সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীর মতো গ্রহ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা। —ফাইল চিত্র।
মহাকাশে বরফের মতো ঠান্ডা নতুন একটি গ্রহের হদিস পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা এবং গবেষণা যে হারে বেড়েছে, তাতে নতুন গ্রহ বা উপগ্রহের আবিষ্কারে আর কোনও চমক নেই। হামেশাই শোনা যায় সৌরজগতের বাইরে চেনা বা অচেনা কোনও ছায়াপথের নিত্যনতুন রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত গ্রহটি বিজ্ঞানীদেরই চমকে দিয়েছে। এ যেন অন্য গ্রহ নয়! অবিকল পৃথিবী!
সূর্য থেকে দূরত্ব, কক্ষপথের অবস্থান প্রভৃতি নানা কারণে সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবীতে প্রাণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত মহাকাশে আর কোনও গ্রহে এমন পরিবেশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান, নতুন আবিষ্কৃত গ্রহটি কখনও বাসযোগ্য হলেও হতে পারে! তবে তা নিশ্চিত করার জন্য আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। যদি তাঁদের অনুমান সত্যি হয়, তবে মহাকাশবিজ্ঞানে ইতিহাস তৈরি হবে।
পৃথিবী থেকে নতুন এই গ্রহের দূরত্ব ১৫০ আলোকবর্ষেরও কম। তার নাম দেওয়া হয়েছে এইচডি-১৩৭০১০ বি। পৃথিবীর চেয়ে এই গ্রহ আকারে সামান্য বড়। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই গ্রহের আকার পৃথিবীর চেয়ে ১.২ গুণ বেশি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নক্ষত্রের প্রেক্ষিতে গ্রহটির অবস্থান। বিজ্ঞানীদের যাবতীয় আগ্রহ এবং কৌতূহলও সেখানেই। গ্রহটি যে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, তার নাম দেওয়া হয়েছে এইচডি-১৩৭০১০। এটি বামন নক্ষত্র। এর ভর আমাদের সূর্যের ভরের ৭০ শতাংশ। এই নক্ষত্রকে এক বার প্রদক্ষিণ করে আসতে গ্রহটি সময় নেয় ৩৫৫ দিন, যা পৃথিবীর (৩৬৫ দিন) প্রায় সমান! এমনকি, গ্রহের কক্ষপথের সঙ্গেও মিল রয়েছে পৃথিবীর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, নক্ষত্র থেকে যত দূরত্বে থাকলে কোনও গ্রহ বাসযোগ্য হওয়া সম্ভব, তা নতুন এই গ্রহের রয়েছে। গবেষণা বলছে, সেই সম্ভাবনা ৫১ শতাংশ!
সূর্যের সঙ্গে নতুন নক্ষত্রটির তুলনাতেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এই নক্ষত্রের তেজ সূর্যের চেয়ে কম। কিন্তু আয়ু তুলনামূলক বেশি। সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি দিন এই নক্ষত্র সক্রিয় থাকতে পারবে মহাকাশের বুকে। যত দিন নক্ষত্র সক্রিয় থাকবে, তত দিন অস্তিত্ব থাকবে গ্রহেরও। অন্তত নক্ষত্রের তাপে ঝলসে খুব শীঘ্র এই গ্রহের মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখছেন না বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, ‘‘এটাই প্রথম গ্রহ, যার ব্যাসার্ধ ও কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর মতো। সূর্যের মতো নক্ষত্রকে এই গ্রহ প্রদক্ষিণ করে। ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণের জন্য এই গ্রহ উজ্জ্বল।’’
নাসার কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে ট্রানজ়িট পদ্ধতিতে গ্রহটিকে আবিষ্কার করা হয়েছে। সৌরজগতের বাইরের অধিকাংশ গ্রহের অস্তিত্বই এই পদ্ধতিতে জেনেছেন বিজ্ঞানীরা। টেলিস্কোপের ক্যামেরায় দূরবর্তী আলোর সঙ্কেত সাময়িক ক্ষীণ হয়ে এলে গ্রহের অস্তিত্ব অনুমান করা যায়। তাকেই বলে ট্রানজ়িট পদ্ধতি। এইচডি-১৩৭০১০ বি গ্রহের ট্রানজ়িট একবারই প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তা হলেই গ্রহটি সম্পর্কে বিশদ জানা যাবে। উঠে আসতে পারে আরও চাঞ্চল্যকর বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর সঙ্গে তার আলোর মিল স্পষ্ট হতে পারে।
সূর্য থেকে পৃথিবী যে শক্তি সংগ্রহ করে, নতুন এই গ্রহ নক্ষত্রের কাছ থেকে তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম শক্তি নিতে পারে। মনে করা হচ্ছে, গ্রহটির তাপমাত্রা এখন হিমাঙ্কের ৬৮ থেকে ৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নীচে। অর্থাৎ, গ্রহটি আমাদের পড়শি মঙ্গলগ্রহের চেয়েও শীতল। তবে এই গ্রহে তরল জল রয়েছে কি না, এখনও জানা যায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এখন তরল জল যদি না-ও থাকে, জল তরল থাকার মতো পরিস্থিতি এই গ্রহে থাকতে পারে। মাঝারি পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলে জল তরল হিসাবে থাকতে পারে। গ্রহটি হয়তো একা নেই। তার নক্ষত্র-পরিবারে আরও গ্রহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
হিমশীতল গ্রহ সত্ত্বেও কী ভাবে বাসযোগ্য পরিবেশের সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা? একাংশের যুক্তি, সাড়ে ৪০০ কোটি বছর ধরে বার বার আমাদের পৃথিবীও তুষারাবৃত গোলকে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও তেমন কোনও পর্যায় চলছে কি না, খতিয়ে দেখা দরকার। হয়তো পৃথিবীর মতো এই গ্রহের হিম-পর্বও একসময় শেষ হবে এবং পাথুরে জমিতে মাথা তুলবে প্রাণ!