শতরানের পর উচ্ছ্বসিত ঈশান কিশনকে অভিনন্দন হার্দিক পাণ্ড্যর। ছবি: পিটিআই।
টস জিতে বোলারদের জন্য পরীক্ষার মঞ্চ সাজিয়েছিলেন সূর্যকুমার যাদব। শিশিরের পরিমাণ যখন বাড়বে, সে সময় অর্শদীপ সিংহ, বরুণ চক্রবর্তীরা দলের রান ডিফেন্ড করতে পারে কিনা দেখে নিতে চেয়েছিলেন। শিশির ভেজা বলে দলের ফিল্ডিংকেও পরীক্ষার মুখে ফেলতে চেয়েছিলেন। বিশ্বকাপে যাতে সমস্যা না হয়, তাই পরীক্ষা সেরে রাখার পরিকল্পনা ছিল ভারতীয় দলের অধিনায়কের। কিন্তু ঈশান কিশনের মাথায় ছিল অন্য কিছু। তাঁর শতরানের সুবাদে তিরুঅনন্তপুরমে নিউ জ়িল্যান্ডকে ৪৬ রানে হারিয়ে ৪-১ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ় জিতল ভারত। সূর্যকুমারদের ৫ উইকেটে ২৭১ রানের জবাবে মিচেল স্যান্টনারদের ইনিংস শেষ হল ১৯.৪ ওভারে ২২৫ রানে। দু’দল মিলে ৩৬টি ছক্কা মেরে নতুন রেকর্ড তৈরি করল। দু’দল করল ৪৯৬ রান। যা টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
দু’বছরেরও বেশি সময় পর ভারতীয় দলে ফেরা উইকেটরক্ষক-ব্যাটারকে দিয়ে শুধু ব্যাটিং করাচ্ছিলেন গৌতম গম্ভীর। আগের ম্যাচে খেলাননি। ঈশানের কুঁচকিতে হালকা চোট লেগেছিল বলে জানিয়েছিলেন সূর্যকুমার। অথচ চোট পাওয়া ঈশান জলের বোতল হাতে মাঠে নেমেছিলেন দৌড়ে দৌড়ে! চোট বোধহয় বেশি লেগেছিল ক্রিকেটার ঈশানের ‘ইগো’য়। শনিবার দুই ওপেনার অভিষেক শর্মা (১৬ বলে ৩০) এবং সঞ্জু স্যামসন (৬ বলে ৬) দ্রুত আউট হতে সুযোগ লুফে নেন। তিন নম্বরে নেমে ৪৩ বলের ইনিংসে শুরু টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে নিজের প্রথম শতরান করলেন না। নিউ জ়িল্যান্ডের বোলারদের নিয়ে ছেলেখেলা করলেন। ৬টি চার, ১০টি ছক্কা এল তাঁর ব্যাট থেকে। মাঠের সব দিকে শট মেরেছেন অনায়াসে। দলের রান তোলার গতি বেড়েছে হু হু করে। ২২ গজে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন ফর্ম ফিরে পাওয়া অধিনায়ক। সূর্যকুমারের ৩০ বলে ৬৩ রানের ইনিংসে রয়েছে ৪টি চার এবং ৬টি ছক্কা। দু’জনে তৃতীয় উইকেটের জুটিতে তুলেছেন ১৩৭ রান। তা-ও ৫৭ বলে।
ভারতের ইনিংসের ছন্দ তৈরি করেন দেয় ঈশান-সূর্য জুটি। পাঁচ নম্বরে নেমে হার্দিক পাণ্ড্য করলেন ১৭ বলে ৪২। মারলেন ১টি চার, ৪টি ছক্কা। ঈশান-সূর্যকুমার এমন আবহ তৈরি করে দিয়েছিলেন, হার্দিকের এর চেয়ে কম কিছু করা সম্ভব ছিল না। শেষ দিকে রিঙ্কু সিংহ (৮ বলে অপরাজিত ৮) এবং শিবম দুবে (২ বলে অপরাজিত ৭) ব্যাট করতে নামলেন নিয়মরক্ষার্থে। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ২৭১ রান তুলল ভারত। যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ।
ভারতীয় ব্যাটারদের সামনে নিউ জ়িল্যান্ডের বোলারদের ক্লাব স্তরের মনে হয়েছে তিরুঅনন্তপুরমের ২২ গজে। প্রায় প্রতিটি বল করার আগে তাঁদের দিশেহারা দেখিয়েছে। জেকব ডাফি, কাইল জেমিসনেরা বুঝতেই পারছিলেন না কোথায় বল রাখবেন। তার মধ্যেই কিছুটা ভাল দেখিয়েছে লকি ফার্গুসনকে। ৪১ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ডাফির ৫৩ রানে ১ উইকেট। জেমিসনের ১ উইকেট ৫৯ রানে। স্যান্টনার ৬০ রান দিয়ে পেলেন ১ উইকেট।
জয়ের জন্য ২৭১ রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভাল হয়নি নিউ জ়িল্যান্ডের। টিম সেইফার্টকে (৫) দ্রুত ফিরিয়ে দেন অর্শদীপ। তবে কলকাতা নাইট রাইডার্সের আর এক ক্রিকেটার ফিন অ্যালেন চাপে ফেলে দিয়েছিলেন ভারতীয় শিবিরকে। ওপেন করতে নেমে ৩৮ বলে ৮০ রান করেছেন ৮টি চার এবং ৬টি ছক্কার সাহায্যে। অক্ষর পটেলের বলে আউট হওয়ার আগে পর্যন্ত অ্যালেন যতক্ষণ ২২ গজে ছিলেন, তাঁর দলও লড়াইয়ে ছিল। তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন কেকেআরের এক ক্রিকেটার রাচিন রবীন্দ্র। তিনি খেললেন ১৭ বলে ৩০ রানের ইনিংস।
তাঁরা আউট হওয়ার পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল ভারতীয় দলের ইনিংস। গ্লেন ফিলিপস (৭), স্যান্টনার (০), বেভন জেকস (৭) পর পর আউট হয়ে দলকে চাপে ফেলে দেন। সূর্যকুমারের নেওয়া পরীক্ষায় সফল চোট সারিয়ে প্রথম একাদশে ফেরা সহ-অধিনায়ক অক্ষর এবং অর্শদীপ। বাঁহাতি জোরে বোলার রান দিলেও গুরুত্বপূর্ণ সময় উইকেট নিয়ে দলকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনেন। হার্দিকও ভাল বল করলেন। প্রত্যাশাপূরণে ব্যর্থ জসপ্রীত বুমরাহ এবং বরুণ চক্রবর্তী। দু’জনেই মার খেয়ে গেলেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের সাফল্য কিন্তু এই দু’জনের উপর অনেকটাই নির্ভর করবে।
চাপের মুখে লড়াই করলেন ড্যারেল মিচেল। তিনি আক্রমণের জন্য প্রথমে বেছে নেন বুমরাহকে। ওভার প্রতি রান তোলার লক্ষ্য বেড়ে যাওয়ায় লাভ হয়নি। সতীর্থেরা কেউ মিচেলকে সঙ্গ দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মিচেল করেন ১২ বলে ২৬। ২টি করে চার এবং ছক্কা এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে।
ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সফলতম অর্শদীপ ৫১ রানে ৫ উইকেট নিলেন। প্রথম ওভারে ১৭, দ্বিতীয় ওভারে ২৩ রান দেওয়ার পর নিজের শেষ ২ ওভারে নিজেকে প্রমাণ করে দিলেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দেশের সেরা বোলার। ২০ ওভারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম বার ৫ উইকেট নিলেন তিনি। ৩৩ রানে ৩ উইকেট অক্ষরের। বিশ্বকাপের আগে সহ-অধিনায়কও স্বস্তি দিলেন কোচকে। ৩৬ রান দিয়ে ১ উইকেট বরুণের। ৫৮ রান দিয়েও উইকেট পেলেন না বুমরাহ। ৭ রানে ১ উইকেট রিঙ্কু সিংহের।