দর্শনীয়: ইনলের মাছ-শিকারিরা এই অভিনব প্রথায় মাছ-শিকারের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছে
এই হ্রদ মায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলভাগ। সেখানে ইনথা জনজাতির মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার একটা নিজস্ব পদ্ধতি আছে। ধরেন না। ইনথাদের এই মাছ-শিকারের কৌশল আটশো বছরের পুরনো।
বিনয়েন্দ্র সাহা রায়, কলকাতার ছেলে, দু’দশকের উপর কাজের সূত্রে সপরিবার ইয়াঙ্গন-প্রবাসী। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পর ওর কথাতেই মায়ানমার যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী হই। মানচিত্র খুলে প্রথমেই চোখ পড়ল সান মহকুমায় হিল ট্রাইব অঞ্চলে।
বিনয়েন্দ্র বলল, রিমোট হিল ট্রাইব এরিয়ায় যাওয়াটা ঝুঁকির। সেনা শাসনে জায়গাটা স্পর্শকাতর। ২০২১-এ আউং সান সু-চিকে জেলে পাঠানোর পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে, পর্যটকেরা ওদিকে কম যায়। অথচ প্রকৃতির অকৃপণ দানে ভরা অঞ্চলটি। আরও জানলাম, নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত মুসলিম রোহিঙ্গাদের ডেরা বাংলাদেশ-ঘেঁষা রাখাইন অঞ্চলে। শান জেলার উল্টো দিক উত্তর-পূর্বে, তাইওয়ান, আর লাও-এর সঙ্গে সীমানা ভাগ করে নিয়েছে। ওখানকার বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসন চেয়ে বন্দুক তুলেছিল। আপাতত শান্তিকল্যাণ। ইনলে লেকে স্বাধীন ভাবে নৌকাবিহার করা যাবে। মাথাপিছু ১০ আমেরিকান ডলার।
ইনলে লেকে ইনথা জনজাতির মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার নিজস্ব পদ্ধতি আছে। বর্মি ভাষায় ‘ইন’ মানে হ্রদ এবং ‘থা’-এর অর্থ মানুষ। এঁরা নিজেদের ইনলে হ্রদের সন্তান মনে করেন। পৃথিবীর আর কোথাও মৎস্যজীবীরা এমন ভাবে মাছ ধরেন না। এই ঘটনার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ইয়াঙ্গন থেকে হেহো যেতে হবে ফ্লাইটে। এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে ‘ন্যাউং-শ্বে’ টাউনশিপ, কাছেই ইনলে হ্রদ। সেখানকার প্রায় দু’লক্ষ মানুষের সিংহভাগই ‘ইনথা’ জনজাতি।
এক বার ইনথা জনজাতির মানুষেরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে ‘নৌকা বিক্ষোভ’ করে প্রতিবাদ করেছিল। বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিতেই সামরিক শক্তি হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে নির্যাতন চালায়। এর ফলে ইনলের পর্যটনশিল্প মার খেল, জেলেদের ঐতিহ্যবাহী পেশা থমকে গেল। মারাত্মক অর্থনৈতিক সঙ্কট হল। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘেঁটে গেছে, তাই বিদেশি পর্যটকরাও বেশি আসছেন না। ইনথাদের ‘পিপল’স ডিফেন্স ফোর্স’ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। দক্ষিণ শান রাজ্যের বিদ্রোহীরা প্রতিবেশী দেশের একই বংশোদ্ভূত আর্মড গেরিলা ফোর্সের সাহায্যে জান্তা ফৌজের উপর নিয়মিত হামলা চালাচ্ছিল। আপাতত বিদ্রোহীরা নীরব। গণপ্রতিরোধ সমস্ত জনজাতির মানুষকে এককাট্টা করলেও, ভুক্তভোগী হলেন ইনথা মানুষেরা। সব কিছু জানিয়ে বিনয়েন্দ্র বলল, “ঘুরে দেখুন, ভাল লাগলে সবাইকে জানান। এটা সত্যিই একটা দেখার মতো জায়গা।” বিনয়ের কথাগুলো আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করল। অতএব চরৈবেতি।সড়কপথে শান এলাকায় যাওয়ার অনুমতি মেলেনি। রুটটা স্পর্শকাতর। হেহো বিমানঘাঁটি থেকে ‘ন্যাউং-শ্বে’ যাওয়ার রাস্তায় মিলিটারি চেক-পয়েন্টে আমাদের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ট্যাক্সিচালককে ওয়ার্নিং দেওয়ার ভঙ্গিতে কী যেন বলল এক বন্দুকধারী। মনে হল, বহিরাগত পর্যটক নিয়ে আপত্তি।আমরা পিনদায়া অঞ্চলে থান টাউং গ্রামে থামলাম, যেখানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছিল। স্থানীয় স্কুলের বাচ্চাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিয়ে নাচ-গানের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল, ওরা সব দানু এথনিক জনজাতি। বিদেশি দেখে ক্যামেরায় পোজ়, বসার জন্য চেয়ার, দানু সংস্কৃতির ঘরে-তৈরি চায়ে আপ্যায়ন করল।ইনলে-তে সেসময় আর কোনও বিদেশি পর্যটককে দেখিনি। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের আলাদা করে চিনে রাস্তার মহিলা পণ্য-বিক্রেতারা ছেঁকে ধরছিলেন তাঁদের কুটিরশিল্পজাত জিনিসপত্র বিক্রি করার জন্য।দ্বিতীয় দিন ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়েছিলাম। হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম বোটঘাটের উদ্দেশ্যে। বোট এজেন্সির অফিসে কাচের শো-কেসের মধ্যে আউং সান সু চি-র একটি হাতে-আঁকা ছবি, একটু আড়ালে রাখা। এঁদের ‘দ্য লেডি’র প্রতি আনুগত্য গভীর। এখানে জনপ্রিয় নেত্রী সু চির ছবি রাখলে বিদ্রোহী বলে ধরে নিয়ে যায়।
প্রাইভেট নৌকো ভাড়া করেছিলাম। মায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলভাগ ইনলে লেক চিরে খেয়া পার হচ্ছি আকাশি মোটরবোটে। ইনথা জনজাতির মানুষেরা কী ভাবে মাছ ধরে, সেটা চাক্ষুষ করাই উদ্দেশ্য। হ্রদের মেঝেয় শক্ত ভাবে গেঁথে রাখা লম্বা খুঁটির উপর মাচার ঘরবাড়ি, বাজার, মন্দির, স্কুল। নৌকাই যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। কোনও দিন দুর্ঘটনা হয়নি। কেউ জলে পড়ে যায়নি। মাছ ধরা, চাষবাস সব ভাসমান জমিনে, অনেকটা মণিপুরের লোকতাক হ্রদের ফুমদির মতো।
পাশ দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দে মোটরচালিত ডিঙিনৌকোগুলো ফোয়ারা তৈরি করে চলে যাচ্ছে। দমকা বাতাসে মিহি চিরুনির মতো জলের ছাঁট মুখে এসে লাগে। সকালের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতেই, শিশিরসিক্ত মাটির আর্দ্র সুবাসে ফুসফুস ভরে উঠল। শান্ত জলরাশি, ভাসমান নাওয়ে জলের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, কোলাহলমুক্ত এক মায়াবী পরিবেশে হারিয়ে যাওয়া। জীবনের অন্যতম সেরা জলভ্রমণের নান্দীপাঠ তৈরি হচ্ছে, বুঝতে পারছিলাম।
সরু ফিডার চ্যানেলের শেষে ইনলে লেকের বিস্তৃতিতে প্রবেশ করতেই উপলব্ধি হল, জায়গাটা সত্যিই আলাদা। এখানে এসে নৌকোর গতি স্থির। পশ্চাৎপটে শান পাহাড়, হ্রদের নীল জল, তার বিপরীতে হলুদ রঙের প্যান্ট আর সাদা জামা পরা এক মৎস্যজীবী নৌকোর উপর ঝাঁপ-ঝুড়ি ও দাঁড় নিয়ে ওয়াটার ব্যালে করছেন। একেবারে ছবি তোলার মতো দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, দোদুল্যমান নৌকোর কিনারায় দাঁড়িয়ে খুবই আশঙ্কাজনক অবস্থায় সেই মৎস্যজীবী মাছ ধরছেন। মুহূর্তের মধ্যেই বুঝি পড়ে যাবেন জলে! কিন্তু কাছে গেলে ভুল ভাঙে— অগভীর হ্রদ, শুষ্ক মরসুমে গভীরতা মোটে দু’মিটার। তাই বিপদবিহীন ঝুঁকি। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই অদ্ভুত কৌশল শৈশবেই রপ্ত হয়ে যায়। জীবিকার তাগিদে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কঠোর পরিশ্রমে দিন কাটে এই ভয়হীন মৎস্যজীবীদের।
এঁরা যেন জলের উপর ভারসাম্য রাখার জাদুকর। একাগ্রচিত্তে একটা পা হালের সঙ্গে পেঁচিয়ে, সোজা হয়ে যখন লেগ রোয়িং করে জলের তালে দুলে দুলে মাছ ধরেন, তখন শরীর ও ক্ষেপণী এক হয়ে যায়। অন্য পায়ে ডিঙির উপর চাপ দিয়ে নৌকো পাক খাওয়ান, দাঁড় নিয়ন্ত্রণ করে পানসির গতি কমান তাঁরা। ঘন নলখাগড়া, উদ্ভিদের মধ্য দিয়েও নিখুঁত নৌকা চালনা, রোদে-পোড়া মুক্ত দু’হাতে শঙ্কু-আকৃতির মাছ ধরার ফাঁদ। এই ভাবে মাছ ধরতে প্রয়োজন চরম দক্ষতা, ভারসাম্য ও বাহুবল। ছোটবেলা থেকে মহড়ার মাধ্যমে অর্জন করা। দেখলে মনে হয় সোজা, কতটা কঠিন খেয়া-মাল্লা নেইন মোয়ে সেটা বোঝালেন।
দ্বাদশ শতক থেকে প্রচলিত ইনথাদের এই তরী বাওয়ার পদ্ধতিটি মাছ শিকারের এক চতুর কৌশল। দাঁড়িয়ে থাকার ফলে জলের গভীরে দূর পর্যন্ত দেখা যায় এবং বুদবুদ দেখে মাছের অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হয়। এর পর আট ফুটের ‘সাউং’ (জালযুক্ত ঝুড়ি) সম্ভাব্য টার্গেটের উপর আছড়ে ফেলে ও কাদামাটিতে চেপে ধরে, ‘ঙ্গা-মিয়ার-থান’ নামে এক ধরনের কাঁটাযুক্ত বঁড়শি ব্যবহার করে মাছ ধরা হয়। জলের উপর স্থিতি, পায়ে কর্মের গতি— এটাই প্রাচীন শিল্প ও ইনথাদের জীবনদর্শন। শিকারে উঠেছে তেলাপিয়া, ছোট চিংড়ি, আর কয়েকটা কার্প। বড় মাছ চিতল, শোল তখনও ধরা পড়েনি।ইদানীং এই কৌশল অচল। পরিবর্তে চাঁদি জাল (ড্রিফট নেট) ব্যবহার হচ্ছে। ‘সাউং’ এখন একটা মিথ, মূলত পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য প্রদর্শিত হয়। মৎস্যজীবী মানুষটি আমার হাতে ক্যামেরা দেখে না বলতেই বিভিন্ন ভঙ্গিতে পেশাদার মডেলদের মতো পোজ় দিলেন। আমি কিছুক্ষণ তাঁকে দেখলাম, তার পর আমার ক্যামেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল।অনেকে এটাকে টুরিস্ট ট্র্যাপ বললেও, আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। মানুষটি ছবি তোলায় বাধা দিলেন না, টাকার জন্য জোরও করলেন না। আমিই বরং হাত বাড়িয়ে একটা পাঁচ হাজার কিয়াতের (দু’শো টাকা) নোট বাড়িয়ে ধরেছিলাম। ধীরছন্দে তিনি নৌকা কাছে নিয়ে এসে, সেইটুকু টাকা গ্রহণ করে বললেন, ‘জেজু আ-ম্যা-জি তিম বাদে’, যার অর্থ ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ’। তার পর একটা কার্প মাছ দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ‘মিঙ্গালাবা’ বলে অভ্যর্থনা করলেন। এর মানে, ‘অসাধারণ অভিজ্ঞতা’।
নেইন মোয়ের আক্ষেপ— কোভিড অতিমারি, সামরিক অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ, মানুষের সৃষ্ট বিপদে রুজি-রোজগার লাটে উঠেছে। ২০২৬-এ আমরাই ওঁর প্রথম ‘ফরেন ক্লায়েন্ট’। পরিবারের ভরণপোষণ করাই কঠিন হয়ে উঠছে। প্রমোদভ্রমণেও কাস্টমারের নামগন্ধ নেই, টানাটানির বাজারে মৎস্যজীবীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে, মাছ উঠছে কম।মনে আসে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। গভীর সমুদ্রে এক বিশাল মাছের সঙ্গে এক বৃদ্ধ ধীবরের অবিরাম লড়াইয়ের কাহিনি। মাছ ধরে আর পেট চলে না, তবুও ইনলের মৎস্যজীবীরা এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁদের জীবনদর্শনের মতো।
সমাজের বোঝা, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, সংসারে অভাব, তবুও জনজাতির মানুষদের মনের গভীরতা অতলস্পর্শী। জেলেরা যেন প্রকৃতিরই অঙ্গ। সরল জীবনযাপন, সুখী হতে বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই, এটাই ওঁদের বেঁচে থাকার মূল কথা। আর নৌকোয় দাঁড়িয়ে ভাটিয়ালি গান যেন এক জীবন্ত কবিতার রূপকথা। দাঁড় বাইতে বাইতে নাইয়া গুনগুন গান গাইছেন। গানের কথার মানে বুঝিনি, কিন্তু মনে মনে আমিও গলা মেলালাম, ‘ইনলের জলধিজলে, এক পায়ে নাও চলে/ জালিয়া তালে জাল ফেলে, চকচকে মাছ ভাসা দলে/ রোদের তাতে জল ঝলমল, ইনলে হ্রদে মাছের দল...’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে