IPL 2026

খেলছি বলে বাবা আগে মারত, এখন আমার খেলা থাকলে টেলিভিশনের সামনে থেকে নড়ে না! লখনউয়ের প্রিন্স তবু বলছেন, কিছুই বদলায়নি

গত বছর আইপিএল শেষ হওয়ার পরও জাহির খানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন প্রিন্স যাদব। জাহির লখনউয়ের মেন্টরের দায়িত্ব ছাড়লেও প্রিন্সকে পরামর্শ দেওয়া বন্ধ করেননি। শিখছেন মহম্মদ শামি, ইশান্ত শর্মার কাছেও।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:১৮
Share:

প্রিন্স যাদব। ছবি: পিটিআই।

কয়েক বছর আগেও পাড়ার রাস্তায় টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতেন বন্ধুদের সঙ্গে। ১৮ বছর বয়সেও পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার কথা ভাবতেন না প্রিন্স যাদব। দিল্লির সেই প্রিন্সই আইপিএলে লখনউ সুপার জায়ান্টসের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছেন।

Advertisement

বীরেন্দ্র সহবাগের নজফগড়ের কাছেই প্রিন্সের গ্রাম দরিয়াপুর খুর্দ। আর পাঁচটা ছেলের মতো বন্ধুদের সঙ্গে গ্রামের মাঠে খেলতেন। নিছক আনন্দে। বাবাকে লুকিয়ে খেলতে হত তাঁকে। রেল পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বাবা ক্রিকেট পছন্দ করতেন না। তিনি চাইতেন, ছেলে পড়াশোনা করে বড় হয়ে ভাল চাকরি করুক। জানতে পারলেই প্রিন্সের পিঠে পড়ত মার! তা হলে? একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে প্রিন্স বলেছেন, ‘‘খেলার জন্য বাবার কাছে একটা সময় পর্যন্ত প্রচুর মার খেয়েছি। খেলাধুলো বাবা পছন্দ করতেন না। তাই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি কখনও। বন্ধুদের সঙ্গে এমনিই টেনিস বলে খেলতাম গ্রামে। মনের আনন্দে খেলতাম। যেমন সব বাচ্চারা খেলে। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত এ ভাবেই চলেছে।’’

কী করে বদলাল পরিস্থিতি? এ বার অবাক করলেন প্রিন্স। লখনউয়ের বোলার বললেন, ‘‘বদলায়নি তো। এখনও বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলে খেলি। গত বার আইপিএলের পর বাড়ি ফিরেও গ্রামে চুটিয়ে টেনিস বলে খেলেছি। একটা জিনিস অবশ্য বদলেছে। এখন খেললেও বাবার কাছে আর মার খেতে হয় না।’’ বলতে বলতে হেসে উঠেছেন প্রিন্স।

Advertisement

পরিবারের মূল আয়ের মাধ্যম এখন চাষাবাদ। গম চাষের টাকায় চলে প্রিন্সদের সংসার। ক্রিকেট থেকে বিরতি পেলে চাষের কাজে হাত লাগান প্রিন্স। তিনি বলেছেন, ‘‘বাড়িতে থাকলে জমিতে চলে যাই। চাষের কাজ করতে আমার ভালই লাগে। আইপিএল খেলতে আসার আগেও তো গম চাষ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।’’

দিল্লির হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছেন ২০২৪ সাল থেকে। আইপিএলে তিনি ঋষভ পন্থের দলের প্রথম একাদশের নিয়মিত সদস্য। এখনও টেনিস বলে খেলেন? প্রিন্সের জবাব, ‘‘সকলের কথা বলতে পারব না। আমার উপকার হয়। টেনিস বলে খেললে হাতের গতি বাড়ে। কারণ টেনিস বলে জোরে বল করলে প্রচুর চাপ পড়ে। বলে বেশ ভাল গতি না থাকলে ইয়র্কার দেওয়া যায় না। টেনিস বলে খেলায় আমার বলের গতি অনেক বেড়েছে।’’

Advertisement

আইপিএলের ছ’ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে ফেলেছেন প্রিন্স। তাঁর বলের গতিকে সমীহ করছেন ব্যাটারেরা। প্রশংসা করেছেন লখনউয়ের বোলিং কোচ ভরত অরুণও। তিনি বলেছেন, ‘‘প্রথমে শিবিরে দেখেই ওকে ভাল লেগেছিল। হাতে সুইং রয়েছে। বলে ছোট ছোট বৈচিত্র রয়েছে। ভাল ইয়র্কার করতে পারে। আবার স্লোয়ারও দিতে পারে। খুব পরিশ্রম করতে পারে। যখনই সুযোগ পায়, তখনই নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করে।’’

১৭ বছর পর্যন্ত শুধু টেনিস বলে খেলা প্রিন্সকে বদলে দিয়েছেন দিল্লির প্রাক্তন ক্রিকেটার ললিত যাদব। স্থানীয় একটি ক্রিকেট ম্যাচে প্রিন্সের বোলিং দেখে নিজের অ্যাকাডেমিতে নিয়ে আসেন। তাঁর অ্যাকাডেমির দূরত্ব প্রিন্সের গ্রাম থেকে ১৫ কিলোমিটার। তার পর ধাপে ধাপে এগিয়েছেন। লখনউয়ের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন প্রিন্স। ২৪ বছরের বোলার বলেছেন, ‘‘এটাই আমার কাছে সেরা সুযোগ। কার সঙ্গে বল করছি বলুন? ভাবতেই পারি না মহম্মদ শামির সঙ্গে নতুন বল ভাগ করে নিই! শামি ভাই সব সময় পরামর্শ দেন। হাতে ধরে শিখিয়ে দেন। শুধু আমাকে নয়, দলের সব জুনিয়র বোলারকে একই ভাবে শেখানোর চেষ্টা করেন। জীবন সম্পর্কে শেখান। মাঠে এবং মাঠের বাইরে এক জন খেলোয়াড়ের কী করা উচিত, সে সব শেখান। ক্রিকেট না থাকলে নিজেকে কী ভাবে ঠিক রাখতে হয়, সে সব শেখান। এ সব কম প্রাপ্তি নাকি? তবে কী কী শিখিয়েছেন, বলব না। ওগুলো খুব ব্যক্তিগত ব্যাপার।’’

গত বছর আইপিএল শেষ হওয়ার পরও জাহির খানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন প্রিন্স। জাহির লখনউয়ের মেন্টরের দায়িত্ব ছাড়লেও প্রিন্সকে পরামর্শ দেওয়া বন্ধ করেননি। প্রিন্স বলেছেন, ‘‘জাহির স্যরের কাছেও প্রচুর শিখেছি। দিল্লি দলে ইশান্ত শর্মার কাছ থেকেও প্রচুর শিখেছি। সব সময় শেখার চেষ্টা করি। যাঁকে সামনে পাই, তাঁর থেকেই শেখার চেষ্টা করি। সব মিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা।’’

প্রিন্সের ক্রিকেটজীবন খুব মসৃণ বলা যাবে না। এর মধ্যেই বিতর্কে জড়িয়েছেন। বয়স লুকিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট খেলার অভিযোগে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) তাঁকে দু’বছরের জন্য নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করে। এ নিয়ে লখনউয়ের বোলার বলেছেন, ‘‘আমার ক্রিকেটজীবনের এটা কালো অধ্যায়। মনে রাখতে চাই না। ওই সময় কিন্তু বাড়ির সকলকে পাশে পেয়েছিলাম। ততদিনে সকলে বুঝে গিয়েছিলেন, ক্রিকেট খেলে কিছু একটা করতে পারি। ওই দু’বছর অনুশীলন করেছিলাম দিল্লির প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রদীপ সাঙ্গওয়ান। উনি নিজেই আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন। পুরো দু’বছর আমাকে ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে রেখেছিলেন। না হলে শাস্তি ওঠার পরই প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে পারতাম না।’’

কেন বয়স লুকিয়ে ছিলেন? প্রিন্স বললেন, ‘‘সে কথা থাক। মনে করতে চাই না ওই অধ্যায়টা। তবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী জানেন? যে বাবা আমায় ক্রিকেট খেলার জন্য মারত, সেই বাবাই এখন আমি খেললে টেলিভিশনের সামনে থেকে নড়ে না। বাড়ির সকলে আমায় নিয়ে গর্ব করে। ওদের এই খুশিটা ধরে রাখতে চাই।’’

আইপিএলে বেগনি টুপির দৌড়ে তিন নম্বরে থাকা প্রিন্স এখন বিসিসিআইয়েরও সুনজরে। ভবিষ্যতের ভারতীয় দলের জন্য যে তরুণ জোরে বোলারদের আলাদা করে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে প্রিন্সের নাম। বেঙ্গালুরুর সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে থাকতে হয় বছরের অনেকটা সময়। ছুটি পেলেই গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলের ক্রিকেট আর চাষের কাজ দেখভাল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement