স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘দ্য বিএফজি’ ছবির দৃশ্য।
ভোরবেলায় সব কিছুই এক ঘাট বেশি নরম থাকে। শহরতলির ফার্স্ট ট্রেনের যাত্রী, সকালের প্রথম মেট্রো-চড়ুয়াদের মুখ দেখলে মনে হয়, কাজে যেতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কপালে ভাঁজ নেই। ভুরু কুঁচকোনো না, ঠোঁট নয় বিরক্তি-বঙ্কিম। শহরের ধূসরকেও একটু বেশি রঙিন মনে হয়, ঘাসকে একটু বেশি সবুজ। মানুষ এখনও আড়মোড়া ভাঙছে, শুরু হয়নি দিনের ব্যস্ততা। জীবন জেগে উঠছে একটু একটু করে।
এই সব অসতর্ক মুহূর্তেই, রাত-প্রহরাও খানিক শিথিল, ভঙ্গুর থাকে। মনে হয়, যেন দিব্যি ঢুকে পড়া যেতে পারে জীবনে যেখানে কোনও দিন প্রবেশাধিকার মিলবে কি না সন্দেহ, সেই জায়গাগুলোতেও। যেমন ভেবেছিল মাইকেল ফেগান। লন্ডনের বাসিন্দা, বছর তিরিশের লোকটা ১৯৮২ সালের ৯ জুলাই সকালে এসে হাজির বাকিংহ্যাম প্যালেস-এর বাইরে। ক’দিন আগেই সে তার বাচ্চাদের নিয়ে এসেছিল সেখানে। বাড়ি ফিরে মজা করে বলেছিল, ‘আমার গার্লফ্রেন্ড-এর বাড়ি দেখিয়ে নিয়ে এলাম ওদের।’ কে গার্লফ্রেন্ড? ফেগান বলত, তার নাম এলিজাবেথ রেজিনা। বাকিংহ্যাম প্যালেসে থাকে। মানে? রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ! বাড়ির লোকে বিশেষ পাত্তা দিত না ফেগানকে। বেচারার বউ ছেড়ে চলে গেছে কিছু দিন আগে, তিন-চারটে ছেলেপুলে মানুষ করার ভার তার ওপরেই। এ দিকে কাজকর্ম বিশেষ করে না, রোজগারপাতি নেই। মাথাটা খানিক বিগড়েছে, তাই ও সব ভুলভাল বকে। তবে হ্যাঁ, রাজপরিবার, বিশেষ করে রানির ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর। নিজের সগর্ব পরিচয় দেয় ‘রয়্যাল ফ্যানাটিক’ বলে। তা দিক, শাসকভক্ত তো অনেকেই হয়, ক্ষতি তো করছে না কারও!
বাকিংহ্যাম প্যালেসের বাইরে ১৪ ফুট উঁচু দেওয়াল, মাথায় স্পাইক আর খোঁচা-খোঁচা তার জড়ানো। আম-মানুষ রামভিতু, ওই পাঁচিল টপকানোর স্পর্ধাই দেখাবে না। ফেগান কিন্তু দিব্যি হাঁচড়ে-পাঁচড়ে, লাফিয়ে ডিঙনু দেওয়াল। না হয় সবে ভোর ছ’টা, কিন্তু কী আশ্চর্য, বাকিংহ্যাম প্যালেসের বিশ্ববিখ্যাত নিরাপত্তাবাহিনী ‘রয়্যাল গার্ড’, সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের মতো ভয়াল বিশাল পুলিশ কুকুর, কেউ কোত্থাও নেই! প্রাসাদের পশ্চিম দিকের একটা জানলা অবধি খোলা! ফেগান উঠে দেখে, সেই ঘরের দরজাটা ও পাশ থেকে বন্ধ। তাই ফের নেমে এসে, প্রাসাদের গায়ে একটা ড্রেনপাইপ বেয়ে উঠে পড়ল একটা লম্বা, টানা করিডরে। দু’পাশে দুর্দান্ত সব পেন্টিং। এক জায়গায় অসাবধানে কাচের একটা অ্যাশট্রেতে হাত লেগে সেটা ভেঙে গেল, হাতও কেটে গেল ফেগানের। ঘুরতে ঘুরতে ঠিক এক সময় সে পৌঁছে গেল খোদ রানির ঘরের সামনে। মানে একেবারে তার ‘গার্লফ্রেন্ড’-এর বেডরুম!
রাজকীয় পালঙ্ক, বিলিতি কায়দার ফোর-পোস্টার বেড, পরদা-টানা। এক পাশের পরদা সরাতেই এলিজাবেথের ঘুমটা গেল ভেঙে। আতঙ্কিত ইংল্যান্ডেশ্বরী দেখলেন, একটা লোক তাঁর বিছানার কোণে বসে আছে! প্রাণভয়ে লাফিয়ে উঠে, কোনও মতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখানে কী করছ?’ হাতের কাছে রাখা অ্যালার্ম বেল টিপলেন। কেউ এল না। মাথার পাশে ফোন টিপে, প্যালেসের রিসেপশনিস্টকে বললেন, আমার ঘরে পুলিশ পাঠাও। সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে রিসেপশনিস্ট সেই ‘কল’ পাঠাল রানির সিকিয়োরিটি-প্রধানের অফিসে। তবুও কারও দেখা নেই!
পাশের একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে কাজ করছিল এক পরিচারিকা। আর রানির পোষা কুকুরদের হাঁটিয়ে নিয়ে এসে সবে ফিরেছিল এক ফুটম্যানও। রানির চেঁচামেচিতে তারা এসে হাজির। তারা বুদ্ধি করে ফেগানকে বলল, আপনি একটা সিগারেট খাবেন? চলুন, ও দিকে চলুন। নিয়ে গেল রানির রান্নাঘরের দিকে। সিগারেট খাওয়াল, ফুটম্যান এক পেগ হুইস্কিও ঢেলে দিল গ্লাসে। অপরিচিত, সম্ভাব্য আততায়ীকে (যার হাতে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে!) যদি এই সব ছেলে-ভুলানো তরিকায় রানির থেকে দূরে রাখা যায়! তারও পরে পুলিশ এল, ফেগান বন্দি হল বাকিংহ্যাম প্যালেসে।
৯ জুলাই ১৯৮২ তারিখে মাইকেল ফেগান শুধু রানি এলিজাবেথের বেডরুমেই যে ঢুকে পড়েছিল তা নয়। ঢুকে পড়েছিল খোদ ইতিহাসে। গত শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ‘সিকিয়োরিটি ব্রিচ’ হিসেবে জ্বলজ্বল করছে ফেগানের বাকিংহ্যাম প্যালেসে ঢুকে পড়ার ঘটনা। সারা দেশে, সংবাদমাধ্যমে, পার্লামেন্টে হইচই পড়ে গিয়েছিল। রানির নিরাপত্তা-প্রধান, স্বরাষ্ট্রসচিব ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছিলেন রানির কাছে, রানি যদিও তা গ্রহণ করেননি। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে যে জল্পনা শুরু হয়: খাস রানির প্রাসাদও তা হলে আদৌ দুর্গম দুর্ভেদ্য নয়? তারও পাঁচিল টপকানো যায়? তারও জানলা খোলা থাকে আর সেটা বেয়ে দিব্যি উঠে ঢুকে পড়া যায় প্রাসাদে! নিজের শোওয়ার ঘরেও রানি তবে অরক্ষিত থাকেন? পুলিশ কই?
ফেগানের ভাগ্য সহায় ছিল। পাঁচিল টপকানো তার কৃতিত্ব, কিন্তু প্রাসাদের জানলা খোলা থাকাটা পড়ে পাওয়া সুযোগ। আর সে পাইপ বেয়ে ওপরে উঠেছিল ছ’টার পর। প্রাসাদে তখন রক্ষীদের ডিউটি বদল হয়, রাতভর পাহারায়-থাকা রক্ষীরা চলে গেছে, নয়া শিফ্টের রক্ষীরা তখনও আসেনি। ওই মাঝের সময়েই ফেগান ঢুকে পড়ে প্রাসাদে। করিডর দিয়ে যাওয়ার সময় এক পরিচারিকা তাকে দেখে ‘গুড মর্নিং’ও জানিয়েছিল। সে সন্দেহই করেনি, ফেগান বহিরাগত! প্রাসাদের নাড়িনক্ষত্র না-জানা ফেগানের হাঁটাহাঁটিতে দু’বার বেজে উঠেছিল অ্যালার্মও। দু’বারই রক্ষী মনে করেছিলেন, অ্যালার্মগুলো পালটানো দরকার, ভুলভাল বাজছে। কেউ ভাবতেই পারেনি, বাকিংহ্যাম প্যালেসের বজ্রআঁটুনির মধ্যেও ফস্কা গেরো থাকতে পারে, বাইরের কেউ ঢুকে পড়ে সটান পৌঁছে যেতে পারে খোদ রানির ঘরে!
ওই ১৯৮২-তেই ব্রিটিশ লেখক রোয়াল্ড ডাল একটা ছোটদের বই লিখলেন, ‘দ্য বিএফজি’। পুরো নাম, ‘দ্য বিগ ফ্রেন্ডলি জায়ান্ট’। এই বছরেই যে বই থেকে দুর্দান্ত সিনেমা বানিয়েছিলেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। ছোট্ট মেয়ে সোফি আর এক ভাল দৈত্যের বন্ধুতার গল্প। সোফি থাকে ইংল্যান্ডেরই এক অনাথাশ্রমে, এক দৈত্য তাকে এক দিন তুলে নিয়ে যায়। সোফি দেখে, দৈত্য চব্বিশফুটিয়া আর কদাকার হলেও ভালমানুষ, তার কাজ ভাল ভাল স্বপ্ন ধরে, রাতে শিশুদের ঘুমের মধ্যে সেই স্বপ্নদের চারিয়ে দেওয়া। কিন্তু তার সঙ্গী অন্য দৈত্যগুলো খুব খারাপ, তাদের কাজ মানুষ ধরে ধরে খাওয়া। বিএফজি-কে তারা দু’চক্ষে দেখতে পারে না। ইংল্যান্ডকে বদদৈত্যহীন করার লক্ষ্যে সোফি হাত মেলায় ভাল দৈত্যের সঙ্গে। আর মানব-দানবের এই প্ল্যানের মধ্যেই ঢুকে পড়েন ইংল্যান্ডের রানি!
ভাল দৈত্য সোফিকে নিয়ে যায় বাকিংহ্যাম প্যালেসে, খোদ ঘুমন্ত এলিজাবেথের বেডরুমে। সোফিকে জানলায় বসিয়ে দিয়ে, রানিকে একটা দুঃস্বপ্ন দেখায়— খারাপ দৈত্যরা মেরে-খেয়ে ফেলছে ইংল্যান্ডের, সুইডেনের, বাগদাদের মানুষদের। শিউরে উঠে, ঘুম ভেঙে রানি দেখেন, তাঁর ঘরের জানলায় বসে একটা বাচ্চা মেয়ে! সোফি আর বিএফজি রানিকে আসন্ন বিপদের কথা বোঝালে, রানি ডেকে পাঠান তাঁর সেনাবাহিনী আর এয়ারফোর্স-এর দুই প্রধানকে। তার পর দৈত্যপুরীতে গিয়ে, সব খারাপ দৈত্যদের বন্দি করে, হেলিকপ্টারে বেঁধে উড়িয়ে নিয়ে এসে ফেলা হয় বিরাট একটা গর্তে। এলিজাবেথ মেরে ফেলেন না তাদের, শুধু ওদের মানুষ-খাওয়া জিভের স্বাদবদল ঘটাতে নিদান দেন, এখন থেকে ওদের বেঁচে থাকতে হবে শুধু নিরিমিষ খেয়ে!
বাস্তবের ফেগান আর শিল্পের সোফির গল্পে এমনিতে কোনও মিল নেই। শুধু দুটোই ঘটেছিল ১৯৮২ সালে, আর দুটোতেই কুইন এলিজাবেথ জড়িয়ে, এই যা। তলিয়ে দেখলে কিন্তু কয়েকটা জিনিস নাড়া দিয়ে যায়। ফেগান আর সোফি (এমনকী বিএফজি’ও), দুজনেই অখ্যাত, বহিরাগত। ‘বহিরাগতের প্রবেশ নিষেধ’ লেখা বাকিংহ্যাম প্যালেসে দুজনেই ঢুকে পড়ে তথাকথিত নিয়ম ভেঙে। গল্পের সোফি নাহয় বাচ্চা মেয়ে, তবু তার একটা সৎ উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ফেগানের? ১৯৮২-র সেই ‘হিস্টোরিক ট্রেসপাসিং’-এর ৩০ বছর পর, ২০১২ সালে ইংল্যান্ডের এক খবরের কাগজ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল মাইকেল ফেগান-এর। কেন সে দিন ঢুকেছিলেন রানির প্রাসাদে, প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধ ফেগান বলেন, ‘এমনিই। মনে হল ঢুকে দেখি, তাই ঢুকলাম! আগেও এক বার ঢুকেছি, সে বার খোদ রাজকুমার চার্লসের ঘরে ঢুকে ওঁর ওয়াইন খেয়ে এসেছি। জোর হিসি পেয়েছিল, কিন্তু ওয়াশরুম খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একটা ঘরে দেখি কুকুরের খাবারের খালি প্যাকিং বাক্স, তাতেই হিসি করলাম। আর একটা ঘরে তিন-তিনটে সিংহাসন রাখা ছিল, সব ক’টায় আরামসে বসেছি! সে বার ফিরে এসে মনে হল, আবার যাই। গেলাম। খোদ রানির বিছানায় রানিকে দেখতে ক’জন পায়! রানির রাতপোশাকটা কী রঙের, কী রকম ছাপা, তার ঝুলটা হাঁটু অবধি না আরও ছোট, সেও দেখেছি! ঘুম ভেঙে হতভম্ব রানি যখন বললেন ‘হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়ার?’, মনে হল, ওঁর এমন কণ্ঠ, যেন অসম্ভব দামি একটা কাচ খানখান মিহি হয়ে ভেঙে পড়ছে। আমার নিজেরই খুব ভয় করছিল। তার পর দেখি, ছোটখাটো মানুষটা আমারই ভয়ে, খালি পায়ে মেঝেতে দৌড়চ্ছেন!’
ফেগানের এই বাকিংহ্যাম প্রবেশ হয়তো সারা বিশ্বের অখ্যাত মানুষের স্বপ্ন। যিনি গোটা দেশটা দাপটে চালাচ্ছেন, সেই মানুষের নিজস্ব নিভৃতিতে ‘উঁকিঝুকি’। রূপকথার দৈত্য আর ছোট্ট সোফিও শুধু কল্পনা নয়, ঘোর বাস্তব। গল্প আর জীবন এ ভাবেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়!