Mystery of Mars Lakes

তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে থাকলেও জল জমে বরফ হত না! মঙ্গলগ্রহে দিব্যি বইত নদী, কী ভাবে? অবশেষে মিলল উত্তর

মঙ্গলের আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডল নিয়ে পৃথিবীতে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। অধিকাংশ মডেলই দেখিয়েছে, সেখানে যে তাপমাত্রা রয়েছে, তাতে জল তরল অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়। তা জমে বরফ হয়ে থাকার কথা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০১
Share:

মঙ্গলগ্রহের মাটিতে জল-রহস্যের কিনারা করল নতুন গবেষণা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পৃথিবীর পড়শি গ্রহ মঙ্গলে যে একসময় তরল জলের অস্তিত্ব ছিল, তা প্রমাণিত। কিন্তু যে দিন এই তথ্য সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সে দিন থেকে তাঁরা হিসাব মেলাতে পারছেন না। মঙ্গলগ্রহ তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে মস্ত এক ধাঁধা। হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা হওয়া সত্ত্বেও কী ভাবে জল তরল অবস্থায় ছিল মঙ্গলে? শুধু তো জল নয়, আস্ত নদী বইত মঙ্গলের মাটিতে! কী ভাবে তা সম্ভব? নতুন গবেষণায় অবশেষে সেই ধাঁধার উত্তর মিলেছে।

Advertisement

বর্তমানে মঙ্গল গ্রহে তরল জল নেই। রয়েছে বরফ। এখন যে গ্রহকে পৃথিবী থেকে দেখা যায়, মহাকাশযান বা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে যে গ্রহের ছবি তুলে আনা হয়, তা রুক্ষ, শুষ্ক এবং তুষারাবৃত। কিন্তু এই মঙ্গলে অতীতের জলের অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। স্রোতের ঘর্ষণে তৈরি হওয়া খাদ, নদী অববাহিকা, বিশাল হ্রদ এবং মাটিতে তৈরি হওয়া পলির আস্তরণ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। কোনও বিধ্বংসী বন্যার কারণে এক ধাক্কায় সেই পলি জমেনি। তা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। মঙ্গলের মাটি সেই পলির স্তরকে লালন করেছে বছরের পর বছর ধরে।

মঙ্গলের আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডল নিয়ে পৃথিবীতে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। অধিকাংশ বিজ্ঞানসম্মত মডেলই দেখিয়েছে, ওই আবহাওয়ায় জল তরল অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়। তাপমাত্রা সেখানে থাকে হিমাঙ্কের নীচে। তার পরেও দীর্ঘস্থায়ী নদী, হ্রদ কী ভাবে মঙ্গলে টিকে থাকল, তা বিজ্ঞানীদের বিস্মিত এবং বিভ্রান্ত করেছে বার বার। জল কি তার স্বাভাবিক শর্ত থেকে সরে এসেছিল? সম্প্রতি আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী গবেষণার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এর ফলে মঙ্গল নিয়ে দীর্ঘ দিনের রহস্যের কিনারা হতে চলেছে বলে মত মহাকাশবিজ্ঞানীদের একাংশের।

Advertisement

গবেষণাগারে কৃত্রিম ভাবে মঙ্গলের অতীতের বায়ুমণ্ডল এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গিয়েছে, মঙ্গলে জল তরল রাখতে গরম আবহাওয়ার প্রয়োজনই পড়ত না! বরফের পাতলা চাদর তৈরি হত নদী এবং হ্রদের টলটলে জলের উপরে। তা-ই ছিল ‘রক্ষাকর্তা’। বরফের ওই পাতলা আস্তরণ আসলে জলের উপর শীতকালীন কম্বলের মতো কাজ করত। উপরে থাকত বরফের স্তর, আর তার নীচ দিয়ে দিব্যি বয়ে যেত নদী!

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তরল জলের উপর কঠিন বরফের এই পাতলা আবরণ ছিল আসলে মরসুমি। শীতকালে ওই আস্তরণ পড়ত। শীত কেটে গেলে আবার তা মিলিয়ে যেত। ফলে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নীচে থাকলেও বরফের ওই চাদরের নীচে তার কোনও প্রভাব পড়ত না। দশকের পর দশক ধরে এ ভাবেই মঙ্গলে নদী এবং হ্রদ জলে ভরে থেকেছে। সেই জল জমে বরফ হয়ে যায়নি। পৃথিবীর মতো উষ্ণ আবহাওয়া না-থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে দীর্ঘ দিন ধরে মঙ্গলগ্রহে হ্রদগুলি জলে ভরে ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও মিলছে মার্কিন বিজ্ঞানীদের এই নতুন ব্যাখ্যা থেকে।

মঙ্গলের সঙ্গে সূর্যের দূরত্ব ২২ কোটি ৮০ লক্ষ কিলোমিটার। পৃথিবীতে সূর্যের যে পরিমাণ আলো এসে পৌঁছোয়, মঙ্গল তার চেয়েও অনেক কম সূর্যালোক পায়। সেখানে সূর্যের আলো যথেষ্ট ক্ষীণ। কোটি কোটি বছর আগে সেই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও ছিল অনেক বেশি। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে কৃত্রিম বায়ুমণ্ডলের মডেল তৈরি করা হয়েছিল আমেরিকার গবেষণাগারে। সেখান থেকেই বরফের পাতলা আস্তরণের তত্ত্ব উঠে এসেছে। এই আস্তরণ মরসুমের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেত। মঙ্গলের তরল জলের উপর শক্ত, ভারী কোনও বরফের ঢাকনা বা পুরু হিমবাহের আস্তরণ ছিল না, বিজ্ঞানীরা তা নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন হিউস্টনের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ এলিনর মোরল্যান্ড। তিনি বলেছেন, ‘‘মঙ্গলের মাটিতে প্রাচীন হ্রদের অববাহিকা দেখেছিলাম। এক মরসুমের বেশি সেখানে তরল জল থাকা সম্ভব কি না, আমার মনে সে প্রশ্ন জেগেছিল। কিন্তু আমাদের নতুন মডেল দেখাল, শুধু পাতলা একটা মরসুমি বরফের চাদরের নীচেই দশকের পর দশক ধরে হ্রদ জলে ভরে থাকতে পারে। এখন আমরা মঙ্গলে যা দেখতে পাই, তার একটা ব্যাখ্যা এখান থেকে পাওয়া গেল। এতে আমরা খুব খুশি।’’

কী করত বরফের পাতলা স্তর?

বিজ্ঞানীদের দাবি, বরফের পাতলা আস্তরণ আসলে শীতে জলের বাষ্পীভবন প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দিত। কমিয়ে দিত জলের তাপহ্রাসের গতি। শীত কমলে সূর্যালোক সেই আস্তরণের উপর পড়ত এবং জল গরম হত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রদগুলির জলস্তরে তেমন পরিবর্তন হয়নি। গবেষক ক্রিস্টেন সিব্যাচের কথায়, ‘‘এই বরফের আস্তরণ জলের উপর প্রাকৃতিক কম্বলের মতো কাজ করত। যেহেতু বরফ খুব পাতলা ছিল, তার কোনও প্রমাণ বা ছাপ এত দিন পরে মঙ্গলের মাটিতে নেই। আমাদের কোনও রোভারও তা খুঁজে পায়নি।’’

মঙ্গলের নিরক্ষরেখা সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে বিশাল গর্ত গেল ক্রেটার। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কিউরিয়সিটি রোভার দীর্ঘ দিন সেই এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে চলেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই নমুনাও কাজে লেগেছে। বলা হচ্ছে, তাপমাত্রা বা জলবায়ুর খুব বড় কোনও পরিবর্তন না-হলে পাতলা বরফের চাদরের নীচে কয়েক দশক পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে তরল জল। মঙ্গলে সেটাই ঘটেছে। পৃথিবীর প্রাচীন আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডল কৃত্রিম ভাবে পুনর্নির্মাণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি জলবায়ুর মডেল আগেই তৈরি করেছিলেন। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল বানাতে সেই মডেল ব্যবহার করেছেন মার্কিন গবেষকেরা। মঙ্গলে কোনও গাছ নেই। তার পরিবর্তে বিজ্ঞানীদের পাথরের স্তর এবং খনিজের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement