প্রায় সাড়ে ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব বিশালায় ছত্রাক। ছবি: সংগৃহীত।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমি। কিন্তু সবচেয়ে বড় জীবও কি সে? মোটেও নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবের কাছে নীল তিমিও যেন ‘তুচ্ছ’। সেই জীব হল এক বিশাল আকারের ছত্রাক। যা ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে।
সন্ধান মিলেছিল প্রায় চার দশক আগে। ১৯৮৮ সালে। দেখতে সাধারণ মাশরুমের মতোই। আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে নামে এক পরজীবী ছত্রাক। প্রাথমিক শনাক্তকরণে কোনও সমস্যা হয়নি। কারণ উত্তর গোলার্ধে বেশির ভাগ নাতিশীতোষ্ণ বনভূমিতে এই ছত্রাক দেখা যায়। তবে যেটি অপ্রত্যাশিত ছিল, তা হল এর বিস্তার। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয়েছিল, এই ছত্রাক প্রায় দেড় বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ গবেষণায় দেখা যায়, এর বিস্তার আরও বেশি। ‘কানাডিয়ান জার্নাল অফ ফরেস্ট রিসার্চ’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
তবে এই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাশরুমগুলি যে আসলে একটিই জীবের অংশ, তা শুরুতে বোঝা যায়নি। অনেক পরে তা স্পষ্ট হয়। বোঝা যায়, মাটির উপরে যে মাশরুমগুলি ছড়িয়ে রয়েছে, তা জীবটির গোটা চেহারার একটি ছোট্ট অংশমাত্র। বাকি বিশাল চেহারা ছড়িয়ে রয়েছে মাটির নীচে। এই বিশাল আকারের ছত্রাকটি রয়েছে আমেরিকার ওরেগন প্রদেশের মালহিউর ন্যাশনাল ফরেস্টে। বলে রাখা দরকার, আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে আমেরিকার একটি অতি পরিচিত ছত্রাক। ‘হানি মাশরুম’ নামে এটি অধিক পরিচিত। তবে সব আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে এতটা বড় হয় না। ওরেগনের বনাঞ্চলে পাওয়া আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়েটি হল ‘নজিরবিহীন’ চেহারার।
১৯৮৮ সালে মালহিউর ন্যাশনাল ফরেস্টে পর পর বেশ কিছু গাছ মারা যাচ্ছিল। যা ছিল বেশ অস্বাভাবিক। যে ভাবে গাছগুলি মারা যাচ্ছিল, তা সাধারণ রোগজীবাণুর কারণে সৃষ্ট উদ্ভিজ্জ সমস্যার সঙ্গে মিলছিল না। কী সমস্যা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য তখন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মার্কিন ফরেস্ট সার্ভিসের উদ্ভিদরোগ বিশেষজ্ঞ গ্রেগ হুইপলকে। তিনি ওই গাছগুলির শিকড় পরীক্ষা করে দেখেন। তাতেই ধরা পড়ে সমস্যা। পরজীবী হানি মাশরুমের কারণেই সমস্যা হচ্ছিল গাছগুলিতে। মালহিউর বনাঞ্চলের এই মাশরুমগুলি ছিল আসলে একটিই একক জীব। যা ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে। এটিই পৃথিবীর বৃহত্তম জীব, যা এখনও জীবন্ত। এর সঠিক বয়স এখনও নির্ধারণ করা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান, এটি প্রায় ২,০০০-৮,৫০০ বছর ধরে বেঁচে রয়েছে। কারও কারও মতে, এর বয়স ১০ হাজার বছরও হতে পারে।
এই মাশরুম সাধারণ শরৎকালে দেখা যায়। শরৎকালে নাতিশীতোষ্ণ বনভূমিতে আরও অন্য মাশরুমও দেখা যায়। সেগুলির তুলনায় এই হানি মাশরুমের গঠনে বিশেষ কোনও ফারাক নেই। সাধারণ মাশরুমের মতো এই মাশরুমেরও রেণু মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। তা থেকে আবার নতুন মাশরুম হয়। তবে এর আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে মাটির নীচে। হানি মাশরুমের মাটির নীচের অংশ বাকি মাশরুমের তুলনায় আলাদা। ছত্রাকের মাটির নীচে সূক্ষ্ম সাদা তন্তুর মতো জালিকা থাকে। সেগুলি একত্রিত হয় একটি বিশাল কলা তৈরি করে। ছত্রাক বিশেষজ্ঞেরা এটিকে বলেন মাইসেলিয়াম। এই মাইসেলিয়ামই হল ছত্রাকটির মূল দেহ। এটিই মাটি থেকে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। এই মাইসেলিয়াম প্রতি বছর প্রায় ০.৭-৩.৩ ফুট হারে মাটির মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
যখন মালহিউরের জঙ্গলে এই ছত্রাকের সন্ধান মেলে, তখনও বিজ্ঞানীরা জানতেন না যে মাশরুমগুলি আসলে একটিই জীব। সেটির সন্ধান মেলার পরেও বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত ছত্রাকবিদেরা মনে করতেন,অন্য জঙ্গলে যে হানি মাশরুমগুলি দেখা যায়, তা আসলে পৃথক পৃথক জীবের অংশ। বেশির ভাগ মাশরুম প্রজাতির গঠন তেমনই হয়। তবে আর্মিলেয়ারিয়া গোত্রের ছত্রাকের গঠন যে আলাদা, তা প্রথম জানা যায় ১৯৯২ সালে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জেমস অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বে ওই সময়ে একটি গবেষণা হয়। পরে ‘নেচার’ জার্নালে তা প্রকাশিত হয়। অ্যান্ডারসন এবং তাঁর সঙ্গীরা উত্তর মিশিগানে আর্মিলেয়ারিয়া বালবোসা (আর্মিলেয়ারিয়া গোত্রের অপর এক ছত্রাক)-র একটি কলোনি নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তাতে জানা যায়, ওই গোটা কলোনিটি আসলে একটিই জীব, যা প্রায় ০.১৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে। এই গবেষণার পরে আর্মিলেয়ারিয়া গোত্রের অন্য ছত্রাকগুলি ঘিরেও গবেষণা শুরু হয়।
১৯৯২ সালেরই শেষ দিকে জানা যায়, আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ের মাটির নীচের গড়নও একই রকম। মার্কিন ফরেস্ট সার্ভিসের টেরি শ এবং ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ ন্যাচরাল রিসোর্সেসের কেন রাসেল প্রথম তা আবিষ্কার করেন। দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়াশিংটনে প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়ানো একটি আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ের নমুনার সন্ধান পান তাঁরা। সেই প্রথম জানা যায়, আর্মিলেয়ারিয়া ওস্টোয়ে এত বড় চেহারার হতে পারে। এর পরে ওরেগনের জঙ্গলের মাশরুমগুলি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। নেতৃত্ব দেন মার্কিন ফরেস্ট সার্ভিসের উদ্ভিদরোগ বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন পার্কস। তিনি ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং করে দেখেন। তাতে দেখা যায়, ৯ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছত্রাকটি। ২০০৩ সালের ১৭ মার্চ ‘কানাডিয়ান জার্নাল অফ ফরেস্ট রিসার্চ’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।