রবিবাসরীয় প্রবন্ধ ২

জা স্ট যা চ্ছি

শুভময় মিত্রআকাশ ভেঙে পড়েছিল গত বছর। ঢালু উপত্যকায় ঝুমঝুমি বাজানো নদীটাকে অগ্রাহ্য করে জলের বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছিল কেউ। কার উষ্মা থেকে এত উত্তাপ জড়ো হয়েছিল, তার পর সেই তাপে গলে গিয়েছিল কত গোপন হিমবাহ অথবা কত স্বচ্ছ বাষ্প থেকে জমা হয়েছিল ভারী কালো মেঘ, স্যাটেলাইটের ঈগল-চোখের অন্তরালে, তা কেউ জানে না।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০১৪ ০০:০০
Share:

ছবি: লেখক।

আকাশ ভেঙে পড়েছিল গত বছর। ঢালু উপত্যকায় ঝুমঝুমি বাজানো নদীটাকে অগ্রাহ্য করে জলের বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছিল কেউ। কার উষ্মা থেকে এত উত্তাপ জড়ো হয়েছিল, তার পর সেই তাপে গলে গিয়েছিল কত গোপন হিমবাহ অথবা কত স্বচ্ছ বাষ্প থেকে জমা হয়েছিল ভারী কালো মেঘ, স্যাটেলাইটের ঈগল-চোখের অন্তরালে, তা কেউ জানে না। শুধু জল নয়, মৃত্যু-উপত্যকায় উন্মত্তের মতো নেমে আসা, লাগামছাড়া পাথরের স্রোতের মধ্যে কেউ একাকিত্ব অনুভব করার সুযোগ পায়নি। ঘর কে ঘর মানুষ ডুবে গিয়েছিল ঈশ্বরপ্রেরিত চলন্ত মৃত্যু-সরোবরে। শূন্যের অনেক ক্ষমতা। শূন্য জুড়ে জুড়ে তৈরি মৃত্যুর পরিসংখ্যান চলতে শুরু করে টিভি-স্ক্রিনের তলায়, কাগজের ছাপানো হেডলাইনে। তাণ্ডব থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের নিরাপদ ভ্যাপসা ড্রয়িংরুমে বসে, পাড় ভেঙে বাড়ি উলটে পড়া, জলের স্রোতে মাথা তুলে নির্বিকার ভাবে খাবি খাওয়া শিবমূর্তি, উদ্ধার করতে উড়ে যাওয়া এবং ফিরে না আসা হেলিকপ্টারের ফুটেজ দেখে মন্তব্য শুনেছিলাম, ‘এত পাপ সইবে কেন?’

Advertisement

জল ফুরোতে রোদ উঠল, ঝলমল করে উঠল ভিজে বধ্যভূমি। আবহবিদদের তৈরি সরকারি, দরকারি রিপোর্ট জমা পড়ল যথাস্থানে। কেদারের প্রাচীন মন্দিরের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ আছে, অক্ষত আছে তার চুড়ো জানতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম আমরা। আফটার অল ডিসগাস্টিং এই ডিজাস্টারটা শেষ হয়েছে বলে। বহু বছর ধরে মানুষের পায়ে ক্রমাগত কলুষিত হওয়া ধর্মপথ নাকি আবার ফিরে গেছে পাখি ডাকা, মেঘের ছায়া খেলা করা স্বাভাবিকতায়। প্রকৃতিকে নতুন করে পাব বলে আমিও হাজির হয়েছিলাম ধর্মপথের তোরণদ্বারে। বিস্কুট, প্যাকেট ভরা নুডল্স আর গুঁড়ো দুধের প্যাকেট নিয়ে। আগেই খবর পেয়েছিলাম, নতুন রাস্তা করেছে সেনাবাহিনী। দেবস্থানের দ্বার অবারিত হলেও বাধা আছে যাত্রা-শুরুতেই। অল্প কিছু লোককে যেতে দেওয়া হবে। কারণ পথে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তেমন হয়নি। তা ছাড়া, গাঢ় নীল আকাশের গায়ে পালকের মতো একরত্তি মেঘটা হঠাত্‌ ভোল পালটাবে না এমন ভবিষ্যদ্বাণী জোর গলায় করছে না কেউ। কমলা কাপড় মোড়া, ফেট্টি বাঁধা, পতাকা ধরা কিছু লোক এসেছে দল বেঁধে। মন ভেজানোর চেষ্টা করছে জলপাই জামা পরা সেনাদের। স্বয়ংক্রিয় বন্দুক আছে তাদের শরীরের সঙ্গে, কোন যুদ্ধে তা কাজে লাগবে জানা নেই। কায়দা করে আমি ঢুকে পড়েছি একটা দলে, এঁরা বাঙালি, এসেছেন সুন্দরবনের কাছের কোনও একটা মঠ থেকে। দলের মধ্যমণি ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধা, তিনি কথা বলেন না। সবাই তাঁকে মৌনী মা বলে ডাকছে।

শুনলাম এঁরা প্রথম বার হিমালয়ে এসেছেন তীর্থ করতে। এও শুনলাম, মৌনী মা আর ফিরে যাবেন না। কেদারনাথ পৌঁছে যজ্ঞ করা হবে। তার পর তিনি একা চলে যাবেন মহাপ্রস্থানের পথে, ভক্তেরা ফিরে যাবে মঠে। যজ্ঞের পোড়া কাঠ দিয়ে নতুন মঠ প্রতিষ্ঠা হবে। খটকা লাগল। শুধুমাত্র ধর্মবিশ্বাস আর আবেগ নিয়ে উত্তর দিকে এগনো সম্ভব নয়। একটাও গাছ নেই, প্রাণ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, পাথর-বরফের রাজ্য কোথায় যাবেন? এ তো স্বেচ্ছামৃত্যু। জানতে পারলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চয়ই যেতে দেবেন না। জবুথবু শীর্ণ মৌনী মাকে দেখে অবাক হলাম। সবার নাম নথিবদ্ধ করা হল। যাত্রা শুরু হয়ে গেল ভোরে। কুলি বা ডান্ডি চোখে পড়ল একটা-দুটো। লাঠির ওপর ভর করে মৌনী মা হাঁটছেন। একটা একটা করে পা ফেলছেন, খুবই ধীরে, যেন এক্ষুনি পড়ে যাবেন। বাকিরা মাঝে মাঝে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। এই গতিতে এক মাসেও পৌঁছনো যাবে না। না গেলে যাবে না, আমার কী? এগিয়ে গেলাম।

Advertisement

গত বছরের তাণ্ডবের চিহ্ন তেমন চোখে পড়ছিল না। কিছু উপড়ে যাওয়া গাছ, পাথর কেটে বানানো চলনসই রাস্তা আর আগের মতোই নানা মাপের ভাঙা বোল্ডার চার পাশে। এক-আধটা ফাঁকা চালা মাঝে মাঝে দু’একটা লোক। পাহাড়ের গা থেকে নামা চোরা ঝরনাগুলো আগের মতোই আছে, হয়তো গতিপথ বদলেছে। বেলার দিকে চোখে পড়ল কয়েকটা ছাউনি, ওখানেই রাতে থেকে যাব, পর দিন নদী পেরিয়ে উলটো পারের রাস্তা ধরতে হবে। আগের মতো রাস্তায় হল্লা নেই, সন্ধে নেমে এল শান্ত ভাবে। বসে রইলাম একটা পাথরের ওপর। তারা ফুটেছে। ব্যাগের মধ্যে হাত ঢোকালাম।

একটু নীচে চোখে পড়ল কয়েকটা টর্চের আলো, তার পর লোকজনের গলার শব্দ। মৌনী মা’রা এলেন বোধ হয়। নামলাম পাথর থেকে। কাছে পৌঁছতেই মুখে আলো পড়ল। ‘আরে, আপনাকে তখন থেকে খুঁজছি, কোথায় চলে গেলেন?’ প্রায় অন্ধকারেই চোখে পড়ল দুটো বাঁশের ওপর মাচা জাতীয় কিছু একটা বাঁধা হয়েছে। তার ওপরে শোয়ানো আছে মৌনী মা’কে। বয়ে আনছে ভক্তরা। তারার আলোয় নেমে আসা ঘন নীল অন্ধকারে সাদা কাপড় মোড়া শোয়ানো দেহ দেখে মৃত মনে হল। চলেছেন তিনি রহস্যময় নতুন এক জীবনের সন্ধানে। শুনেছি অলৌকিক ক্ষমতা থাকে এই ধরনের মানুষদের। মানুষের মনের ভেতরের অনেকখানি দেখতে পান এঁরা। নিজেদেরও। আমাদের কাছে যেটা প্রাণের শেষ ছোঁয়া লাগা সাদা মাইলস্টোন, এঁর কাছে এটাই স্বর্গযাত্রার প্রথম তোরণ। মুশকিল হল এ সব আমি বুঝি না। নিজের বেঁচে থাকা আর অন্যের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা জমেছে কিছু। সুখস্মৃতির জায়গা খুবই কম এখানে। কখনও মনে হয়েছে আমি পাশের অন্ধকার, জগদ্দল পাহাড়গুলোর মতোই নিষ্প্রাণ, ভারী, কখনও তা সচল হয়ে উঠতেই পারে, জেগে উঠতেই পারে, যেমন জেগেছিল গত বছর, এই একই জায়গায়। কিঞ্চিত্‌ নেশা করে এই সব কথাই ভাবছিলাম একটু আগে, একা একা। গলাটা জ্বলছিল।

মৌনী মা’কে মাটিতে নামানো হয়েছে। লোকজনের কথাবার্তা থেমে গেছে। তাঁর শরীরে কোনও স্পন্দন নেই। টর্চের আলোয় দেখলাম তাঁর চোখের পাতা বোজা। এটাও চোখে পড়ল, ডান হাতের তর্জনীটা কাঁপছে। তার পর তা সোজা হল। আস্তে আস্তে উঠছে শীর্ণ হাতটা। উঠল। থামল আমার দিকে নির্দেশ করে। এক জন ভক্ত বলে উঠল, ‘মা কিছু বলতে চান।’ এ বারে তর্জনী নড়ল দু’পাশে। অর্থাত্‌ না। তার পর বাকি আঙুলগুলো খুলে গেল। আবার গুটিয়ে গেল। হাতটা আবার নেমে গেল মাটিতে। টর্চ ফেললাম ওপরে। সবার মুখ ভারাক্রান্ত। সবাই বুঝতে পারছে কী হয়েছে, তাই কেউই চার পাশের নিস্তব্ধতা ভাঙার সাহস পাচ্ছে না। আবার আলো ফেললাম। মাটিতে রাখা হাতটা আবার নড়াচড়া করছে, যেন আমাকে ডাকছে তাঁর কাছে আসবার জন্য। কী মনে হল, হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম ওঁর পাশে। মাথাটা আস্তে আস্তে নিয়ে গেলাম ওঁর মুখের কাছে। বুঝতে চাইছিলাম নিশ্বাস পড়ছে কি পড়ছে না। খুব আস্তে, প্রায় শোনাই যায় না, একটা শব্দ ভেসে এল তুষের চাদরে মোড়া মাথার মাঝখান থেকে। শোঁ-শোঁ একটা আওয়াজ। তার পর কেটে কেটে কয়েকটা কথা। মৌনী মা আমাকে বলছেন, ‘তোর কাছে, যেটা আছে, সেটা, আমার মুখে দে, একটু। আর বল, গঙ্গা, গঙ্গা।’

suvolama@gmail.com

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement