টলিউডের সঞ্চালক-অভিনেত্রীদের বাড়িতে কী ভাবে পালিত হয় পৌষ সংক্রান্তি? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বর্ষবরণের পরেই দরজায় কড়া নাড়ে পৌষ সংক্রান্তি। বাঙালির পিঠেপুলির উৎসব। অনেকেই আবার মকর সংক্রান্তিও বলে থাকেন। বাঙালিরা তো বটেই, দেশের নানা প্রান্তে এই দিনটিকে নানা ভাবে পালন করা হয়। বাংলায় যে উৎসব মকর সংক্রান্তি নামে পরিচিত, তামিলনাড়ুতে সেটি আবার পোঙ্গল, গুজরাতে উত্তরায়ণ, অসমে ভোগালি।
পৌষপার্বণ বহু বাড়িতেই খুব জাঁকজমক করে পালিত হয়। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজোপার্বণের পালা। মকর সংক্রান্তির দিন সারা বাড়ি জুড়ে আলপনা দেওয়া হয়। তার পর সূর্যদেবের পুজো করার চল রয়েছে। অনেকেই তা করে থাকেন। অনেকে আবার বাড়িতে পৌষলক্ষ্মীর পুজোও করে থাকেন। গ্রামের দিকে ধানের মড়াইতে শ্রী চিহ্ন আঁকা হয়। মা লক্ষ্মীকে ভোগে দেওয়া হয় নতুন চালের পিঠে, পায়েস, অন্নভোগ। বাড়ির মহিলারা ব্রতকথা পাঠ করেন। এখন ব্যস্ততার যুগে টলিউডের সঞ্চালক-অভিনেত্রীদের বাড়িতে কী ভাবে পালিত হয় পৌষ সংক্রান্তি, তাঁরা কি আদৌ পিঠেপুলি বানান বাড়িতে, খোঁজ নিল আনন্দবাজার অনলাইন।
উৎসব আর খাওয়াদাওয়া— দুইই বড্ড প্রিয় সঞ্চালক ও পরিচালক সুদীপা চট্টোপাধ্যায়ের। যে কোনও উৎসবই বাড়িতে নিজের মতো করে উদ্যাপন করতে পছন্দ করেন তিনি। পৌষপার্বণ মানেই তো ঘরময় পিঠেপুলি, গুড়, নারকেলের মাখোমাখো গন্ধ। সুদীপার কথায়, ‘‘মা বড্ড ভাল পাটিসাপটা বানাতেন। আমিও বানাই, তবে মায়ের মতো কিছুতেই হয় না। সেই স্বাদ কখনও ভোলার নয়।’’ পৌষ সংক্রান্তির দিন সারা দিন ধরে সুদীপার বাড়িতে চলে পিঠে বানানোর প্রস্তুতি।
সুদীপা বলেন, ‘‘সকালে সবার আগে রাধাকৃষ্ণ আর গোপালের জন্য গোকুল পিঠে বানানো হয়। ঠাকুরকে ভোগ নিবেদন করার পরেই বাড়ির অন্যরা পিঠে-পুলি খেতে পারবে। মকরসংক্রান্তির আগে তাই আমাদের বাড়িতে পিঠে হয় না। ঠাকুরের জন্য বানানো হয় গুড়ের পায়েস। পাটিসাপটা, চিতই পিঠের মতো রকমারি পিঠে বানানো হয় সারা দিন ধরে। তার পর শুরু হয় বাড়ি বাড়ি সেই পিঠে পৌঁছে দেওয়ার পালা।”
সুদীপার সংযোজন, ‘‘আমার শাশুড়ির বাড়ি, ভাইয়ের বাড়িতেও পাঠানো হয় পিঠে। সারা দিন ধরে বাড়ির সকলে মোটামুটি পিঠে খেয়েই থাকি। বাড়ির হেঁশেলে সে দিন আর পিঠে ছাড়া কিছুই বানানো হয় না।”
মুগ সামলি। ছবি: সংগৃহীত।
সুদীপা শেখালেন মায়ের হাতের মুগ সামলির রেসিপি...
উপকরণ:
১ কাপ মুগ ডাল
আধ কাপ চালের গুঁড়ো
পরিমাণ মতো কড়াইশুঁটি, আলু, ফুলকপি
১ চা চামচ গোটা জিরে
২ টেবিল চামচ কাঁচালঙ্কা
১ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো
১ কাপ ধনেপাতা কুচি
স্বাদমতো নুন, চিনি
পরিমাণ মতো সাদা তেল
প্রণালী:
মুগডাল ভিজিয়ে রাখুন ২-৩ ঘণ্টার জন্য। জল যেন ডালের থেকে ১ কর বেশি থাকে সে দিকে খেয়াল রাখবেন। তার পর অল্প জল দিয়েই ডাল সেদ্ধ করে নিয়ে মিক্সিতে বেটে নিন। এ বার জল গরম করে তাতে চালের গুঁড়ো মিশিয়ে মণ্ড বানিয়ে নিন। মণ্ডটি অল্প গরম থাকতে থাকতেই তার সঙ্গে মুগ ডাল বাটা মিশিয়ে ভাল করে মেখে নিন। এ বার কড়াইতে জিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে কড়াইশুঁটি আর ফুলকপির ভেজে নিন। নুন আর হলুদ দিয়ে দিন। মিশ্রণে মিশিয়ে দিন সেদ্ধ আলু আর ধনেপাতা। এ বার মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিতে হবে। দু’হাতের তালুর মাঝে একটি করে লেচি নিয়ে প্রথমে ভাল করে গোল পাকিয়ে নিন। তার পর আঙুল দিয়ে চেপে চেপে বাটির মতো গড়ে নিন। আলুর পুরটা ওই বাটির মধ্যে ভরে বাটির মুখ বন্ধ করে পুলির আকারে গড়ে নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে পুলির গায়ে যেন কোনও ফাটল না থাকে। কড়াইতে সাদা তেল হালকা গরম হলে তার মধ্যে পুলিগুলো ছেড়ে দিন। ডুবো তেলে পুলিগুলো গাঢ় খয়েরি বা লালচে করে ভেজে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মুগ সামলি। ঝোলা গুড়ের সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন এই নোনতা পিঠে।
পৌষসংক্রান্তিতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে অভিনেত্রী কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এ বছরই এপ্রিল মাসে মাকে হারিয়েছেন তিনি। প্রতিবার কনীনিকার বাড়িতে মায়ের কাঁধেই থাকত পিঠেপুলি বানানোর দায়িত্ব। কনীনিকা বলেন, ‘‘বয়সের তোয়াক্কা না করেই মা সারা দিন ধরে পিঠে বানাতেন। দুধপুলি, রসবড়া, মালপোয়া, পাটিসাপটা— এইগুলি মা খুব ভাল বানাতেন। মায়ের থেকেই শিখেছি কী ভাবে বানাতে হয় পিঠে। মা বলতেন, পিঠে তবেই ভাল হবে যখন পরিমাপটা ঠিকঠাক হবে। এ বছর মা নেই তাই পিঠে বানানোর দায়িত্ব আমার। শুটিংয়ের পর হাতে কতটা সময় পাব জানি না। তবে একটা কিছু তো নিশ্চয়ই বানাবো।’’
রসবড়া। ছবি: সংগৃহীত।
কনীনিকা শেখালেন মায়ের হাতের রসবড়ার রেসিপি...
উপকরণ
১ কাপ বিউলির ডাল
১ টেবিল চামচ মৌরি
১ কাপ গুড়
পরিমাণ মতো সাদা তেল
প্রণালী
ফুটন্ত গরম জলে অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা ডাল ভিজিয়ে রাখুন। এ বার মিক্সিতে ভেজানো ডাল এবং আধভাঙা মৌরি দিয়ে ভাল করে বেটে নিন। এ বার একটি পাত্রে ওই মিশ্রণ ঢেলে নিয়ে হাত দিয়ে ভাল করে ফেটাতে থাকুন। প্রয়োজনে সামান্য জল মিশিয়ে নিতে পারেন। ভাল করে না ফেটালে বড়া কিন্তু ফুলবে না, রসে ভেজানোর পরেও শক্ত হয়ে থাকবে। ঘণ্টাখানেক এই অবস্থায় ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। অন্য একটি পাত্রে জল এবং গুড় দিয়ে সিরা তৈরি করে নিন। কড়াইতে তেল গরম হলে ডালের মিশ্রণ থেকে বড়ার মতো ছোট ছোট করে কেটে ভেজে নিন। সোনালি রং ধরলে বড়াগুলি কড়াই থেকে তুলে সোজা গুড়ের রসের পাত্রে দিয়ে দিন। ঘণ্টা দুয়েক এই ভাবে রেখে দিন। ঠান্ডা হলে পরিবেশন করুন।
পৌষপার্বণ উপলক্ষে অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্যের বাড়িতেও পিঠে বানানোর চল রয়েছে। অভিনেত্রীর বাড়িতে সে দায়িত্ব থাকে তাঁর শাশুড়িমায়ের উপর।
অপরাজিতা বলেন, ‘‘আমার বাড়িতে পৌষ পার্বণ উপলক্ষে ভাজা পিঠে আর রস বড়া বানানো হয়। অনেকের বাড়িতে ভাজা পিঠেটা রসে ডুবিয়ে খাওয়া হয়। আমাদের বাড়িতে কিন্তু ভাজা পিঠেটা শুকনো শুকনো খেতেই সকলে ভালবাসে। সবটাই বানান আমার শাশুড়িমা। আমি আবার কাজের চাপে খুব একটা বানিয়ে উঠতে পারি না। তবে বানাতে পারি না, এমনটা নয়। আমি দুধ পুলি, চুসির পায়েস বানাই।’’
ভাজা পিঠে। ছবি: সংগৃহীত।
অপরাজিতা শেখালেন শাশুড়িমায়ের হাতে ভাজা পিঠের রেসিপি...
উপকরণ
১ কাপ চালের গুঁড়ো
১ কাপ মুগ ডাল
পরিমাণ মতো সাদা তেল
দেড় কাপ নারকেল কোরা
১ কাপ খেজুর গুড়
১ চিমটে নুন
প্রণালী
প্রথমে একটি পাত্রে তেল ছাড়া বাকি সমস্ত উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে নিন। চাইলে নারকেল কোরাও দিতে পারেন। পরিমাণ মতো জল দিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। তবে মাথায় রাখতে হবে মিশ্রণ যেন খুব পাতলা বা খুব গাঢ় না হয়ে যায়। ২-৩ ঘণ্টা ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। এ বার কড়াইতে তেল গরম করতে দিন। গ্যাসের আঁচ একেবারে কমিয়ে ওই চাল গুঁড়োর মিশ্রণ থেকে হাতায় করে অল্প করে তেলের মধ্যে দিন। লুচির মতো ফুলে উঠলে আরেক পিঠ ভেজে নিন। একসঙ্গে অনেকগুলো ভাজা যাবে না। একটা একটা করে ভাজতে হবে। ইচ্ছে করলে রসে ডুবিয়ে কিংবা ঝোলা গুড়ের সঙ্গেও খেতে পারেন।