ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
সকালে নিজের টিফিন বানানো, বাড়ির বাকিদের রান্না করা, তার পরে অফিস যাওয়া। ফিরে এসে আবার রাতের রান্না। কাজ থেকে মুখ তুলতে না পারা এমন ব্যস্ত জীবন নিয়ে ছুটে চলেছেন দেশের বহু মহিলাই। তারই মধ্যে হয়তো শুনতে হচ্ছে ‘এটা খাবো না’, ‘রোজ রোজ একই রান্না কেন’, ‘একটু অন্য কিছু করতে পারো না’ গোছের বায়নাক্কা। সাধ্যমতো করার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক সময়ে খেই হারাচ্ছেন বাড়ির গিন্নি কিংবা কর্তা, যিনি সংসার সামলান। অল্প সময়ে একটিই পাত্রে রান্না করা যেতে পারে এমন কিছু পদ যা সপ্তাহভরের একঘেয়েমি কাটানোর পাশাপাশি স্বাদ বদলের সুযোগও দেবে। আবার পরিশ্রমও হবে কম। কারণ পুরোটাই হবে প্রেশার কুকারে। খিচুড়ি তো আছেই, তা বাদ দিয়ে তেমন রান্না আর কী কী? এক নজরে দেখে নিন।
প্রেশার কুকার পাস্তা
অনেকে ভাবেন পাস্তা মানেই আলাদা করে সেদ্ধ করার ঝামেলা। কিন্তু প্রেশার কুকারে পাস্তা সবচেয়ে কম সময়ে হয়, রান্নার পরে তার গঠন বা টেক্সচারেও একটা মখমলে ক্রিমের মতো অনুভব থাকে।
পদ্ধতি: কুকারে মাখন বা অলিভ অয়েল দিয়ে রসুন কুচি ও চিকেনের ছোট টুকরো ভাজুন। এতে আপনার পছন্দের সবজি (ক্যাপসিকাম, ব্রকোলি) দিন। এবার শুকনো পাস্তা, পরিমাণমতো জল (পাস্তার ঠিক সমান সমান), নুন, গোলমরিচ আর অল্প দুধ বা ক্রিম দিয়ে কুকার বন্ধ করুন। মাত্র ১টি সিটি দিন এবং ভাপ বেরোলে উপর থেকে চিজ় ছড়িয়ে দিন।
জলের মাপ: প্রেশার কুকারে রান্নার সময় সাধারণ কড়াইয়ের তুলনায় জল কিছুটা কম লাগে। সাধারণত ১ কাপ পাস্তার জন্য ১.৫ থেকে ১.৭৫ কাপ জল যথেষ্ট।
কেন ‘একাই একশো’ : কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন আর চিজের মেলবন্ধনে এটি বিকেলের নাস্তা বা রাতের ডিনারের জন্য আদর্শ।
চিকেন অ্যান্ড ভেজিটেবল স্টু
ইউরোপের এই পদটি বাঙালির কাছে অত্যন্ত পরিচিত এবং স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ। এটি রুটি বা পাউরুটি দিয়ে খেলে এক বেলার ভরপেট খাবার হয়ে যায়।
পদ্ধতি: এর জন্য লাগবে মুরগির মাংস, আলু, পেঁপে, গাজর, বিনস, পেঁয়াজ, রসুন, গোলমরিচ এবং সামান্য মাখন বা সাদা তেল। প্রেশার কুকারে সামান্য তেল বা মাখন গরম করে তাতে গোলমরিচ বা গোটা গরম মশলার ফোড়ন দিন। এর পরে ওর মধ্যে রসুন কুচি দিয়ে ভেজে নিয়ে ডুমো করে কাটা পেঁয়াজ, মাংস এবং সব্জি নেড়েচেড়ে, জল দিয়ে সিটি দিয়ে নিলেই স্যুপ তৈরি হয়ে যাবে। রান্নার শেষে সামান্য ময়দা বা কর্নফ্লাওয়ার এক কাপ দুধে গুলে ওর মধ্যে ঢেলে ফুটিয়ে নিলে ঝোলটা ঘন এবং ক্রিমের মতো হয়।
কেন ‘একাই একশো’ : এটি হালকা অথচ প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ। রুটি বা সেঁকা পাউরুটির সঙ্গেও খাওয়া যেতে পারে। আবার সে সব ছাড়াও পেট ভরাতে সক্ষম। আর খাবারটি বিদেশি হলেও এর সব উপকরণ হাতের কাছে বাজারে বারো মাস পাওয়া যায়।
তেহারি
এটি উত্তর ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ। যাঁরা নিরামিষ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সব্জি অথবা পনির, টোফু, ইত্যাদি দিয়ে এটি বানিয়ে ফেলা যায়। আবার চাইলে মাংসের টুকরো, ডিম দিয়েও এই রান্নাকে আরও প্রোটিন সমৃদ্ধ বানিয়ে নেওয়া যায়। ব্যাপারটা হবে অনেকটা ইয়াখনি পোলাওয়ের মতো। শুধু তৈরি হবে ঘরোয়া মশলা দিয়ে। এতে আলুও থাকে। তাই আলাদা করে কোনও তরকারি সঙ্গে লাগে না।
পদ্ধতি: কুকারে তেল/ঘি গরম করে গরম মশলা ও পেঁয়াজ ভাজুন। আদা-রসুন বাটা, জিরে-ধনে গুঁড়ো ও চিকেন দিয়ে কষিয়ে নিন। এরপর ভেজানো বাসমতি বা গোবিন্দভোগ চাল এবং ডুমো করে কাটা আলু দিয়ে সামান্য নেড়ে জল দিন। ১-২টি সিটি দিলেই কেল্লাফতে।
কেন ‘একাই একশো’ : চাল, সব্জি অথবা মাংস এবং আলু—একসঙ্গে সেদ্ধ হয়। মাংসের মজ্জার রস অথবা বিভিন্ন সব্জি সেদ্ধ করা জল ভাতের সঙ্গে মিশে এক অপূর্ব স্বাদ তৈরি করে। প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিনে ভরপুর একটি পেট ভরানো খাবার তৈরি হয় তাতে।
চিকেন রিসত্তো
এটি ইটালির রান্না। তবে বানানো সহজ। এক বেলার খাবার হিসাবে বেশ পেট ভরানোও বটে। সেই সঙ্গে সুস্বাদু। ইটালিতে এই রান্নার জন্য আরবোরিও রাইস ব্যবহার করা হয়। তবে আপনি চাইলে ছোট দানার যে কোনও সুগন্ধী চাল ব্যবহার করতে পারেন। গোবিন্দভোগ বা কামিনী আতপ দিয়েও এই রান্না ভাল হবে।
পদ্ধতি: প্রথমে মাঝারি আঁচে কুকারে মাখন ও তেল গরম করে মুরগির মাংসের টুকরোগুলো হালকা বাদামি করে ভেজে তুলুন। তার পরে ওই একই পাত্রে পেঁয়াজ, রসুন এবং চাইলে মাশরুম দিয়ে হালকা নাড়াচাড়া করে নরম করে নিন। এর পরে দিন চাল। চালের দানাগুলির চারপাশ স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত ২-৩ মিনিট ভাজুন। এতে চিকেন স্টক এবং আগে ভেজে নেওয়া মুরগির মাংস দিয়ে বেশি আঁচে প্রেশারে কুক করুন ৫-৭ মিনিট। রান্না শেষ হলে দ্রুত প্রেশার বার করে দিয়ে উপরে মাখন এবং চিজ় ছড়িয়ে মাখিয়ে নিলেই তৈরি হবে রিসত্তো। মনে রাখতে হবে রিসত্তো ক্রিমের মতো ঘন হবে।
কেন ‘একাই একশো’ : চালের শর্করা, মাংসের প্রোটিন এবং ভাল চিজ়-এর স্বাস্থ্যকর ফ্যাট একই পাত্রে পাওয়া যায়। স্বাদে ভাল তো বটেই এই খাবার সহজপাচ্যও। খুব বেশি তেলমশলা না থাকায় শিশু থেকে বয়স্ক সবাই খেতে পারবেন।
আমেরিকান চিলি কন কার্নে
এটি একটি মেক্সিকান-আমেরিকান ডিশ, যা মূলত রাজমা এবং কিমা দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি ভাত বা রুটি— দুটোর সাথেই দারুণ জমে।
পদ্ধতি: ৮-১০ ঘণ্টা ভেজানো রাজমা, পাঁঠার মাংসের কিমা, পেঁয়াজ কুচি, রসুন, টোম্যাটো পিউরি, জিরেগুঁড়ো এবং লঙ্কাগুঁড়ো লাগবে। তবে মুরগির মাংসের কিমা দিলে তার সঙ্গে রাজমা সেদ্ধ করা যাবে না। তা আগে থেকে সেদ্ধ করে নিতে হবে। প্রেশার কুকারে তেল দিয়ে তাতে পেঁয়াজ, রসুন লালচে করে ভেজে কিমা দিয়ে ৪-৫ মিনিট কষিয়ে জল শুকিয়ে নিতে হবে। তার পরে টম্যাটো পিউরি, নুন, জিরেগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো দিয়ে কষিয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়লে ওর মধ্যে রাজমা দিয়ে মিনিট দু’য়েক কষিয়ে দিন। তারপরে ঢেলে দিন গরম জল। রাজমা এবং কিমার ১ ইঞ্চি উপর পর্যন্ত থাকবে। এর পরে ঢাকনা বন্ধ করে বেশি আঁচে ১টি সিটি দিয়ে আঁচ কমিয়ে ২৫-৩০ মিনিট রান্না করলেই তৈরি হয়ে যাবে চিলি কন কার্নে। নামানোর আগে উপরে মাখন এবং গরম মশলা ছড়িয়ে দিতে পারেন। অথবা সামান্য টক দই আর ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিলেও স্বাদ বেড়ে যায়।
কেন ‘একাই একশো’ : রাজমা এবং কিমা দু’টিই হাইপ্রোটিন খাবার। আর এর উপকরণ সহজলভ্য। এটি পাউরুটির টোস্ট বা সাধারণ রুটি দিয়েও খেতে ভাল লাগবে। আবার শুধু এটিই একটি মিল হিসাবে খেতে চাইলে এতে প্রচুর সব্জি মিশিয়ে দিলেই এতে প্রোটিন এবং ফাইবারের ভারসাম্য বজায় থাকবে।