এআই প্রযুক্তির ডেটা সেন্টারে প্রয়োজন হয় প্রচুর জল। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) আলিঙ্গন করেছে মানুষ। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যত বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে উদ্বেগ! এআই-এর কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা করেন অনেকে। ইতিমধ্যে অনেক বহুজাতিক সংস্থা এআই-কে আপন করে নিয়ে কর্মীসংখ্যায় কাটছাঁটও করে ফেলেছে। কিন্তু শুধু চাকরির বাজারে নয়, এআই থাবা বসাচ্ছে সাধারণ মানুষের গৃহস্থালির অন্দরেও! সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি রিপোর্টে তেমন আশঙ্কাই প্রকাশ করা হয়েছে। দাবি, এআই-এ ডেটা সেন্টার প্রতি দিন কিউসেক কিউসেক জল গিলে নিচ্ছে। এর ফলে অচিরেই টান পড়তে পারে পানীয়, ব্যবহারযোগ্য জলের সীমিত ভান্ডারে!
জাপানে অবস্থিত ইউনাইটেড নেশন্স ইউনিভার্সিটি (ইউএনইউ)-এর গবেষকেরা এআই ডেটা সেন্টারের পরিসংখ্যান ঘেঁটে সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, এআই ডেটা সেন্টারগুলিতে জল এবং বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সমস্ত ডেটা সেন্টার বছরে ৯৪৫ টেট্রাওয়াট-ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ খরচ করবে, যা পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নাইজেরিয়ার সম্মিলিত বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার সমান! এই তিন দেশে ৬৫ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন। জলের হিসাব আরও উদ্বেগের। গবেষকেরা দেখেছেন, বর্তমান হারে এগোলে চলতি দশকের শেষে এআই যে পরিমাণ জল খরচ করবে, তা ১৩০ কোটি মানুষের সম্মিলিত বার্ষিক ঘরোয়া চাহিদার প্রায় সমান!
কী কারণে এআই প্রযুক্তিতে জল লাগে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিন যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে যে কোনও প্রযুক্তির বিকাশই জলনির্ভর। কারণ, বিদ্যুৎ যত বেশি ব্যবহৃত হয়, তত বেশি উৎপন্ন হয় তাপ। যন্ত্রপাতি শীতল রাখতে তাই জল প্রয়োজন হয়। এআই-কে তাই আলাদা করে দেখতে নারাজ ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের (আইএসআই) অধ্যাপক শুভময় মৈত্র। তাঁর কথায়, ‘‘জল ও বিদ্যুতের বিপুল ব্যবহার কম্পিউটেশনে নতুন নয়। আইবিএম-এর মতো সংস্থা যখন ষাট বা সত্তরের দশকে বৃহৎ কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরি করছিল, তখনও যন্ত্রকে ঠান্ডা রাখার জন্য জল দরকার হত। তা না হলে যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত উত্তাপে ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। আমার মতে, এআই-কে আলাদা করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক হবে না। সমস্যাটিকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।’’
রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কতটা প্রভাব কী ভাবে পরিবেশের উপর পড়ছে, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেই আলোচনা মূলত গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বায়ুদূষণকেন্দ্রিক। এআই মডেল গড়ার ক্ষেত্রে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়ে বাতাসে মিশছে। তাতে বাতাস দূষিত হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশের অন্য অংশেও যে বড়সড় ক্ষতির অশনিসঙ্কেত লুকিয়ে রেখেছে এআই, তা অনেকের চোখে পড়েনি। খামতি থেকে গিয়েছে এআই-এর প্রভাব বিশ্লেষণে। গবেষকদের মতে, সমস্যা গুরুতর এবং বহুমুখী। তার এক মুখ বন্ধ করতে গেলে খুলে যাচ্ছে আর এক মুখ। যদি গ্রিনহাউস গ্যাসকে ঠেকানোর জন্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহার করা হয়, তবে কার্বন উৎপাদন বন্ধ হবে। কিন্তু জল বা বিদ্যুতের খরচ হয়ে যাবে দ্বিগুণ। যেখানে আগে থেকেই জলের সঙ্কট রয়েছে, সেখানে এই পদ্ধতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলিকে প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু রাষ্টপুঞ্জের গবেষণা বলছে, আসলে প্রশিক্ষণ নয়, এআই-এর দৈনন্দিন ব্যবহারই সর্বনাশের মূল! তার ফলেই মোট প্রয়োজনের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রতি দিন। একটি জনপ্রিয় এআই পরিষেবা দিনে ২৫০ কোটি প্রম্পট গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করে। এই প্রক্রিয়ায় বছরে কয়েকশো গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ লাগে। তা ছাড়া, এআই-কে দিয়ে কোন কাজ কী ভাবে করানো হচ্ছে, তার উপরেও নির্ভর করে বিদ্যুৎ খরচ। সাধারণ লেখালিখির কাজের তুলনায় ছবি সংক্রান্ত কাজে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। ভিডিয়োর ক্ষেত্রে তার পরিমাণ আরও বেশি। কী ভাবে এর মোকাবিলা সম্ভব? শুভময়ের কথায়, ‘‘রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অবশ্যই উদ্বেগের এবং এটা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। পরিবেশগত প্রভাবকে হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কম্পিউটেশন বা এআই-এর অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব। বরং রাষ্ট্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রকে একযোগে কাজ করে এমন প্রযুক্তি ও নীতি তৈরি করতে হবে, যাতে উন্নয়ন এবং পরিবেশ—দু’টির মধ্যে যুক্তিসঙ্গত ভারসাম্য বজায় থাকে।’’
পরিবেশের উপর এআই প্রযুক্তির ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব সর্বত্র সমান নয়। অন্যান্য প্রযুক্তির মতোই এর দ্বারা উপকৃত হন সারা বিশ্বের মানুষ। তবে এর খরচের ভার বহন করতে হয় নির্দিষ্ট কিছু অংশকে। কিছু কিছু দেশে এআই ডেটা সেন্টারগুলি ইতিমধ্যে জাতীয় চাহিদার একটা বড় অংশে থাবা বসিয়ে ফেলেছে। তার ফলে সেখানকার অন্যান্য ক্ষেত্রে টান পড়তে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও খরার মতো পরিস্থিতিতেও বিপুল পরিমাণ জল টেনে নিচ্ছে এআই। তাকে ঠেকানো যাচ্ছে না। এ ছাড়া, এআই-এর ফলে উৎপন্ন বৈদ্যুতিন বর্জ্য পদার্থ নিয়েও বিজ্ঞানীরা চিন্তায়। দিন দিন সেই বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। রিপোর্টে দাবি, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই প্রযুক্তি এমন জায়গায় পৌঁছে যাবে, যেখানে বছরে ২৫ লক্ষ টন করে বৈদ্যুতিন বর্জ্য উৎপন্ন হবে। তার ভারও আগামী দিনে দরিদ্র দেশগুলিকেই বহন করতে হতে পারে, আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, এআই-কেন্দ্রিক কম্পিউটিং ব্যবস্থা ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই আমেরিকা এবং চিনের হাতে কুক্ষিগত। এই মুহূর্তে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে উল্লেখযোগ্য কোনও এআই পরিকাঠামো নেই। এই ভারসাম্যহীনতায় এক দিকে যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত হচ্ছে, তেমনই পরিবেশগত অবিচারের দুয়ারও উন্মুক্ত হচ্ছে। বহু দেশ এআই-এর সুফল ব্যবহার করতে পারছে না। তবে তার ক্ষতির বোঝা তাদের বহন করতে হচ্ছে। বিষয়টি বৃহত্তর অর্থনীতির, মনে করেন শুভময়। তাঁর মতে, পুঁজিবাদের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়ে, তেমনই সমাজের একটি অংশকে তার মূল্য দিতে হয়। কখনও কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের মাধ্যমে, কখনও সম্পদের বৈষম্যকে স্বীকার করে, কখনও পরিবেশগত ক্ষতি সহ্য করে। সেই কারণেই এআই-কে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে নয়, বরং পুঁজি, প্রযুক্তি, শক্তি ও সামাজিক বৈষম্যের বৃহত্তর সম্পর্কের মধ্যে বিচার করা প্রয়োজন।’’
রাষ্ট্রপুঞ্জের গবেষকেরা অবশ্য বলছেন, তাঁরা এআই-এর বিরোধী নন। বরং এই প্রযুক্তি যাতে গোটা বিশ্বে আরও বেশি করে বিকশিত হতে পারে, সেটাই তাঁরা নিশ্চিত করতে চান। এর জন্য রাষ্ট্রীয় স্তরে যেমন সুসংগঠিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, তেমন ব্যবহারকারীদেরও সতর্ক এবং সচেতন হতে হবে। তবেই উজ্জ্বল হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ।