আর্সেনালের বিরুদ্ধে সমতা ফেরানোর পর উল্লাস পিএসজি-র উসমান দেম্বেলের। ছবি: রয়টার্স।
আর্সেনাল ১ (হাভার্ৎজ়) – পিএসজি ১
(দেম্বেলে)
টাইব্রেকারে ৪-৩ ফলে পিএসজি জয়ী
স্বপ্নপূরণ হল না আর্সেনালের। একই মরসুমে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের সেরা ক্লাব হওয়ার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। কয়েক দিন আগে ২২ বছরের খরা কাটিয়ে প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল তারা। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারলেন না মিকেল আর্তেতার ছেলেরা। ফাইনালে গত বারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের ফ্রান্সের প্যারিস সঁ জরমঁ-এর কাছে হারল ইংল্যান্ডের ক্লাব। নির্ধারিত ১২০ মিনিটে ১-১ ছিল খেলা। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হল ফয়সালা।
প্রথমার্ধে গোল করে এগিয়ে যায় আর্সেনাল। দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফেরায় পিএসজি। ২০১৫ সাল থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে যে দল প্রথমে গোল করেছে সেই দল জিতেছে। কিন্তু এ বার তা হল না। আর্সেনাল তাদের রক্ষণাত্মক খেলার জন্য হারল। গোটা ম্যাচ জুড়ে আক্রমণ করল পিএসজি। ফলও পেল তারা। ফ্রান্স ও ইউরোপের সেরা ক্লাব হল তারা। রিয়াল মাদ্রিদের পর দ্বিতীয় ক্লাব হিসাবে পর পর দু’বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতল পিএসজি।
টাইব্রেকারে পিএসজি-র হয়ে প্রথমে শট নিতে যান র্যামোস। তিনি গোল করতে ভুল করেননি। আর্সেনালের হয়ে প্রথম পেনাল্টি নিতে যান গিয়োকেরেস। তিনিও গোল করেন। আর্সেনালের হয়ে দ্বিতীয় পেনাল্টি নিতে যান ডুয়ে। তিনিও সহজে গোল করেন। তিন বারই ভুল দিকে ঝাঁপান দুই গোলরক্ষক। আর্সেনালের হয়ে দ্বিতীয় পেনাল্টি নিতে যান এজ়ে। বাইরে মারেন তিনি। পিছিয়ে পড়ে আর্সেনাল। পিএসজি-র সমর্থকদের সামনে টাইব্রেকার হচ্ছিল। অর্থাৎ, গোলের পিছন থেকে সমর্থকদের চাপ বাড়ছিল আর্সেনালের উপর। সেই চাপ সামলাতে পারলেন না তরুণ এজ়ে। পিএসজি-কে এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল মেন্ডেসের। তাঁর শট বাঁচিয়ে দেন রায়া। ফলে আবার সমান সমান হয়ে যায় দু’দল। আর্সেনালের হয়ে তৃতীয় পেনাল্টি নিতে যান অভিজ্ঞ ডেকলান রাইস। তিনি ঠান্ডা মাথায় গোল করেন। প্যারিসের দলের হয়ে চতুর্থ পেনাল্টি নিতে যান আশরফ হাকিমি। তিনি গোল করতে ভুল করেননি। আর্সেনালের হয়ে চতুর্থ পেনাল্টি থেকে গোল করেন ব্রাজ়িলের মার্তিনেলি। পিএসজি-র হয়ে পঞ্চম পেনাল্টি থেকে গোল করেন বেরাল্ডো। অর্থাৎ, লড়াইয়ে থাকতে হল গোল করতেই হত গ্যাব্রিয়েলকে। আর্সেনালের এই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বারের উপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেন। ৪-৩ ফলে জেতে প্যারিসের ক্লাব।
এ কোন আর্সেনাল? এই দলটিই কি ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে? এই দলটিই কি অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠেছে? হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে আর্সেনালের খেলা দেখে সেই প্রশ্ন উঠছিল। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল গত বারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী দল প্যারিস সঁ জরমঁ-এর। উল্টে আর্সেনালকে দেখে মনে হচ্ছিল, প্রতি-আক্রমণের অপেক্ষায় রয়েছে। সেই প্রতি-আক্রমণকেই কাজে লাগালেন আর্তেতার ছেলেরা।
৬ মিনিটের মাথায় পিএসজি-র রক্ষণের ভুলে বল পেয়ে যান কাই হাভার্ৎজ়। কিন্তু কাছাকাছি কোনও সতীর্থ ছিলেন না। ফলে প্রথম পোস্টের কাছে এসে কোণাকুণি জোরাল শট মারেন হাভার্ৎজ়। পিএসজি-র গোলরক্ষক সাপানভ ভেবেছিলেন হাভার্ৎজ় মাটি ঘেঁষা শট মারবেন। তাই হাঁটু মুড়ে বসেছিলেন তিনি। সেটা কাজে লাগান জার্মান স্ট্রাইকার। সাপানভের মাথার উপর দিয়ে গোল করেন তিনি।
কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার পরেই ‘পার্ক দ্য বাস’ নীতিতে চলে যান হোসে মোরিনহো ও আন্তোনিয়ো কন্তের ভক্ত আর্তেতা। সামনে একাই হাভার্ৎজ়কে রেখে বাকি ১০ জন নীচে নেমে রক্ষণ সামলাচ্ছিলেন। ফলে গোটা প্রথমার্ধ জুড়ে একের পর এক আক্রমণ পিএসজি-র। কিন্তু গোলের মুখ খুলতে পারছিলেন না লুই এনরিকের ছেলেরা।
আক্রমণ করলেও একটি ভুল করছিল পিএসজি। প্রায় প্রতিটি আক্রমণ হচ্ছিল ডান প্রান্ত ধরে। আশরফ হাকিমি, উসমান দেম্বেলে ও ভিটিনহার পা ধরে আক্রমণ হচ্ছিল। অথচ, দলের সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খিভিচা কাভারাৎস্কেলিয়াকে তেমন ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল না। অনেক সময় তিনি বাঁ প্রান্তে একা থাকলেও বল পাচ্ছিলেন না। ফলে পিএসজি-র আক্রমণ দানা বাঁধছিল না। ফলে প্রথমার্ধে ৭৫ শতাংশ বলের দখল নিয়েও গোল করতে পারছিল না পিএসজি। ১-০ গোলে এগিয়ে বিরতিতে যায় আর্সেনাল।
প্রথমার্ধে আর্সেনাল এগিয়ে থাকলেও তাদের খেলা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে পিএসজি-র খেলা বদলে যাবে। সেটাই হল। দ্বিতীয়ার্ধে অনেক বেশি বল পেতে শুরু করলেন কাভারাৎস্কেলিয়া। তার ফলও পাওয়া গেল। পিএসজি-র আক্রমণ অনেক বেশি গোলমুখী হচ্ছিল। সেই কাভারাৎস্কেলিয়াকে আটকাতে গিয়েই ৬৫ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে ফাউল করে বসেন মসকুয়েরা। পেনাল্টি দেন রেফারি। গোল করতে ভুল করেননি দেম্বেলে। সমতা ফেরায় পিএসজি।
১-১ হওয়ার পরেই বদলে যায় খেলার ছবি। রক্ষণের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে আর্সেনাল। আক্রমণ শুরু করে তারা। সেই আক্রমণ দেখে প্রশ্ন উঠছিল, কেন এত ক্ষণ এতটা রক্ষণাত্মক খেলছিল তারা। পিএসজি-র মতো দলের বিরুদ্ধে ৯০ মিনিট রক্ষণ করে যে যেতা সম্ভব নয় তা কি বুঝতে পারেননি আর্তেতা।
নির্ধারিত সময়ের বাকি সময়ে দুই দলই ওপেন খেলতে শুরু করে। বেশ কয়েকটি বদল করেন আর্তেতা। ওডেগার্ড, বুকায়ো সাকাকে তুলে নেন আর্সেনালের কোচ। নামান গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি, গিয়োকেরেসকে। এনরিকে অন্য দিকে কাভারাৎস্কেলিয়াকে তুলে বার্কোলাকে নামান। দেখে বোঝা যাচ্ছিল, দুই কোচই অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারের কথা মাথায় রেখেছেন। শেষ সময়ে গোল খেতে চাইছিলেন না তাঁরা। তাই তরতাজা ফুটবলার নামাচ্ছিলেন।
৮৪ মিনিটের মাথায় প্রতি-আক্রমণ থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে টপকে যান বার্কোলা। সামনে ছিলেন গোলরক্ষক একাই। কিন্তু বার্কোলা শট মারার আগেই তাঁর পা থেকে বল ছিনিয়ে নেন রায়া। আর্সেনালের গোলরক্ষকের এই সেভ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, কেন এ বারের প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সবচেয়ে কম গোল খেয়েছেন তিনি। ৮৯ মিনিটের মাথায় ভিটিনহার শট অল্পের জন্য বার উঁচিয়ে চলে যায়। দেম্বেলেকে তুলে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা গনসালো র্যামোসকেও নামিয়ে দেয় পিএসজি। সংযুক্তি সময়ের শেষ মিনিটে আবার সুযোগ পান বার্কোলা। কিন্তু তাঁর বাঁ পায়ের শট সাইড নেটে গিয়ে লাগে। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে বেশি আক্রমণ করে আর্সেনাল। এক বার বক্সের মধ্যে ফাউলও করা হয় তাদের এক ফুটবলারকে। পেনাল্টির জোরাল আবেদন হয়। কিন্তু রেফারি ড্যানিয়েল সিবার্ড তাতে কর্ণপাত করেননি। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হবে। আর্সেনালের প্রতিবাদ দেখে মনে হচ্ছিল, ন্যায্য পেনাল্টি বাতিল করা হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে আবার পিএসজি আক্রমণ শুরু করে। সুযোগও পায় তারা। কিন্তু বক্সে তৎপর ছিলেন রায়া। তিনি পতন রোধ করেন। যে ভাবে দুই দল নিজেদের রক্ষণ মজবুত করেছিল, তাতে মনে হচ্ছিল, দুই কোচই টাইব্রেকারের কথা ভাবছেন। সেটাই হয়। টাইব্রেকারে খেলা গড়ায়। স্নায়ুর চাপ ধরে রেখে চ্যাম্পিয়ন হয় পিএসজি।