আন্টার্কটিকা কেন ‘মরুভূমি’! ছবি: সংগৃহীত।
চারদিকে ধু-ধু সাদা বরফ। কোথাও কোনও বালি নেই। হাড়হিম করা ঠান্ডা! তবু বিজ্ঞানের পরিভাষায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘মরুভূমি’ আন্টার্কটিকা! মরুভূমির যে যে বৈশিষ্ট্য থাকে, সবই রয়েছে তার। খাতায়কলমে সাহারা মরুভূমির থেকেও বড় আন্টার্কটিকা। কিন্তু কেন তাকে মরুভূমির তকমা দেওয়া হল? তার সঙ্গে কিন্তু বালি বা উষ্ণতার কোনও যোগ নেই। আকাশ থেকে কোনও অঞ্চলে কতটা জল পড়ল, তা দেখেই নির্ধারণ করা হয় মরুভূমির সংজ্ঞা। আন্টার্কটিকায় আকাশ থেকে সারা বছরে যা অধঃক্ষেপণ হয়, তা হিসাব করেই তাকে দেওয়া হয়েছে ‘মরুভূমি’র তকমা।
অধঃক্ষেপণ কী
বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি হয়। মেঘের জলকণা ভারী হয়ে মহাকর্ষের টানে পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। তাকেই বলে অধঃক্ষেপণ বা প্রেসিপিটেশন। শুধু তরল বা বৃষ্টির আকারে নয়, শিলাবৃষ্টির আকারে কঠিন হয়েও পৃথিবীতে নামতে পারে অধঃক্ষেপণ। শিশির বা কুয়াশার অধঃক্ষেপণ হলেও তা সরাসরি মেঘ থেকে ঝরে পড়ে না।
মরুভূমির সংজ্ঞা
কোনও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যদি বছরে ২৫০ মিলিমিটারের কম অধঃক্ষেপণ হয়, তবে তাকে মরুভূমি হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। সেই অধঃক্ষেপণ বৃষ্টি, বরফ, কুয়াশা বা শিশিরের আকারে হতে পারে। মরুভূমির সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার কোনও ভূমিকা নেই। কোনও অঞ্চলকে মরুভূমির তকমা দিতে গেলে তার তাপমাত্রা কত, তা বিবেচনা করা হয় না। তাই আন্টার্কটিকাকে মরুভূমি বলেই ধরা হয়। ‘স্পেস ডেলি’র প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক বছরে আন্টার্কটিকার উপকূল সংলগ্ন এলাকায় বছরে গড়ে ২০০ মিলিমিটার অধঃক্ষেপণ হয়। সেখানে সমুদ্র থেকে দূরবর্তী স্থলভাগে বছরে বৃষ্টির পরিমাণ ২৫ থেকে ৫০ মিলিমিটার। মেরু সংলগ্ন এলাকায় বছরে অধঃক্ষেপণের পরিমাণ ১০ মিলিমিটার। গোটা আন্টার্কটিকায় গড়ে বছরে অধঃক্ষেপণের পরিমাণ ১৬৬ মিলিমিটার, যা তাকে ‘মরুভূমি’র তকমা এনে দিয়েছে।
ভুল ধারণা
অনেকেরই ধারণা রয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মরুভূমি হল সাহারা। তা কিন্তু নয়। ৯২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে সাহারা। তা পৃথিবীর বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি। আর সবচেয়ে বড় ‘মরুভূমি’ আন্টার্কটিকা। এক কোটি ৪২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চল। কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, রাশিয়ায় এক কোটি ৩৭ লক্ষ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে সেই শীতল মরুভূমি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডেজ়ার্ট বা মরুভূমি মানেই গরমের জায়গা, ভেবে নিলে ভুল হবে। শুষ্ক বিস্তৃত এলাকা হল মরুভূমি, যা শীতলও হতে পারে, উষ্ণও হতে পারে। তবে শুষ্ক হতে হবে অবশ্যই। ঘটনাচক্রে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মরুভূমি হল শীতল। দ্বিতীয় বৃহত্তম মরুভূমিও শীতল।
শীতল হলেও কেন শুষ্ক
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আন্টার্কটিকা শুষ্ক, কারণ তা শীতল। ঠান্ডা বাতাস জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে না। বাতাস যত ঠান্ডা হয়, তত তার জলীয় বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা কমে। আন্টার্কটিকার অভ্যন্তরীণ অংশে তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানকার উচ্চতাও অনেক বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৩০০ মিটার উপরে রয়েছে বরফ ঢাকা আন্টার্কটিকা। উচ্চতা যত বেশি হয়, তত বাতাসে কমতে থাকে জলীয় বাষ্প। সেই হিসাবেই আন্টার্কটিকার বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক কম।
আন্টার্কটিকায় যে বরফ পড়ে, তা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী হয়। গলে যায় না, অপসারিতও হয় না। দিনের পর দিন স্তরের পর স্তর জমতে থাকে।
জলের মরুভূমি!
মরুভূমি— এই শব্দ আর তার সংজ্ঞা, এই দুই কিন্তু পরস্পরবিরোধীও মনে হতে পারে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানে মরুভূমির প্রথম যে অর্থ লেখা রয়েছে, তা হল ‘নির্জলদেশ, বালুকাময় তৃণাদিহীন স্থান’। নির্জলের সঙ্গে শুষ্কতার একটি যোগ রয়েছে। প্রসঙ্গত, এই অভিধানের কাজ শুরু হয় ১৯০৫ সালে। প্রথম বার ছাপানো হয় ১৯৩৩ সালে। তখনও অভিধানের কাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষের পরে তা ১৯৪৫ সালে আবার ছাপানো হয়। মনে রাখতে হবে, যে সংজ্ঞার ভিত্তিতে আন্টার্কটিকাকে মরুভূমি বলা হচ্ছে, তখনও (১৯৪৫ সালে) কিন্তু তার উদ্ভব হয়নি। সেই সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৫৩ সাল নাগাদ।
প্রসঙ্গত, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘মরুভূমি’তে রয়েছে সবচেয়ে বেশি মিষ্টি জল। গোটা পৃথিবীতে যত বরফ রয়েছে, তার ৯০ শতাংশই আন্টার্কটিকায়। সারা পৃথিবীতে মিষ্টি জলের ভান্ডারের ৭০ শতাংশের অবস্থান সেখানে। যদি আন্টার্কটিকার সব বরফ গলে যায়, তা হলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬০ মিটার বৃদ্ধি পাবে। প্রশ্ন ওঠে, তার পরেও এ হেন ‘জলের ভান্ডার’ কী ভাবে মরুভূমি হয়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মরুভূমির সংজ্ঞা খুব স্পষ্ট। তা নিয়ে কোনও বিরোধিতা থাকতেই পারে না। কোনও অঞ্চলে কত জল রয়েছে, তা এ ক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য নয়। বরং কত জল (অধঃক্ষেপণ) আকাশ থেকে পড়ছে, তা বিবেচনা করেই বিস্তৃত অঞ্চলকে মরুভূমির তকমা দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক কালের কথা নয়, শ’ শ’, হাজার হাজার বছর ধরে বরফ জমা হয়েছে আন্টার্কটিকায়।
বিজ্ঞানীরা মূলত যে বিষয়ে নজর দেন, কোনও অঞ্চলে কতটা বরফ পড়ল এবং সেখানে কতটা বরফ গলে বা সমুদ্রে ভেঙে পড়ে অপসারিত হল, সেই দুইয়ের ভারসাম্যে। তাপমাত্রা নয়, সেই ভারসাম্যই আন্টার্কটিকাকে মরুভূমিতে পরিণত করেছে। এখানে দীর্ঘ কাল ধরে জমে থাকে বরফ। তাতে সাহায্য করে তার শুষ্কতা।