জয়ের পর উল্লাস চেন্নাইয়ের ক্রিকেটারদের। ছবি: পিটিআই।
তফাত গড়ে দিলেন ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসাবে নামা আকিল হোসেন। সঞ্জু স্যামসন শতরান করলেও ওয়ানখেডেতে ২০৮ রান তাড়া করা যে খুব কঠিন নয়, তা আইপিএলের শুরুতেই দেখিয়েছিল মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে ২২১ রান তাড়া করে জিতেছিল তারা। সেই পিচেই ছিল এ দিনের ম্যাচ। কিন্তু আকিল ও নুর আহমেদের সামনে ভেঙে পড়ল মুম্বইয়ের ব্যাটিং আক্রমণ। মুম্বইকে ১০৩ রানে হারিয়ে জয়ে ফিরল চেন্নাই সুপার কিংস। আইপিএলের ইতিহাসে এটি চেন্নাইয়ের সর্বাধিক রানে জয়।
প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ২০৭ রান করে চেন্নাই। ৫৪ বলে ১০১ রান করে অপরাজিত থাকেন সঞ্জু। তাঁর জবাব দিতে পারলেন না মুম্বইয়ের কোনও ব্যাটার। আকিল ৪ ও নুর ২ উইকেট নিলেন। তাঁদের সামনে অসহায় দেখাল হার্দিক পাণ্ড্য, সূর্যকুমার যাদবদের।
এই ম্যাচে সকলের নজর ছিল মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ও রোহিত শর্মার উপর। খেলার আগেই জানা যায়, ধোনি দলের সঙ্গে মাঠে আসেননি। তখনই বোঝা গিয়েছিল, তিনি খেলবেন না। টসের পর জানা গেল, রোহিতও দলে নেই। আইপিএলের ইতিহাসে এই প্রথম বার মুম্বই-চেন্নাই লড়াইয়ে দেখা গেল না ধোনি, রোহিতকে। তাঁদের ছেড়ে যাওয়া মঞ্চে নায়ক হয়ে উঠলেন সঞ্জু ও আকিল।
টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন হার্দিক। চেন্নাই জানত, এই উইকেটে লড়াইয়ে থাকতে হলে অন্তত ২০০ রানের বেশি করতে হবে। শুরুটাও সে ভাবেই করেছিল তারা। অধিনায়ক রুতুরাজ গায়কোয়াড় ঝোড়ো ব্যাটিং শুরু করেন। কিন্তু বেশি ক্ষণ টেকেননি তিনি। তৃতীয় ওভারের শেষ বলে তাঁকে ফেরান আল্লা গজ়নফর। ১৪ বলে ২২ রান করেন চেন্নাইয়ের অধিনায়ক।
রুতুরাজ আউট হওয়ার পর রান তোলার গতি বাড়ান সঞ্জু। তিনি পাশে পান সরফরাজ় খানকে। তবে সরফরাজ়ও বেশি ক্ষণ টিকতে পারেননি। ৮ বলে ১৪ রান করে আউট হন তিনি। ২ উইকেট পড়ে গেলেও চেন্নাইয়ের প্রথম তিন ব্যাটারের কাঁধে ভর করে পাওয়ার প্লে-তে রান হয় ৭৩।
পাওয়ার প্লে-র পরেও রান তোলার গতি কমতে দেননি সঞ্জু। চেন্নাইয়ের হয়ে প্রথম কয়েকটি ম্যাচ বাদ দিলে ছন্দে তিনি। শুরু থেকে ভরসা দেখাচ্ছেন। শিবম দুবে অবশ্য এই ম্যাচে রান পাননি। ৮ বলে ৫ রান করে গজ়নফরকে ছক্কা মারতে গিয়ে বোল্ড হন।
সঞ্জুকে সঙ্গ দেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার শুরু থেকে হাত খুলতে থাকেন। তার মাঝেই আরও একটি অর্ধশতরান করেন সঞ্জু। তাঁদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, ২২০-২৩০ রান হবে। কিন্তু অশ্বনী কুমারের বলে ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হন ব্রেভিস। ১১ বলে ২১ রান করেন তিনি। তরুণ কার্তিক শর্মা করেন ১৯ বলে ১৮ রান। তবে দু’টি দর্শনীয় ছক্কা মারেন তিনি।
ডেথ ওভারে জসপ্রীত বুমরাহের হাতে খেলায় ফেরে মুম্বই। ১৭তম ওভারে মাত্র ২ রান দেন তিনি। কার্তিককে আউট করেন। ওভারটন ৭ বলে ১৫ রান করেন। পর পর উইকেট পড়লেও ২০০ রানের দিকে এগোচ্ছিল চেন্নাই। তখনও ক্রিজ়ে ছিলেন সঞ্জু।
শেষ দিকে রান তোলার দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের কাঁধে তুলে নেন সঞ্জু। দৌড়ে রান নিচ্ছিলেন না। খালি বড় শট মারার চেষ্টা করছিলেন। তাতে সফলও হন তিনি। ৫৪ বলে শতরান করেন সঞ্জু। শেষ পর্যন্ত ৫৪ বলে ১০১ রানে অপরাজিত থাকেন। পুরো ২০ ওভার খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাটে ভর করে ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ২০৭ রান করে চেন্নাই।
নাটক দেখা যায় চেন্নাইয়ের ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার নির্বাচনে। টসের পর রুতুরাজ জানিয়েছিলেন, দলে ফিরেছেন প্রশান্ত বীর। তাঁকেই ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসাবে নামানো হত। কিন্তু চেন্নাইয়ের ব্যাটিং ভাল হওয়ায় সিদ্ধান্ত বদল করেন প্রধান কোচ স্টিফেন ফ্লেমিং। ম্যাট হেনরিকেও নামাননি তিনি। মুম্বইয়ের স্পিনার গজ়নফর ভাল বল করায় তিনিও বাঁহাতি স্পিনার আকিলকে নামিয়ে দেন। সেই সিদ্ধান্তই নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়।
তবে মুম্বইয়ের ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার প্রভাব ফেলতে পারেননি। আকিলের প্রথম বলেই আউট হন দানিশ মালেওয়ার। ফর্মে থাকা নমন ধীরকেও শূন্য রানে ফেরান আকিল। মুম্বইয়ের আর এক ওপেনার কুইন্টন ডি’কককে ৭ রানের মাথায় আউট করেন মুকেশ চৌধরী। ১১ রানে ৩ উইকেট পড়ে যায় মুম্বইয়ের। পাওয়ার প্লে-তে মাত্র ২৯ রান হয়। সেখানেই পিছিয়ে পড়ে মুম্বই। আর ফিরতে পারেনি তারা।
সূর্যকুমার যাদব ও তিলক বর্মা জুটি বাঁধেন। শুরুতে ধীরে খেলছিলেন তাঁরা। কিন্তু সপ্তম ওভারের পর থেকে হাত খোলা শুরু করেন তাঁরা। পরের তিন ওভারে ভাল রান হয়। দেখে মনে হচ্ছিল, আগের ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও শুরুটা দেখে তার পর বিধ্বংসী ইনিংস খেলবেন তিলক। কিন্তু তখনই দেখা গেল আকিলের জাদু। ২৯ বলে ৩৭ রান করে আকিলের বলে বোল্ড হন তিলক।
তখনও আশা ছিল মুম্বইয়ের। হার্দিক ও শারফেন রাদারফোর্ড তখনও বাকি ছিলেন। কিন্তু পর পর দু’বলে সেই আশা শেষ করে দেন নুর। ১ রানের মাথায় আউট হন হার্দিক। পরের বলেই শূন্য রানে ফেরেন রাদারফোর্ড। পরের ওভারে ৩৬ রানের মাথায় সূর্যকে আউট করে মুম্বইয়ের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেন আকিল। চার ওভারে মাত্র ১৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন আকিল। চার ওভারে ২৪ রান দিয়ে নুর নেন ২ উইকেট। অর্থাৎ, চেন্নাইয়ের দুই স্পিনার আট ওভারে ৪১ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন। সেখানেই হেরে যায় মুম্বই।
এই ম্যাচে ১৩ জন ক্রিকেটার খেলিয়েছে মুম্বই। ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসাবে গজ়নফরের পরিবর্তে নামেন দানিশ। ফিল্ডিংয়ের সময় একটি ক্যাচ ধরতে গিয়ে কাঁধে চোট পান মিচেল স্যান্টনার। তত ক্ষণে অবশ্য নিজের পুরো চার ওভার বল করে ফেলেছিলেন তিনি। স্যান্টনারের কাঁধের হার সম্ভবত সরে গিয়েছে। ফলে কনকাশন পরিবর্ত হিসাবে ব্যাট করতে নামেন শার্দূল ঠাকুর। ১৩ জনকে খেলিয়েও সুবিধা করতে পারেনি মুম্বই।
হার নিশ্চিত ছিল মুম্বইয়ের। দেখার ছিল, কত ক্ষণ ব্যাট করতে পারে তারা। শেষ পর্যন্ত ১৯ ওভারে ১০৪ রানে অলআউট হয়ে যায় মুম্বই। ১০৩ রানে জিতে পয়েন্ট তালিকায় উপরে উঠল চেন্নাই। আগের ম্যাচ জেতার পর আবার হারে ফিরে চাপ বাড়ল হার্দিক ও মুম্বইয়ের উপর।