শৈলমন্দির: আলমোড়ায় পাহাড়ের কোলে কাসার দেবীর মন্দির। ডান দিকে, মন্দির গর্ভগৃহে কাসার দেবী বা কাত্যায়নী দুর্গার বিগ্রহ।
সে প্রায় একশো তিরিশ বছর আগের কথা। স্বামী বিবেকানন্দ এসেছেন আলমোড়ায়, স্থানীয় অধিবাসীদের আমন্ত্রণে। আলমোড়ায় একা একা ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছন স্থানীয় এক দেবীমন্দিরে। আলমোড়া থেকে দশ-বারো কিলোমিটার দূরে, নির্জন পাইন গাছে ঘেরা অনুচ্চ টিলার মাথায় এই মন্দির। পৌঁছে চমকে ওঠেন তিনি। কিছু একটা আছে এখানে। মনঃসংযোগ বা ধ্যানের জন্য আদর্শ। মন্দির-সংলগ্ন ছোট গুহায় তিনি ধ্যানে বসেন। দু’দিন টানা ধ্যান শেষে মনটা এক অপূর্ব তৃপ্তিতে ভরে ওঠে তাঁর। বুঝতে পারেন, হিমালয়ের এখানে এক অলৌকিক শক্তির আধার মন্দিরটি। উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ায় মন্দিরটি কাসার দেবী মন্দির নামে পরিচিত।
স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমেই সকলের সামনে আসে আলমোড়ার কাসার দেবী মন্দিরের কথা।
শুধু স্বামী বিবেকানন্দ নন, কাসার দেবীর মন্দিরের অলৌকিক শক্তির টানে বিভিন্ন সময় সারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী, গায়ক, কবি, দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বাউন্ডুলে হিপির দলও। সে তালিকায় আছে অ্যালেন গিনসবার্গ, বিটল-খ্যাত জর্জ হ্যারিসন, জওহরলাল নেহরু, গায়ক বব ডিলান, লেখক ডি এইচ লরেন্স, ক্যাট স্টিভেন্স, টিমোথি লিয়ারি, আলফ্রেড সোরেনসেন, রিচার্ড এলপার্ট ও আরও অনেকে।
স্বামী বিবেকানন্দ আলমোড়ায় যান দু’বার, ১৮৯০ ও ১৮৯৭ সালে। ১৮৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে দিন দুয়েক আলমোড়ার কাসার দেবী মন্দির সংলগ্ন গুহায় ধ্যান করেন। স্বামীজির বড় প্রিয় জায়গা ছিল আলমোড়া। আলমোড়ার অধিবাসীদের উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেন, “তোমরা সকলে জান আমি এখানে বাস করার জন্য বারবার চেষ্টা করেছি এবং যদিও উপযুক্ত সময় না আসায় এবং আমার হাতে অনেক কাজ থাকায় এই পবিত্র ভূমি ত্যাগ করে বাইরে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়েছি।…আমার আশা... এই পর্বতরাজের মধ্যে কোন একস্থানে আমি আমার জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাব।”
স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিধন্য আলমোড়ায় ১৯১৬ সালে স্বামী তুরীয়ানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন। বিবেকানন্দের আসার কথা উল্লেখ করে উত্তরাখণ্ড পর্যটন বিভাগ কাসার দেবী মন্দিরের পাশে একটি ফলক স্থাপন করেছে।
আলমোড়ার কাসার দেবী মন্দির আসলে দুর্গা মন্দির। উত্তরাখণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুর্গা মন্দির। কালমাটিয়া পাহাড়ে কাসার দেবী বা কাত্যায়নী দেবীর মন্দির। দেবী এখানে সিংহবাহনা। বড় রাস্তা থেকে কয়েকশো সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয় মন্দিরে, কিন্তু সিঁড়ি ভাঙতে কারও কষ্ট হয় না।
পুরাণমতে রাক্ষস ও গন্ধর্ব মিলে প্রতিষ্ঠা করে এই মন্দির। দেবী দুর্গা এখানে প্রকৃত অর্থেই শক্তিরূপেণ সংস্থিতা। মন্দির প্রায় দু’হাজার বছরের পুরনো। স্কন্দপুরাণ মতে, মা দুর্গা দেবী কাত্যায়নীরূপে এখানে শুম্ভ-নিশুম্ভ নামে দুই রাক্ষসকে হত্যা করেন। মন্দিরে দুর্গার অষ্টরূপের এক রূপ দেবী কাত্যায়নী বা কাসার দেবী। স্থানীয় লোককথা মতে, শুম্ভ-নিশুম্ভ নামে দুই রাক্ষসকে হত্যা করার পর দেবী ক্রোধ নিবারণের জন্য এখানে গুহায় ধ্যানে বসেন। দেবীর মানসিক শান্তি ছড়িয়ে যায় এখানকার গুহা-পাথরে। সেই থেকে এটা শান্তিস্থল, উদ্বেগ থেকে মুক্তির পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯১০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পাহাড়ি অঞ্চলে মন্দির এলাকা পাইন, দেবদারু আর ওক গাছে ঢাকা। মন্দিরের চার দিকে পাহাড়ের বুকে রয়েছে অনেক ছোট ছোট গুহা। মূল মন্দির চত্বরে রয়েছে শিব ও ভৈরবের মন্দির। পাশেই সারদা মঠ, বুদ্ধ আশ্রম। একেবারে নির্জন, নির্মল শান্ত সবুজে ঘেরা অঞ্চল। এখানে এলে মন এমনিতেই হয়ে ওঠে শান্ত।
কাসার দেবী পাহাড়ের পাশেই রয়েছে হিপি পাহাড় বা ক্রাঙ্কস রিজ। ১৯৬০-৭০ সালে পাইন বনে ঘেরা হিপি পাহাড় বিখ্যাত হয়ে ওঠে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা শিল্পী, লেখকের উপস্থিতিতে। বিশ্ব জুড়ে হিপি আন্দোলন দানা বেঁধেছিল এই শৈলশিরার শক্তিশালী শান্তিস্থল এবং আশপাশের জঙ্গলে বন্য মাদকের পর্যাপ্ত উপস্থিতির কারণে।
খাসিয়া গোষ্ঠির নেতা গাজোয়াকে যুদ্ধে হারিয়ে কুমায়ুনের খাগামারা দখল করেন চন্দ্রবংশীয় রাজা বালকল্যাণ। সেখানে গড়ে তোলেন নতুন রাজধানী আলমোড়া। ১৫৬০ সালে কুমায়ুনের রাজা কল্যাণ চাঁদ আবিষ্কার করেন আলমোড়াকে। ১৭৯৮ সালে আলমোড়া গোর্খাদের দখলে যায়। তার পর ১৮১৫ সালে। ১৮১৫ সালে গোর্খাদের হারিয়ে কুমায়ুনের দখল নেয় ব্রিটিশরা, ওদের জেলাসদর হয় আলমোড়া।
কী এমন রহস্যময় শক্তি আছে কাসার দেবীর মন্দিরে? কেনই বা যুগ যুগ ধরে আধ্যাত্মিক শক্তির সন্ধানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন মানুষ?
কাসার দেবীর মন্দিরের শক্তিরহস্য ভেদ হয় স্বামীজির পদার্পণের একশো বিশ বছর পর।
বিজ্ঞানীরা দেখেন, কাসার দেবী মন্দির ভ্যান অ্যালেন বেল্টে অবস্থিত। সে কারণে এখানে তীব্র ভূ-চুম্বকীয় ক্ষেত্র লক্ষ করা যায়। মাটির নীচে রয়েছে বিপুল ভূ-চুম্বকীয় পদার্থ। এর প্রভাবে এখানে সর্বক্ষণ হয়ে চলেছে ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন। ২০১৩ সালে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা-র বিজ্ঞানীরা কাসার দেবীর মন্দিরে এসে গবেষণা চালান। প্রায় দু’বছর ধরে তাঁরা সেখানে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। নাসার যন্ত্রে ধরা পড়ে কাসার দেবীর মন্দিরে ভ্যান অ্যালেন বেল্টের অস্তিত্ব। ভ্যান অ্যালেন বেল্ট এমন একটি অঞ্চল, যেখানে প্রচুর পরিমাণে তড়িৎ-চুম্বকীয় কণা পাওয়া যায়। এ ধরনের কণার উৎস সৌরঝঞ্ঝা। পৃথিবীর ভূ-চুম্বকীয় আর্কষণ ধরে রাখে তড়িৎ-চুম্বকীয় বা ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক কণাকে।
কোনও কোনও সময় ভ্যান অ্যালেন বেল্ট তৈরি হয় সাময়িক ভাবে। বিজ্ঞানী জেমস ভ্যান অ্যালেন বিষয়টি আবিষ্কার করেছিলেন বলে তাঁর নামানুসারে ক্ষেত্রটির নামকরণ হয় ভ্যান অ্যালেন বেল্ট। ভ্যান অ্যালেন বেল্টে প্রচুর পরিমাণে ইলেকট্রন, প্রোটন, আলফা কণা থাকে। কাসার দেবীর মন্দির বাদে পৃথিবীতে মাত্র দু’টি স্থায়ী ভ্যান অ্যালেন বেল্ট আছে— পেরুর মাচুপিচু এবং ব্রিটেনের স্টোনহেঞ্জ। এই দু’টি ইউনেস্কোর হেরিটেজ অঞ্চল হিসাবে ঘোষিত।
কাসার দেবী মন্দিরে এলে অনেকের ভাল লাগে, মানসিক ভাবে হালকা বোধ হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভাল লাগে, তার রহস্য জানা ছিল না। নাসা-র গবেষণা সে রহস্য ভেদ করে। প্রচুর পরিমাণে তড়িৎ-চুম্বকীয় কণার উপস্থিতি কাসার দেবীর মন্দিরকে করে তুলেছে অদ্বিতীয়। মানুষের মনে ও শরীরে তড়িৎ-চুম্বকীয় কণা আনে এক বিশেষ অনুভুতি। এখানে রয়েছে প্রবল ধনাত্মক বা সদর্থক শক্তিপ্রবাহ। যার স্রোত মানুষের মনে আনে মানসিক প্রশান্তি।
তেজস্ক্রিয় কণার সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে ধ্যান করার সময় পাওয়া যায় আধ্যাত্মিক চেতনার এক অপূর্ব তৃপ্ত অনুভুতি। তা হয়তো প্রভাব ফেলে আমাদের সৃজনশীলতার মূলে। যে কারণে যুগ যুগ ধরে সাধু-সন্ন্যাসী ছাড়াও সৃজনশীল মানুষজনও দেশ-বিদেশ থেকে আলমোড়ার এই মন্দিরে ছুটে আসে শুধুমাত্র মোক্ষলাভের আশায়।
কাসার দেবীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য যোগ আশ্রম ও মেডিটেশন সেন্টার। ভ্যান অ্যালেন বেল্টের সৌজন্যে তারা শরীর ও মনের প্রশান্তির গ্যারান্টি দিয়ে থাকে।
গত বিশ-পঁচিশ বছরে প্রচারের আলোয় কাসার দেবী। বছরভর বিদেশি পর্যটকদের ঢল লেগেই থাকে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে কার্তিক পূর্ণিমায় বড় মেলাও বসে মন্দিরকে কেন্দ্র করে।
তথ্যসূত্র: আলমোড়া অভিনন্দনের উত্তর (বিবেকানন্দ রচনাসমগ্র);স্বামী বিবেকানন্দ’জ় ডেজ় অবপিস ইন উত্তরাখন্ড হিলস-যশকিরণ চোপড়া;উত্তরাখন্ড ট্যুরিজ়ম ওয়েবসাইট
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে