Virat Kohli

বিরাট শতরানেও ৩৯ বছর পর লজ্জা! গম্ভীরের ভারতের এক দিনের সিরিজ়েও হার কিউয়িদের কাছে, ফিরল পাকিস্তান-স্মৃতি

আপ্রাণ চেষ্টা করলেন বিরাট কোহলি এবং হর্ষিত রানা। নিউ জ়িল্যান্ড বোলারদের নাভিশ্বাস তুলে দিলেন। তাতেও লাভ হল না। ইনদওরে তৃতীয় ম্যাচেও নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে হেরে গেল ভারত।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:২৬
Share:

কোহলির মরিয়া লড়াইয়েও লাভ হল না। ছবি: পিটিআই।

আপ্রাণ চেষ্টা করলেন বিরাট কোহলি এবং হর্ষিত রানা। নিউ জ়িল্যান্ড বোলারদের নাভিশ্বাস তুলে দিলেন। তাতেও লাভ হল না। ইনদওরে তৃতীয় ম্যাচেও নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে হেরে গেল ভারত। এক দিনের সিরিজ় হাতছাড়া হল শুভমন গিলের দলের। আগে ব্যাট করে নিউ জ়িল্যান্ডের তোলা ৩৩৭/৮ রানের জবাবে ভারত ২৯৬ রানেই অলআউট হয়ে গেল। হারল ১-২ ব্যবধানে। ২০২৪-এ টেস্ট সিরিজ়ে চুনকাম হওয়ার পর এ বার এক দিনের সিরিজ়েও ভারতের মাটিতে তাদের হারিয়ে দিল নিউ জ়িল্যান্ড। ভারতে এটি তাদের প্রথম এক দিনের সিরিজ় জয়।

Advertisement

শেষ বার ১৯৮৭-তে পাকিস্তান এসে ভারতকে পর পর টেস্ট এবং এক দিনের সিরিজ়ে হারিয়েছিল। নিউ জ়িল্যান্ডও সেই কাজ করে দেখাল। পর পর দু’টি সিরিজ় হয়নি ঠিকই। কিন্তু আনকোরা এই কিউয়ি দলের কাছে ভারতের হার বড় প্রশ্ন তুলে দিল কোচ গৌতম গম্ভীর এবং শুভমন গিলের জুটি নিয়ে।

সামনেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। তাই এই সিরিজ়ের গুরুত্ব তেমন ভাবে থাকা উচিত নয়। কিন্তু কোচ গম্ভীরের অধীনে কোনও সিরিজ়ই আতশকাচের বাইরে থাকে না। বিরাট কোহলি যথারীতি এই সিরিজ়েও বুঝিয়ে দিলেন, তাঁকে কোনও ভাবেই ২০২৭ বিশ্বকাপে হিসাবের বাইরে রাখা যাবে না। তবে কিছু ক্রিকেটারকে নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে। এক দিনের বিশ্বকাপের আগে সেই ভুলত্রুটি শুধরাতে হবে ভারতকে।

Advertisement

কোহলির মরিয়া লড়াই

রান তাড়া করার সময় তাঁর কতগুলি শতরান রয়েছে, তা হয়তো নিজেই ভুলে গিয়েছেন। তবে রবিবার কোহলি ফের মনে করালেন, রান তাড়া করতে নেমে তিনি কতটা ভয়ঙ্কর। এই ৩৭ বছর বয়সেও রান তাড়া করায় তাঁর বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়নি। অদূর ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনাও নেই। রান তাড়া করার সময়ে আলাদা মানসিকতার দরকার হয়। সেটা বাকিদের থাকলেও কোহলির মধ্যে অনেকটা বেশি আছে। এ দিন পঞ্চম ওভারে খেলতে নেমেছিলেন। আউট হলেন ৪৬তম ওভারে। তার মাঝে একাধিক সঙ্গী নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ভারতকে বাঁচানোর। শতরান করেছেন। নিউ জ়িল্যান্ডের বোলারদের চাপে ফেলার চেষ্টা করেছেন। আউট হলেনও কিছুটা হতাশাজনক শট খেলে। কারণ তত ক্ষণে ম্যাচ অনেকটাই হাতের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে। বড় শট খেলা ছাড়া উপায় ছিল না। ১০টি চার এবং ৩টি ছয়ের সাহায্যে ১০৮ বলে কোহলি ১২৪ রানের ইনিংস খেলেছেন। দলকে জেতাতে চেষ্টার কসুর করেননি।

মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা

যে দলের মিডল অর্ডারে শ্রেয়স আয়ার, কেএল রাহুল, রবীন্দ্র জাডেজার মতো ক্রিকেটার রয়েছেন, তাদের জিততে হর্ষিত রানার উপর ভরসা করতে হবে কেন? কোহলি দিনের পর দিন একার কাঁধে দলের দায়িত্ব সামলালেও, শ্রেয়সেরা যদি একটু সেই বোঝা হালকা করে নিতেন, তা হলে সুবিধা হত ভারতেরই। যে তিন জনের কথা বলা হল তাঁদের মধ্যে সাদৃশ্য একটাই, প্রত্যেকেই আউট হয়েছেন খারাপ শট খেলে। যে পরিস্থিতিতে তাঁরা শটগুলি খেলেছেন, তখন একটু ধরে খেলে ক্রিজ়ে থিতু হয়ে নেওয়াই যেত। রাহুল তবু গত ম্যাচে শতরান করেছেন। এ দিন তিনি ভাবেননি বল ও ভাবে লাফিয়ে আসবে। কিন্তু শ্রেয়স, জাডেজার দায়িত্বজ্ঞানহীন শট ক্ষমার অযোগ্য।

প্রশ্নের মুখে স্পিনারেরা

টেস্টে ঘূর্ণি উইকেট বানিয়ে নিজেরাই বিপদে পড়ছে ভারতীয় দল। এক দিনের ক্রিকেটেও কি ধীরে ধীরে স্পিনারদের দাপট কমছে? চলতি সিরিজ়ের প্রথম দু’টি ম্যাচে ভারতের স্পিনারেরা ছাপ ফেলতে পারেননি। তৃতীয় ম্যাচেও ব্যতিক্রম হল না। কুলদীপ যাদব এবং জাডেজা, দুই স্পিনার মিলে ১২ ওভারে দিলেন ৮৯ রান। মাত্র একটি উইকেট। সে জায়গায় নিউ জ়িল্যান্ডের স্পিনারেরা ১৯ ওভার বল করে ১০৪ রান দিয়েছেন। জেডন লেনক্স ওভারপ্রতি পাঁচের কম রান দিয়েছেন। কুলদীপ ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসাবে খ্যাত। তাঁর বল এতটাই অনায়াসে খেললেন কিউয়ি ব্যাটারেরা যে, মনেই হল না আদৌ কোনও বৈচিত্র আছে বলে। টেনে টেনে ছয় মেরেছেন মিচেল, ফিলিপসেরা। ন্যূনতম প্রভাব ফেলতে পারেননি কুলদীপ। চলতি সিরিজ়ে ১৮২ রান দিয়ে মাত্র তিনটি উইকেট পেয়েছেন। কুলদীপের মতো স্পিনারের থেকে যা প্রত্যাশিত নয়। প্রশ্ন উঠেছে, অক্ষর পটেলকে কেন দলে নেওয়া হল না?

শেষ ম্যাচ জাডেজার?

টি-টোয়েন্টি থেকে আগেই অবসর নিয়েছেন। এ বার কি এক দিনের ক্রিকেটেও তাঁর বিদায় আসন্ন? রবিবারের ম্যাচের পর তাঁর ৫০ ওভারের কেরিয়ার নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে না বল, না ব্যাট, কিছুই করতে পারেননি তিনি। তার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরি‌জ়েও বল হাতে নিষ্প্রভ ছিলেন। শেষ ছয় ম্যাচে শুধুমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তৃতীয় খেলায় একটি উইকেট নিয়েছিলেন। এক দিনের ক্রিকেটে মাঝের দিকের ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের জন্য সুখ্যাতি ছিল জাডেজার। এই দু’টি সিরিজ় দেখিয়ে দিল, তাঁকে খেলার রহস্য ভেদ করে ফেলেছেন বিপক্ষ ব্যাটারেরা। এখন জাডেজা রানও আটকাতে পারছেন না। ব্যাট হাতে বিপদের সময়ে দলকে উদ্ধারও করতে পারছেন না। এ দিন অনায়াসে কোহলির সঙ্গে লম্বা জুটি খেলে দলকে ভাল জায়গায় পৌঁছে দিতে পারতেন। হাতে সেই সময়ও ছিল। কিন্তু জাডেজা তা অকারণে একটি খারাপ শট খেলতে গিয়ে আউট হলেন। ওই পরিস্থিতিতে অমন শট খেলার দরকারই ছিল না।

ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা তৃতীয় ম্যাচের স্কোরকার্ড।

রোহিতকে নিয়ে আশঙ্কা

জাডেজার মতোই কিছুটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন রোহিতও। ২০২৩ বিশ্বকাপ, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনি ওপেন করতে নেমে আগ্রাসী খেলা শুরু করেছিলেন। তাতে সাফল্য হয়তো সব ম্যাচে আসছিল না। তবে শুরুতে একটা ভিত তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। শুভমন গিলের কাছে অধিনায়কত্ব হারানোর পর রোহিতের খেলায় বদল এসেছে। তিনি আগের মতো তাড়াহুড়ো না করে একটু ধীরে খেলার চেষ্টা করছেন। শেষ ছ’টি ম্যাচের মধ্যে দু’টি ম্যাচে অর্ধশতরান করেছেন ঠিকই। কিন্তু সব ম্যাচেই রোহিতের স্ট্রাইক রেট একশোর আশেপাশে।

‘ক্রাইসিস ম্যান’ মিচেল

ভারতের মাটি ক্রমশ পয়া হয়ে উঠেছে ড্যারিল মিচেলের কাছে। সিরিজ়ে তিনটি ম্যাচ তিনি খেলেছেন। প্রথম ম্যাচে অল্পের জন্য শতরান হাতছাড়া করলেও দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ম্যাচে সেই ভুল করেননি। মিচেল ক্রিজ়ে নামলে এক বারের জন্যও তাঁকে দেখে মনে হয় না আউট হবেন। ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে দু’টি ম্যাচের দু’টিতেই শতরান করেছিলেন তিনি। তখনই বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নিজের ক্ষমতা। যত দিন গিয়েছে, তত নিউ জ়িল্যান্ড ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন তিনি। দলে তিনি ‘ক্রাইসিস ম্যান’। দল সমস্যায় পড়লেই উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন তিনি। এ দিনও যেমন। সাত বল যেতে না যেতেই দুই ওপেনারকে হারিয়েছিল নিউ জ়িল্যান্ড। মিচেল নেমে প্রথমে উইল ইয়ংয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে নিউ জ়িল্যান্ডের ইনিংসকে থিতু করলেন। তার পর গ্লেন ফিলিপসের সঙ্গে জুটি বেধে নিউ জ়িল্যান্ডকে ভদ্রস্থ জায়গায় পৌঁছে দিলেন। এ দিন শুরুটা করেছিলেন বেশ ধীরে। প্রথম চার মারতে সময় নেন ১৩ বল। তার মধ্যে ক্যাচের আবেদনও উঠে গিয়েছিল। তবে সময় যত এগোল, তত মিচেলের আসল রূপ বেরোল। তাঁকে বিন্দুমাত্র চাপে ফেলতে পারেননি ভারতের বোলারেরা। স্পিনারদের যেমন অনায়াসে খেলছিলেন, তেমনই স্বচ্ছন্দ ছিলেন পেসারদের বিরুদ্ধেও। উল্টো দিকে থাকা ফিলিপসের চাপও কমিয়ে দেন। নিউ জ়িল্যান্ড যে তিনশো পেরোল, তার কৃতিত্ব বেশির ভাগই মিচেলের।

প্রাপ্তি ব্যাটার হর্ষিত

কিছু দিন আগে হর্ষিত জানিয়েছিলেন, ইদানীং তিনি ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ দিনের ইনিংস তারই প্রমাণ। দলের বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রেখে বিপক্ষ বোলারদের শাসন যে করা যায়, এটা হর্ষিতকে দেখে বাকিদের শেখা উচিত। বল হাতে তিন উইকেট নিলেও হর্ষিত প্রচুর রান দিয়েছেন। তার শোধ তুললেন ব্যাট হাতে। যদিও দলের জেতা হল না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement