(বাঁ দিক থেকে) শেফালি বর্মা, রোহিত শর্মা, নিকি প্রসাদ, হরমনপ্রীত কৌর এবং আয়ুষ মাত্রে। ছবি: সমাজমাধ্যম।
যে কোনও খেলাধুলোতেই বড় খেলোয়াড় তাঁরাই হন, যাঁরা আসল সময়ে জ্বলে উঠতে পারেন। বড় মঞ্চে ছাপ ফেলার মতো খেলতে পারেন, যা লোকের হৃদয়ে থেকে যায়। শুক্রবার বৈভব সূর্যবংশী তেমনই একটি ইনিংস খেলে দিল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে। বুঝিয়ে দিল, ভবিষ্যতের তারকা হওয়ার সমস্ত মশলা রয়েছে তার মধ্যে। তাকে হিসাবের বাইরে আর কোনও দলই রাখতে পারবে না। ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথমে ব্যাট করে ভারত তুলেছিল ৪১১/৯। জবাবে ইংল্যান্ড শেষ হয়ে গেল ৩১১ রানে। শেষের দিকে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন সেলেব ফ্যালকনার। তবে শতরান করেও দলকে জেতাতে পারলেন না।
এই নিয়ে ছ’বার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতল ভারত। শুধু তাই নয়, গত তিন বছরে পাঁচটি বিশ্বকাপ জিতল তারা। এর আগে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৯ দল দু’বার বিশ্বকাপ জিতেছে। মেয়েদের দল গত বছর এক দিনের বিশ্বকাপ জিতেছে। ছেলেরা ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। এ বার ছেলেদের অনূর্ধ্ব-১৯ দলও বিশ্বকাপ জিতল।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারতের দাপট নিয়ে সন্দেহ নেই কোনও দলেরই। টানা ছ’বার ফাইনালে উঠেছে তারা। শেষ বার ফাইনালে হারতে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। আবার বিশ্বকাপের ট্রফি উঠল ভারতের অধিনায়কের হাতে। এই অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে নিয়েই এক সময় সন্দেহ তৈরি হয়েছিল অনেকের মনে। এক সময় দলটা বেশ খারাপ খেলছিল। কিছুতেই সব ঠিকঠাক হচ্ছিল না। তখনই বোর্ডের কর্তা এবং বিশেষজ্ঞেরা খতিয়ে দেখে বুঝতে পারেন, এই দলটা শুধুই আইসিসি-র প্রতিযোগিতা খেলছে। সে ভাবে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ় খেলার সুযোগই পাচ্ছে না। তার পরেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ় আয়োজনে তৎপর হয় বোর্ড।
গত বছর এশিয়া কাপের আগে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে টেস্ট এবং এক দিনের সিরিজ় খেলেছে এই দল। তার পর এশিয়া কাপ জিতেছে। বিশ্বকাপে খেলতে আসার আগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ় খেলেছে। ফলে তৈরি হয়ে নেওয়ার যাবতীয় সুযোগ পেয়েছে তারা। এতে লাভ হয়েছে দু’টি। ক্রিকেটবিশ্বের বাকি দলগুলিকে চিনে নেওয়া ছাড়াও, দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি হয়ে গিয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন ম্যাচে। কোনও ক্রিকেটার ব্যর্থ হলে বাকিরা চাপ সামলে দিয়েছেন। ব্যাটিং থেকে বোলিং, সব বিভাগেই একই চিত্র।
তবে শুক্রবারের নজর একাই কেড়ে নিয়েছে বৈভব। ফাইনালের মতো মঞ্চে যে কোনও দল, যে কোনও ক্রিকেটার চাপে থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হারারেতে বৈভবের খেলা দেখে মনে হল, চাপ শব্দটাই তার অভিধানে নেই। প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, বোলার যিনিই হোন, তার ব্যাট চলতে শুরু করলে বিপক্ষের ক্রিকেটারদের কপালে দুঃখ রয়েছে। শুক্রবার সেটাই টের পেলেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারেরা। বৈভব ফর্মে থাকলে কী হতে পারে, সেটা বুঝে গেলেন তাঁরা।
ফাইনালে ৮০ বলে ১৭৫ রান! ১৫টি চার এবং ১৫টি ছয়। যে কোনও ক্রিকেটারের কাছেই এমন পারফরম্যান্স স্বপ্ন। বৈভব সেটাই বাস্তবে করে দেখিয়েছে। চলতি প্রতিযোগিতা আমেরিকা বাদে প্রতিটি ম্যাচেই ভাল রান পেয়েছে সে। তিনটি অর্ধশতরান রয়েছে। তবে ফাইনালের পারফরম্যান্স বাকি সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
এ দিন বৈভব প্রথম তিনটি বলে কোনও রান নেয়নি। অনেকেই একটু অবাক হয়েছিলেন। কারণ বৈভব সাধারণত প্রথম বল থেকেই চালিয়ে খেলে। চতুর্থ বলে অ্যালেক্স গ্রিনকে চার মেরে খাতা খোলে বৈভব। নবম ওভারে গ্রিনকে মেরে ১৮ রান নেয় সে। অর্ধশতরান পূরণ করে ৩২ বলে। এর পর থেকেই হাত খুলতে শুরু করে বৈভব। এত ক্ষণ মূলত চারই মেরে যাচ্ছিল সে। এ বার বল বাউন্ডারির ও পারে পাঠাতে শুরু করে। ফারহান আহমেদকে একটি ওভারে তিনটি ছয় এবং একটি চার মেরে ২২ রান নেয়। অর্ধশতরান করতে বৈভব নিয়েছিল ৩২ বল। পরের পঞ্চাশ রান আসে মাত্র ২২ বলে। ফাইনালে ৫৫ বলে শতরান করে সে।
তার পরেও থামার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি তার মধ্যে। ২২তম ওভার রালফি আলবার্টকে দু’টি ছয় এবং তিনটি চার মেরে ২৭ রান নেয়। গ্রিন, ফারহান, আলবার্ট, সেবাস্তিয়ান মর্গ্যান— কোনও বোলারকে দিয়েই বৈভবের আগ্রাসন থামাতে পারেননি ইংরেজ অধিনায়ক টমাস রিউ। শেষ পর্যন্ত বৈভব ফেরে ম্যানি লামসডেনের বলে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আগ্রাসী ইনিংস এটাই। নিশ্চিত দ্বিশতরান সামনে ছিল। তবু আউট হওয়ার পরে কোনও আক্ষেপ দেখা যায়নি বৈভবের অভিব্যক্তিতে। গোটা মাঠ উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটারকে। ব্যাট উঁচু করে অভিবাদন গ্রহণ করে বৈভব।
ভারত চতুর্থ ওভারেই হারিয়েছিল সেমিফাইনালের শতরানকারী অ্যারন জর্জকে (৯)। তিনে নেমে অধিনায়ক আয়ুষ মাত্রেকে (৫৩) বিশেষ কিছুই করতে হয়নি। তিনি উল্টো দিকে থাকা বৈভবের ধ্বংসলীলা উপভোগ করেছেন। আয়ুষ ফেরার পর বৈভবের সঙ্গে যোগ দেন বেদান্ত ত্রিবেদী। তিনি ৩২ রানে ফেরেন। নজর ছিল বাঙালি অভিজ্ঞান কুন্ডুর দিকে। তিনি খেলছিলেনও ভাল। ৬টি চার এবং ১টি ছয়ের সাহায্যে ৩১ বলে ৪০ রান করে ফিরে যান অভিজ্ঞান। বিহান মলহোত্র করেছেন ৩০। শেষের দিকে ভারত কয়েকটি উইকেট হারায়। ফলে রান তোলার গতিও কমে যায়। তবু চারশোর গণ্ডি পার করে ফেলে তারা।
মাথার চারশোর বেশি রানের বোঝা থাকলেও ইংল্যান্ড শুরুটা করেছিল ধীরগতিতে। প্রতি ওভারে পাঁচের বেশি রান উঠছিল না। জোসেফ মুরেসকে (১৭) ফেরান আরএস অম্বরীশ। তার পর থেকে আগ্রাসী খেলতে থাকে ইংল্যান্ড। বেন ডকিন্স (৬৬) এবং বেন মায়েসের জুটিতে উঠে যায় ৭৪ রান। মায়েস (৪৫) ফেরার পরেও আগ্রাসন ধরে রাখেন ডকিন্স এবং রিউ। এই দুই ক্রিকেটার ফিরতেই ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ড।
নয় বলের ব্যবধানে চারটি উইকেট হারায় তারা। ওখানেই ইংল্যান্ডের যাবতীয় প্রতিরোধ শেষ হয়ে যায়। এ দিন শুরু থেকে মার খাচ্ছিলেন দীপেশ দেবেন্দ্রন। তিনি পর পর ফেরান ফারহান (১) এবং মর্গ্যানকে (০)। রান আউট হন রালফি (০)।
অষ্টম উইকেটে সেলেব ফ্যালকনার এবং জেমস মিন্টো ৯২ রানের জুটি গড়েন। হঠাৎই ভারতকে কিছুটা চাপে মনে হচ্ছিল। তবে ইংল্যান্ডের রান রেটও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। চালিয়ে খেলতে গিয়েই অম্বরীশের বলে পরিবর্ত এনানের হাতে ক্যাচ দেন মিন্টো (২৮)। তার পরেও শেষের দিকের ব্যাটারদের নিয়ে শতরান করেন ফ্যালকনার। শেষ পর্যন্ত ৬৭ বলে ১১৫ রান করে আউট হন তিনি।