর্ণনা যেন হৃদয়ে অমোঘ কষ্ট বুনে দিয়ে গেছে। সেই যেমন ‘পথের পাঁচালী’-তে দুর্গার অসুস্থ হওয়া। এক দিন ঝড়বৃষ্টি থেমে গেল, আকাশ আলো হয়ে উঠল শরতের ঝলমলে রোদ। দুর্গা ভাইকে বলল, এক দিন তাকে নিয়ে রেলগাড়ি দেখাতে যেতে, তার পর কী যে হল, ‘দুর্গা আর চাহিল না’। বিভূতিভূষণ লিখছেন, “আকাশের নীল আস্তরণ ভেদ করিয়া মাঝে মাঝে অনন্তের হাতছানি আসে— পৃথিবীর বুক থেকে ছেলেমেয়েরা চঞ্চল হইয়া ছুটিয়া গিয়া অনন্ত নীলিমার মধ্যে ডুবিয়া নিজেদের হারাইয়া ফেলে— পরিচিত ও গতানুগতিক পথের বহুদূরপারে কোন পথহীন পথে— দুর্গার অশান্ত, চঞ্চল প্রাণের বেলায় জীবনের সেই সর্বাপেক্ষা বড় অজানার ডাক আসিয়া পৌঁছিয়াছে।” অদ্ভুত এক প্রাণশক্তির অমন করে নিবে যাওয়া আশ্চর্য এক কষ্ট তৈরি করেছিল বুকের ভিতর, সে কষ্টের তুলনা আর কখনও পাইনি।
পারিবারিক সমীকরণের আশ্চর্য মনখারাপ উপহার দিয়েছেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-য় কুসুম আর শশীর বিচ্ছেদবেদনার অনুরণন হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই যে কবিয়াল নিতাইচরণ, এক বার হারাল তার বসন্তকে, আবার গাঁয়ে ফিরে দেখল তার ঠাকুরঝিও আর নেই, তার পর সে লিখল “ভালবেসে মিটলো না স্বাদ, কুলাল না এ জীবনে/ হায়! জীবন এত ছোট ক্যানে, এ ভুবনে?”— তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনীতে এই ঘটনা-পরম্পরা চোখ ভিজিয়ে দেয়নি, বাংলা সাহিত্যের এমন পাঠক বোধহয় পাওয়া দুষ্কর।
‘অশ্রুভরা বেদনা দিকে দিকে জাগে
আজি শ্যামল মেঘের মাঝে বাজে কার কামনা…’
অশ্রুসিক্ত দৃশ্য নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সারা বিশ্বে। কখনও যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৈন্যদের পরিবার ও দেশের জন্য কান্নার দৃশ্য, কখনও প্রেমে বিরহে তীব্র নাটকীয় অশ্রুসিক্ত দৃশ্য, কোনও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে আবেগপ্রবণ গল্প অথবা পশুদের নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের আবেগপূর্ণ গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন সিনেমায়।
‘হাচিকো’ নামে একটি ইংরেজি সিনেমা হয়েছিল, যেখানে টোকিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের একটি পোষ্য কুকুর ছিল, এবং তার নাম হাচি রেখেছিলেন অধ্যাপক। হাচি প্রতিদিন সকালে অধ্যাপকের সঙ্গে শিবুয়া আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন অবধি যেত, যেখান থেকে অধ্যাপক ট্রেন ধরে কাজে যেতেন। বিকেলে হাচি ওই স্টেশনে অপেক্ষা করত অধ্যাপকের জন্য, এবং তাঁকে নিয়ে বাড়ি ফিরত। এক দিন বিকেলে অধ্যাপক আর ফিরে আসেননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মারা যান। হাচি অধ্যাপকের মৃত্যুর কথা জানতে পারেনি, তাই সে রোজ শিবুয়া স্টেশনে গিয়ে অধ্যাপকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ছবিতে তার মালিকের মৃত্যুর পরও দশ বছর ধরে প্রতিদিন স্টেশনে অপেক্ষা করার দৃশ্যটি ছিল অন্যতম আবেগপ্রবণ দৃশ্য, সেই দৃশ্য দেখে যে অশ্রুপাত, তা রোধ করা অসম্ভব।
সেই যে ‘দীপ জ্বেলে যাই’ সিনেমাটি দেখেছিলাম। মূল চরিত্র রাধা নামের এক নার্সকে কেন্দ্র করে, যিনি মানসিক রোগীদের সুস্থ করতে তাদের সঙ্গে প্রেম ও বন্ধুত্বের অভিনয়ের মাধ্যমে ভালবাসার প্রলেপ দেন, কিন্তু অবশেষে ভালবাসার অভিনয় এবং বাস্তব আবেগের দ্বন্দ্বে রাধা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। রাধার চরিত্রে আমরা সুচিত্রা সেনের অভিনয় দেখে, বিশেষত শেষ দৃশ্য দেখে ভেসে গেছি অশ্রুসাগরে। তার পর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতে সুপ্রিয়া চৌধুরীর ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’ সংলাপ শুনে কোন দর্শকের চোখের জল বাধা মানবে! বড় ভাই শঙ্করের কাছে নীতার বাঁচতে চাওয়ার সেই আকুতি শুধু শান্ত স্নিগ্ধ পাহাড়ের আকাশ-বাতাসই ভারী করে তোলেনি, দর্শকদের বুকও ভারী করে তুলেছে। জীবনের ভারে ক্লান্ত এবং প্রতারণা আর সামাজিক বঞ্চনার আঘাতে যে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনেছে, সেই নীতার তীব্র বাঁচার আকুতি দর্শকের হৃদয় মথিত করেছে।
অশ্রুজলের প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু কথা এসেই যায়। অনেক বছর আগের কথা। আমাকে টানা দিন পনেরো ধরে রোজ পিজি হাসপাতালে সারা দিন বসে থাকতে হত। আমার মা আইসিইউ-তে ভর্তি ছিলেন। আমার পাশে আর এক জন বৃদ্ধ বসে থাকতেন। হলদিয়া থেকে তিনি এসেছিলেন। সেই বৃদ্ধের পুত্র ভর্তি ছিল সেখানে। ছেলেটির তেইশ বছর বয়স, গাছে বাইকের ধাক্কায় দুর্ঘটনা। বৃদ্ধ আইসিইউ-এর সামনে বসে শুধু একটি কলা খেয়েই ব্রেকফাস্ট সারতেন, আর নীরবে কেঁদে যেতেন, দু’চোখ দিয়ে শুধু ঝরে যেত অশ্রু, থামতে দেখিনি। তাঁকে দেখতাম আর মনে হত, পুত্রের সঙ্গে কাটানো গত তেইশ বছরের কতশত মুহূর্ত সিনেমার মতো ভেসে যাচ্ছে বৃদ্ধ মানুষটির মনের পর্দায়। আর কখনও ছেলের সঙ্গে সময় কাটানো হবে কি না, মনে এই ভাবনা এসে গেলেই হয়তো মনকে শাসন করতে চেষ্টা করছেন, কিন্তু চোখের জল কবে কার কথা শুনেছে!
আমার মাকে বাড়ি নিয়ে আসার আগের দিন সেই পুত্রের মৃত্যু হয়, তার অল্পবয়সি বৌটির উচ্চৈঃস্বরে কান্না শুনে আমার আর সাহস হয়নি বৃদ্ধ পিতার সামনে দাঁড়াতে। আমার মায়ের রোগমুক্তি, তাঁকে নিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ আমার মনের অন্তরালে চাপা পড়ে গিয়েছিল সেই শোকচিত্রের ব্যাপকতর অসহায়তার সামনে।
লর্ড বায়রন লিখেছিলেন, ‘ব্যস্তদের অশ্রুপাতের সময় নেই’। কিন্তু আসলে কি কান্নার সঙ্গে ব্যস্ততার কোনও সম্পর্ক আছে! মানুষ কেন কাঁদে! এক বিন্দু অশ্রুজলেরও কারণ হয়ে ওঠে যে অসতর্ক মুহূর্ত কিংবা বর্শার ফলা, অথবা যে বাঁকাচোরা সেফটিপিন, তাদের সম্মুখে যে কোনও মেহগনি বিকেল, যে কোনও জ্যোৎস্না-আকাশই ম্লান হয়ে যায়। কোনও বজ্রবিদ্যুৎ, কোনও ধুলো-ঝড়ই পারে না উড়িয়ে দিতে সেই সব। এক বিন্দু অশ্রুজলেও যে যন্ত্রণা থাকে সে কথা অশ্রুসিক্ত সেই চিবুক জানে, আর জানে আহত পাঁজর। এই যে চার পাশে কত অসফল সম্পর্ক, কত মানসিক যন্ত্রণা, তার আড়ালে কিংবা পরতে পরতে কত ব্যথা-বেদনা, কত অশ্রুনদী, কে রাখে তার হিসাব! এই যে কত যুদ্ধ হয় রাষ্ট্রনায়কদের খামখেয়ালিপনায়, বিশ্ব জুড়ে রণদামামা, সশস্ত্র সংঘাত! হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, কত শিশু কত বালিকা কত সাধারণ মানুষের রক্তে ভিজে যায় মাটি। লম্বা মাঠে পড়ে থাকে যে আকাশ, যে ঘাসফুল, তাদের গায়ে রক্ত লেগে থাকে, আর পরিবারের মানুষ ভেসে যায় অবাধ অনর্গল অশ্রুপ্রবাহে। কত জননী সন্তানহারা হয়, কত শিশু অভিভাবকহীন হয়, কত গৃহ পুড়ে ছারখার হয়— যাঁরা এই সব দুর্যোগ পেরিয়েও রয়ে যান, বাকি জীবন তাঁদের বেঁচে থাকতে হয় অন্তরে এক গোপন অশ্রুর উৎসমুখ নিয়ে, সামান্য স্মৃতির ঝাপটাতেই ক্ষরণ ঘটানো যাদের জন্মের ভবিতব্য।
‘তারি লাগি যত
ফেলেছি অশ্রুজল
বীণাবাদিনীর শতদলদলে
করিছে সে টলোমল…’
কত দুর্ঘটনা ঘটে নিত্যদিন অহরহ! মনে পড়ে ওই ভিডিয়োটি? সেই যে এয়ার ইন্ডিয়া-র লন্ডনগামী প্লেনটি ধ্বংস হওয়ার আগের মুহূর্তে এক পরিবারের বাড়িতে পাঠানোর ভিডিয়ো! দু’টি ছোট বাচ্চা ও তাদের মা-বাবা ভাল থাকার জন্য লন্ডনে স্থানান্তরিত হচ্ছিলেন। সেই ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছিল ইন্টারনেটে। সেই আনন্দঘন মুখগুলি, যাঁরা জানেন না পরক্ষণে কী ঘটতে চলেছে, সেই ভিডিয়োতে তাঁদের দেখে আমাদের অশ্রুবন্যা বয়ে যায়নি কি! এই যে প্রতিদিন ধর্ষণ হচ্ছে, প্রতিদিন অন্য অন্য স্থানে বীভৎসতার চূড়ান্ত ঘটনা সামনে আসে, কত নির্ভয়া, কত অভয়া, কত তিলোত্তমা হয় প্রত্যহ! তাদের বাবা-মা, নিকটাত্মীয়ের চোখের জলের কোনও পরিমাপ হয় না। সেই অশ্রুজল কোনও ধর্ষক বা কোনও আইনরক্ষকের নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতার ঊর্ধ্বে।
অশ্রুপাত শুধু তো দুঃখে-বিরহে নয়, আনন্দাশ্রুও একটি বিরাট বিষয়। দমফাটা হাসি হাসতে হাসতে চোখের জলের যে বন্যা বয়ে যায়! আবার সন্তানের সাফল্যে মায়ের চোখ থেকে যে অশ্রু ঝরে পড়ে ঝর্নার জলের মতো, অথবা দু’টি মানুষের অনেক দিন পরে সাক্ষাতে যে অশ্রুসজল দৃষ্টিবিনিময়, সেখানে অশ্রু হল সেই ভাষা, যা হৃদয় বোঝে কিন্তু মুখ বলতে পারে না। আমেরিকান ঔপন্যাসিক ওয়াশিংটন আরভিং লিখেছেন যে, কান্নার মধ্যে পবিত্রতা আছে, এগুলো দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং শক্তির, এরা দশ হাজার ভাষার চেয়েও বেশি স্পষ্টভাষী কথা বলে, এরা অপ্রতিরোধ্য শোক এবং অবর্ণনীয় ভালোবাসার বার্তাবাহক।
কথিত আছে, শক্তিশালীরা কাঁদে না। কান্না নাকি অতি সংবেদনশীল নারী এবং শিশুসুলভ শিশুদের ট্রেডমার্ক! চোখের জল নাকি দুর্বলতা প্রকাশ করে। সমাজ বুঝিয়েছে— নারীরা দুর্বল, পুরুষেরা শক্তিশালী। তাই কান্না পুরুষকে মানায় নয়, ও-সব নারীদের ভূষণ। তাই পুরুষেরা জনসমক্ষে কাঁদতে পারে না, অনেক সময় অনেক পুরুষ কেঁদে ফেললেও সেটি গোপনের চেষ্টা করে, কনুই উল্টে চোখের জল মুছে ফেলে তাড়াতাড়ি। কত পিতাকে দেখেছি কন্যার বিবাহের পর জনসমক্ষে কাঁদতে পারেন না, গৃহের এক কোণে নির্জনে দাঁড়িয়ে অশ্রুবিসর্জন করেন। এ কথা সত্যি, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন। জার্মান সোসাইটি অব অপথ্যালমোলজির এক গবেষণায় নাকি দেখা গেছে, বছরে নারীরা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি বার কাঁদেন। শব্দ করে কান্নার ক্ষেত্রেও নারীদের কান্নার হার এগিয়ে। তার মানে কিন্তু এই নয়— পুরুষেরা মহিলাদের থেকে কম সংবেদনশীল সব সময়। বিজ্ঞান বলছে, কান্নাকাটি করার ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার শারীরিক ও মানসিক গঠনের ভিন্নতাই মূল কারণ। ১৯৬০ সালের কোনও গবেষণাপত্র থেকে নাকি জানা যায়, মহিলা ও পুরুষদের অশ্রুনালির গঠন আলাদা। পুরুষদের অশ্রুনালিগুলির দৈর্ঘ্য ও গভীরতা বেশি। এতে তাঁদের চোখের জল চোখের পাতায় এলেও চট করে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে না। অন্য দিকে মহিলাদের অশ্রুনালি সঙ্কীর্ণ ও অগভীর হয়। ফলে তাঁরা চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না। এ ছাড়াও পুরুষের শরীরে থাকা টেস্টোস্টেরন হরমোনই নাকি কান্নাকে দমিয়ে রাখে, আর অন্য দিকে নারীদের শরীরের প্রোল্যাক্টিনের ফলে তাঁদের কান্নার প্রবণতা বেশি। কিন্তু এই দু’টি হরমোনের উপস্থিতিই যে কান্নাকে সর্বদা নিয়ন্ত্রণ করবে, তা কিন্তু নয়।
‘এমন দিন কি হবে তারা।
(যবে) ‘তারা’ ‘তারা’ ‘তারা’ বলে (দুনয়নে) তারা বেয়ে পড়বে ধারা॥
হৃদিপদ্ম উঠবে ফুটে, মনের আঁধার যাবে ছুটে,
(তখন) ধরাতলে পড়ব লুটে, ‘তারা’ বলে হবো সারা…’ (রামপ্রসাদ সেন)
মানুষের যে কত কারণে কান্না, ভাবি বসে বসে! ঈশ্বরপ্রেমে ব্যাকুল হৃদয় কাঁদে যখন, তখন সে কান্না আর এক রকম। ভক্তিরসে বারিধারা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কান্না ছিল ঈশ্বরবিরহে, মা কালীর দর্শন পাওয়ার ব্যাকুলতায়। দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী মায়ের দর্শনের জন্য আকুল ছিলেন তিনি। কখনও কখনও সেই আকাঙ্ক্ষা এতটাই বেড়ে যেত তা দমন করতে না পেরে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেন। অশ্রুপ্লাবন বইত তখন তাঁর, কেঁদে আকুল হয়ে প্রার্থনা করতেন। চৈতন্য মহাপ্রভুর কান্নাও ছিল ঈশ্বরপ্রেমের চরম ব্যকুলতা। শিশু নিমাই যখন কাঁদতেন, তখন প্রতিবেশীরা হরিনাম করলেই নাকি তাঁর কান্না প্রশমিত হত। এর থেকে মনে করা হয়, তিনি জন্ম থেকেই দিব্যপ্রেমে মগ্ন ছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কান্না মূলত শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তীব্র আকর্ষণের কারণে হত। তিনি যখনই কৃষ্ণের কথা শুনতেন বা স্মরণ করতেন, তখনই প্রেমের আতিশয্যে তাঁর অশ্রুপাত হত। তাঁর কান্না ব্যক্তিগত দুঃখের প্রকাশ নয়, বরং জীবজগতের উদ্ধারের জন্য ঈশ্বরের করুণা ও প্রেমের কান্না।
কান্না যে কত ভাবে কত সময় আসে! স্বপ্ন দেখেও কেঁদে ওঠে অনেকে ঘুমের মধ্যে। আমার দিদিমাকে দেখেছি তাঁর মৃত্যুর কয়েক দিন আগে রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠতে। নিশ্চয়ই স্বপ্নই দেখতেন কোনও, কোনও দুঃস্বপ্ন। যদিও পরের দিন সকালে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারতেন না। নিশ্চয়ই অবচেতন মনের তীব্র কোনও আবেগ, অথবা চাপা পড়ে থাকা কোনও দুঃখে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠতেন।
মনে পড়ে, এক রাতে আমিও কাঁদছিলাম স্বপ্নে। সেই স্বপ্ন জুড়ে আমার মৃত বোন টিঙ্কু। দেখছি সে কোমায় শুয়ে আছে, আমি তার সামনে বসে। হঠাৎই কোমা থেকে উঠে বলছে ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে, আমাকে কিছু খেতে দাও’। বুক মুচড়ে উঠেছিল। আহা রে! কত দিন খায়নি ও! ঘুম ভাঙার পরও রেশটা কাটছে না, কেঁদেই যাচ্ছি। কত বছর হয়ে গেল টিঙ্কু চলে গেছে। সেই যে ডাক্তার অপারেশন করতে নিয়ে গেল টিঙ্কুকে, দু’গালে জল নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকল টিঙ্কু। অপারেশনের পর জ্ঞান এল না আর। তার পর বাড়িতে যখন টিঙ্কুকে আনা হল, বাবা কাঁদছেন, মা কাঁদছেন, পুত্র কাঁদছে, সারা বাড়ি ভরে উঠেছে জলে। এত অশ্রুজল! সেই থেকে সারা পৃথিবী বাবা-মায়ের চোখ থেকে টলটলে দুঃখ সব জড়ো করে সমুদ্রের পরে আরও সমুদ্র করেছে সৃষ্টি। সেই থেকে ল্যাভেন্ডার সন্ধেগুলো ব্ল্যাকআউট পুরো। সেই দিন থেকে সব প্রেম শূন্য মেখেছে গায়ে। সেই দিন থেকে বন্ধুদের জন্মদিন আর বিবাহবার্ষিকী সব মুছে সাদা হয়ে গেছে। সেই থেকে সারা আকাশ শুধু আমার ছোট বোনের মৃত্যুদিন, আর, বাবা-মায়ের দুঃখজলে তৈরি মহাসমুদ্র।
এ কোনও গদ্য নয়, আত্মকথন, যেন ডায়েরি থেকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উড়ছে ফড়ফড়। মন কেমন করে। দুপুরবেলা একলা ঘরে। নির্ঘুম রাতে। সূর্যডোবা বিকেলে। মন কেমন করে। হঠাৎ কোনও ভোরবেলা ঘুম ভেঙে আবছা আকাশের দিকে তাকিয়ে কিংবা কোনও বৃষ্টির দিনে ছাই- ছাই মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকলে কেন জানি না, আমার ভীষণ মন কেমন করে, খুব। রাত্রিবেলা অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন শুনলে বুক কেঁপে ওঠে। ভীষণ জোরে ঝড় উঠলে, সোঁ-সোঁ শব্দ হলে মনটা আমার কেঁদে ওঠে খুব। ঘরে অন্ধকার আছড়ে পড়ে যখন, অশান্ত হয়ে ওঠে হৃদয়। মনটাও কেমন যেন হয়। আমার তো কোনও আলো নেই। না ঘরে, না আকাশে, না দূরে কোথাও। কোনও আলোই নেই। আমার কোনও রামধনুও নেই। আমার আছে অশ্রুজল দু’গাল ছাপিয়ে। দু’চোখের ঝাপসা ছাপিয়ে বার বার খুঁজতে চাই এত বারিধারা কে দিল আমায়! খুঁজে পাই না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে