Ranji Trophy 2025-26

নবি, সামাদদের নিয়ে স্বপ্ন দেখছে জম্মু-কাশ্মীর! ভারতীয় ক্রিকেটের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিচ্ছে উপত্যকার দল

অর্থ, উন্নত সরঞ্জামের থেকেও আত্মবিশ্বাস ও বুক চিতিয়ে খেলার ক্ষমতা একটা দলকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা দেখিয়ে দিয়েছেন আকিব নবিরা। জম্মু-কাশ্মীরের জয়ে লাভ হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটেরই।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৩
Share:

রঞ্জি ট্রফি নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের দল। রয়েছেন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাও। ছবি: পিটিআই।

কর্নাটকের হুবলির মাঠে হাজির সমর্থকদের এক জনের হাতে একটি প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, “আকিব নবি, হাম তুমহারে কর্জ়দার হ্যায়।” বাংলা তর্জমায়, “আকিব নবি, আমরা তোমার কাছে ঋণী।” সত্যিই তো, ছাইয়ের গাদা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জম্মু-কাশ্মীরের এই উত্থান গোটা ভারতকেই ঋণী করছে। অর্থ, উন্নত প্রযুক্তি, ভাল কোচিং, উন্নত সরঞ্জামের থেকেও মানসিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও বুক চিতিয়ে খেলার ক্ষমতা একটা দলকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা দেখিয়ে দিয়েছেন পরশ ডোগরা, আকিব নবিরা। জম্মু-কাশ্মীরের এই রঞ্জি জয়ে লাভ হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটেরই। এখন ভারতীয় ক্রিকেটে ছোট শহর, মফস্বল এমনকি, গ্রাম থেকে ক্রিকেটার উঠে আসছেন। সেই তালিকায় জুড়ে গেল একটি নতুন নাম।

Advertisement

জম্মু-কাশ্মীর। এই নামটা প্রায়ই খবরের শিরোনামে আসে। কখনও পাথর ছোড়া, কখনও জঙ্গি হানা, কখনও বিস্ফোরণ তো কখনও অনুপ্রবেশ। শেষ কবে একটা ভাল কারণে এই নাম খবরে এসেছিল তা মনে করা কঠিন। এ বার এল। লোকেশ রাহুল, দেবদত্ত পড়িক্কল, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, করুণ নায়ার, মায়াঙ্ক আগরওয়ালের শক্তিশালী কর্নাটককে মাটি ধরিয়ে হারিয়েছেন তাঁরা। রঞ্জির ইতিহাসে প্রথম বার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন। তথাকথিত পিছিয়ে পড়া বা দুর্বল দলগুলিকে পথ দেখিয়েছেন নবিরা। বুঝিয়ে দিয়েছেন, ডেভিড ও গোলিয়াথের যুদ্ধে ডেভিডই জেতে।

কয়েক মাস আগে একটি ওটিটি মাধ্যমে ‘রিয়াল কাশ্মীর’ ফুটবল ক্লাবকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম ফুটবল দলের উত্থানের কাহিনি দেখানো হয়েছে সেখানে। কিছু দিন পর যদি আব্দুল সামাদ, শুভম পুন্ডির, কামরান ইকবালদের নিয়ে তথ্যচিত্র হয়, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সত্যিই তো, মুম্বই, দিল্লি, বাংলা, তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ, বিদর্ভ, সৌরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দলের ভিড়ে জম্মু-কাশ্মীর যে দেশের সেরা ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হবে, তা কে ভেবেছিলেন। অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে তারা।

Advertisement

আর এই উত্থানের নেপথ্যে যদি সবচেয়ে বড় ভূমিকা কারও থাকে, তিনি আকিব নবি। পারভেজ রসুলের নাম কত জনের মনে আছে সন্দেহ। জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে ভারতীয় দলে খেলেছিলেন। কিন্তু সেই রসুলকে দেখে ক্রিকেট শুরু করা নবির নাম অনেক দিন মনে থাকতে পারে। এখনই তাঁকে ভারতীয় দলে সুযোগ দেওয়ার দাবি তুলেছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “জম্মু-কাশ্মীর গোটা দুনিয়াকে দেখিয়ে দিল, পরিশ্রম ও খিদে থাকলে কী সম্ভব। ওরা ওদের এলাকাকে গর্বিত করেছে। কঠিন পরিবেশ মানুষকে শক্তিশালী করে। আকিব নবি জাতীয় দলে খেলার যোগ্য। ইংল্যান্ডে ওর অভিষেক হওয়া উচিত।” সরাসরি বোর্ড, নির্বাচক প্রধান অজিত আগরকর ও বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকীয়াকে ট্যাগ করেছেন সৌরভ।

নবি যে ভারতীয় দলের জন্য তৈরি, সেই দাবি করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের বোলিং কোচ কৃষ্ণ কুমারও। নবিকে তৈরি করার নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তিনি যখন জম্মু-কাশ্মীরের কোচ হয়েছিলেন তখন শুধু আউটসুইং (পিচে পড়ে বল ব্যাটারের থেকে দূরে যাওয়া) করতেন নবি। তাঁকে হাতে ধরে ইনসুইং (পিচে পড়ে বল ভিতরের দিকে ঢুকে আসা) শিখিয়েছেন। কোথায় টানা বল করতে হবে, তা দেখিয়েছেন। লম্বা স্পেলের জন্য তৈরি করেছেন। তারই ফলস্বরূপ এই মরসুমে এখনও পর্যন্ত ৬০ উইকেট (চলতি মরসুমে সর্বাধিক, রঞ্জির ইতিহাসে মাত্র তিন বোলার এক মরসুমে ৬০ বা তার বেশি উইকেট নিয়েছেন) নবির দখলে। তার মধ্যে নক আউটে ২১ উইকেট নিয়েছেন তিনি।

কৃষ্ণ বলছেন, “রঞ্জি, দলীপ ট্রফির মতো প্রতিযোগিতাই তো জাতীয় দলে ঢোকার দরজা। পেসার হিসাবে ভারতের পিচে দুই মরসুমে ১০০ উইকেট নেওয়া সহজ নয়। সেটা নবি করেছে। অবশিষ্ট ভারতের দলে ওকে নেওয়া হয়নি। কিন্তু অন্তত ভারত এ দলে তো নেওয়া উচিত। এখন যেন কেউ না বলে, আরও এক বছর ওকে অপেক্ষা করতে হবে।” কৃষ্ণ আরও বলেন, “সকলে গতির কথা বলে। কিন্তু দেখুন, নবি সব ধরনের পিচে সফল। নতুন বলে যেমন উইকেট নেয়, তেমনই পুরনো বলে। বাংলার মতো ধারাবাহিক দলকে ৯৯ রানে অল আউট করা সহজ নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে এই মুহূর্তে ওর থেকে ভাল পেসার নেই।”

উইকেট নিয়ে এ ভাবেই দু’দিকে হাত ছড়িয়ে উল্লাস করেন আকিব নবি। ছবি: পিটিআই।

নবির শক্তি বলের সিম পজিশন। কব্জি সোজা থাকে। বলের সিম একেবারে সোজা পিচে পড়ে। তার পর বাঁক খায়। ঠিক যেমনটা করেন মহম্মদ শামি। হাওয়ায় নয়, পিচে পড়ে বল সুইং করে। এই ধরনের বল খেলা আরও কঠিন। কারণ, আগে থেকে সুইং বোঝা যায় না। যখন সুইং হয় তখন ব্যাটারের কিছু করার থাকে না। রাহুলের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারকেও সেই সুইংয়ের পরাস্ত করেছেন নবি। তাই বলের গতি বেশি না হলেও সুইংয়ের মাধ্যমে উইকেট নেন তিনি। সেই কারণেই হয়তো নবিকে ইংল্যান্ড সিরিড়ে খেলাতে বলেছেন সৌরভ। কারণ, সেখানেই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন নবি। অভিষেকের এর থেকে ভাল জায়গা হয়তো আর পাবেন না নবি।

যে বারামুল্লা বার বার জঙ্গি হামলার কারণে শিরোনামে এসেছে সেখান থেকেই উত্থান নবির। এখন তিনি জাতীয় ক্রিকেট মানচিত্রে উপরের দিকেই রয়েছেন। নইলে আইপিএলের নিলামে তাঁকে নিতে কাড়াকাড়ি হত না। ঘরোয়া ক্রিকেটার হিসাবে দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে ৮ কোটি ৪০ লক্ষ টাকায় কিনে বুঝিয়ে দিয়েছে, একটা গোটা মরসুম পাবেন তিনি। আইপিএলের মঞ্চ জসপ্রীত বুমরাহ, হার্দিক পাণ্ড্য, অভিষেক শর্মার মতো তারকা ভারতীয় ক্রিকেটকে দিয়েছে। সেই সরণি ধরেই উঠে আসতে পারেন নবি।

জম্মু-কাশ্মীরের এই দলে একমাত্র অভিজ্ঞ ক্রিকেটার পরশ ডোগরা। আগে খেলতেন হিমাচল প্রদেশে। এখন জম্মু-কাশ্মীরের অধিনায়ক। ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর রান ১০ হাজারের উপর। বাকিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান আব্দুল সামাদের। দু’হাজারের সামান্য বেশি। দলের পাঁচ ক্রিকেটার এই প্রথম বার রঞ্জি খেলছেন। সেই দল একের পর এক ম্যাচে শক্তিশালী দলকে হারাচ্ছে, তা কাকতালীয় হতে পারে না।

রঞ্জিতে এক দল হিসাবে খেলেছে জম্মু-কাশ্মীর। ছবি: পিটিআই।

নবি ও পরশের পাশাপাশি নাম করতে হয় সামাদেরও। আইপিএলের দৌলতেই ভারতীয় ক্রিকেটে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। দ্রুত রান করতে পারেন। পেশির জোর রয়েছে। অকুতোভয়। সামনে কে বল করছেন দেখেন না। ভারতীয় ক্রিকেটে এখন ভয়ডরহীন ক্রিকেটারদের দাপট। সেই তালিকায় ঢুকে পড়তে পারেন সামাদ।

জম্মু-কাশ্মীরের এই জয়ে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিধি বেড়ে গেল। বেড়ে গেল প্রতিযোগিতা। এখন আর শুধু মুম্বই, দিল্লি বা তামিলনাড়ুর মতো তথাকথিত বড় দল নয়, ভারতের দল নির্বাচনের সময় আগরকরদের তাকাতে হবে দেশের উত্তরের এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের দিকে। যেখানে ক্লাব ক্রিকেট বলে কিছু নেই (সারা বছর অন্য রাজ্যের হয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলেন নবিরা), যেখানে এখনও ক্রিকেট মাঠ মাত্র দু’টি, সেই রাজ্যই ফুল ফোটাচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটে। জন্ম দিচ্ছে নবি, সামাদের মতো প্রতিভাদের। প্রমাণ করে দিচ্ছে, খেলাটা মাঠে নেমে খেলতে হয়। সেখানে লড়াই হয় ব্যাট ও বলের। আত্মবিশ্বাস ও বুক চিতিয়ে খেলার ক্ষমতা হারিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি ও অর্থকে। সত্যিই, এই জয় শুধু জম্মু-কাশ্মীরের নয়। এই জয় ভারতীয় ক্রিকেটের। সৌরভ, কৃষ্ণদের কথা শুনছেন তো আগরকর, শইকীয়ারা!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement