এক ট্রফির জন্য লড়াই পাঁচ অধিনায়কের। (বাঁ দিক থেকে) অ্যাশলে গার্ডনার, জেমাইমা রদ্রিগেজ়, হরমনপ্রীত কৌর, স্মৃতি মন্ধানা এবং মেগ ল্যানিং। ছবি: সমাজমাধ্যম।
মাস দুয়েক আগেও তাঁরা দেশের জার্সিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন। বিশ্বকাপ জেতার পর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেও ছিলেন। সেই হরমনপ্রীত কৌর এবং স্মৃতি মন্ধানা শুক্রবার থেকে আগামী এক মাসের জন্য একে অপরের ‘শত্রু’ হয়ে যাবেন। দু’জনেরই লক্ষ্য থাকবে একটি ট্রফি জেতা। তবে একসঙ্গে নয়, নিজের নিজের দলের নেতা হিসাবে। দু’জনেই আলাদা আলাদা দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, দুই বন্ধুর দ্বৈরথ দিয়েই শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগ (ডব্লিউপিএল), যা পরিচিত মহিলাদের আইপিএল নামেই।
শুক্রবার থেকে আইপিএলের চতুর্থ মরসুম শুরু হচ্ছে। তবে বাকি মরসুমের থেকে এই মরসুম অনেকাংশেই আলাদা। এই ডব্লিউপিএলে ভারতের এমন ১৫ জন ক্রিকেটার খেলবেন, যাঁদের নামের পাশে পাকাপাকি ভাবে বিশ্বকাপজয়ী শব্দটি বসে গিয়েছে। ধারাবাহিক উন্নতি, ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ শুরু হওয়া, জাঁকজমক, জনপ্রিয়তা— মহিলাদের ক্রিকেটে সব কিছুই ছিল। শুধু ট্রফিটাই ছিল না। সেটাও গত বছর জেতা হয়ে গিয়েছে। তাই এ বারের লড়াই আরও হাড্ডাহাড্ডি, আকর্ষণীয় হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
প্রথম ডব্লিউপিএলে যে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল মহিলা ক্রিকেটারদের নতুন ‘পেহচান’ বা পরিচয় দেওয়ার। তিন বছর পর সেই খেদ অনেকটাই মিটেছে। এখন বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছেন স্মৃতি, হরমনপ্রীত, রিচা ঘোষেরা। তাঁদের বিশ্বকাপজয়ে গভীর রাত পর্যন্ত উল্লাস হয়েছে, পুড়েছে বাজি, রাস্তায় নেচেছেন হাজার হাজার মানুষ।
ডব্লিউপিএলের শুরুতে প্রতিটি ম্যাচই মাঠে গিয়ে বিনামূল্যে দেখার সুযোগ পেতেন দর্শকেরা। গত বছর থেকে টিকিট কেটে খেলা দেখতে হচ্ছে। তাতেও পুরো ভর্তি হয়ে যাচ্ছে মাঠ। এ বারের প্রতিযোগিতা নবি মুম্বই এবং বডোদরায় হবে। তবে এই জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে ‘হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে’ ফরম্যাট চালু না করে ভারতীয় বোর্ড ভুল করল কি না, তা সময় বলবে।
ক্রান্তি গৌড়ের নাম বছর খানেক আগেও কেউ জানতেন না। সেই মেয়ে এখন বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছেন। শুধু ট্রফি জয়ই নয়, মধ্যপ্রদেশের মহিলা ক্রিকেটের মুখ হয়ে উঠেছেন। তাঁকে দেখে গোটা একটা রাজ্য বদলে যাচ্ছে। ১৫ বছরের বৈষ্ণবী শর্মা কিছু দিন আগে শ্রীলঙ্কার মাটিতে দেশের হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলল। তিন বছর কাটতে না কাটতেই ডব্লিউপিএল মহিলা ক্রিকেটারদের প্রতিভা খোঁজার আতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। আশা শোভনা, মিন্নু মণি, সাইকা ইশাকেরা উঠে এসেছেন এই ডব্লিউপিএল খেলেই।
এ বারও যে তরুণ প্রতিভাদের দিকে চোখ থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। গুজরাতের অনুষ্কা শর্মা, মুম্বইয়ের রাহিলা ফিরদৌস এবং সংস্কৃতি গুপ্তারা আগে থেকেই নজর কাড়ছেন। তবে প্রতিযোগিতার মাঝে নতুন নতুন মুখ দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বোর্ডের তরফে ডব্লিউপিএল শুরুই হয়েছিল নতুন প্রতিভাদের তুলে আনার জন্য। সেই কাজে বিসিসিআই সফল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মহিলা ক্রিকেটার উঠে আসছেন। জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। রেকর্ড সংখ্যক দর্শক মহিলাদের বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছেন। অনেকেরই ধারণা ছিল, শুধু মাত্র বিশ্বকাপের সময়ই লোকে মহিলাদের ক্রিকেট দেখে। ডব্লিউপিএল সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। মেয়েরা শুধু নন, প্রচুর পুরুষ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাচ্ছেন। স্মৃতি, হরমনদের নাম ধরে চিৎকার করছেন। এই জনপ্রিয়তাকে বিপণনের কাজে লাগাচ্ছে বোর্ডও।
চমকে দিতে পারে যে কোনও দলই। তবে খাতায়-কলমে এগিয়ে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। বিশ্বজয়ী অধিনায়ক হরমনপ্রীত তো রয়েছেনই। তাঁর সঙ্গে ইংল্যান্ডের ন্যাট শিভার ব্রান্ট এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের হেলি ম্যাথুজ় রয়েছেন। মুম্বই আসল দলটাই ধরে রেখেছে। তাঁদের দলে নিউ জ়িল্যান্ডের অ্যামেলিয়া কের, অস্ট্রেলিয়ার মিলি ইলিংওয়ার্থ এবং আমনজ্যোত কৌর রয়েছেন। বোলিংয়ে আছেন জি কমলিনী। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার শবনিম ইসমাইল এবং বাংলার সাইকা রয়েছেন।
মেগ ল্যানিং এ বার দল বদলে ইউপি ওয়ারিয়র্জ়ে। তাই দিল্লি অধিনায়ক হিসাবে বেছে নিয়েছে জেমাইমা রদ্রিগেজ়কে। দিল্লি দলেও বিপজ্জনক ক্রিকেটারেরা রয়েছেন। ভারতীয়দের মধ্যে শেফালি বর্মা, স্নেহ রানা এবং শ্রী চরণী রয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে নিকি প্রসাদ, মিন্নু মণি এবং নন্দানি শর্মা আছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ ক্রিকেটার লরা উলভার্ট থাকছেন। বোলিংয়ে থাকছেন মারিজ়েন কাপ এবং আলানা কিং।
গত বার ট্রফি জিতেছিল বেঙ্গালুরু। সেই দলের অধিনায়ক স্মৃতি পাশে পাবেন অস্ট্রেলিয়ার জর্জিয়া ভল, গ্রেস হ্যারিস, দক্ষিণ আফ্রিকার নাদিন ডি ক্লার্ককে। তবে এলিস পেরি নাম তুলে নেওয়ায় কিছুটা দুর্বল হয়েছে বেঙ্গালুরু। বাংলার রিচা রয়েছেন বেঙ্গালুরু দলে। বোলিংয়ে থাকবেন অরুন্ধতী রেড্ডি, পূজা বস্ত্রকর, ইংল্যান্ডের লরেন বেল, লিনসে স্মিথ, ভারতের রাধা যাদব এবং শ্রেয়াঙ্কা পাতিল।
গুজরাত গত বারে প্লে-অফে উঠেছিল। সেই দলের নেতা অ্যাশলে গার্ডনার। তিনি পাবেন রেণুকা সিংহ ঠাকুর, তিতাস সাধু, রাজেশ্বরী গায়কোয়াড়ের মতো বোলারকে। উইকেটের পিছনে বেথ মুনি থাকবেন। এ ছাড়া নিউ জ়িল্যান্ডের সোফি ডিভাইন, অস্ট্রেলিয়ার কিম গার্থ এবং জর্জিয়া ওয়ারহামরা রয়েছেন।
ইউপি গোটা দলই প্রায় বদলে ফেলেছে। ল্যানিংকে অধিনায়ক করেছে তারা। ফিবি লিচফিল্ড এবং প্রতীকা রাওয়াল ওপেন করবেন। কিরণ নবগীরে, হরলীন দেওলের মতো ক্রিকেটারেরা রয়েছেন। বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার দীপ্তি শর্মাকেও কিনেছে ইউপি। বিদেশিদের মধ্যে নজর থাকবে ক্লো ট্রায়ন, দিয়ান্দ্রা ডটিন, সোফি একলেস্টোনের দিকে।
ডব্লিউপিএলের মাধ্যমে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সেরে ফেলতে চাইছেন স্মৃতি। প্রথম ম্যাচের আগের দিন বলেছেন, “সকলেই জানে আমরা এক দিনের বিশ্বকাপ জিতেছি। এ বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতলে দারুণ হবে। তার আগে কিছু কাজ বাকি। আমরা বিশ্বের সেরা দল এটা প্রমাণ করে দিতে হবে। আশা করি ডব্লিউপিএল আমাদের উন্নতিতে সাহায্য করবে।”
স্মৃতি জানিয়েছেন, ডব্লিউপিএলে ভাল খেললে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দরজা খুলে যেতে পারে। তাঁর কথায়, “যদি কোনও অসাধারণ প্রতিভা দেখা যায় বা কারও কাছে মরসুমটা দারুণ যায়, তা হলে নিশ্চিত ভাবে তাঁর কাছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দরজা খুলে যাবে।”
হরমনপ্রীত বলেছেন, “আমরা একটা বিশ্বকাপে সন্তুষ্ট থাকতে চাই না। সামনে অনেক ক্রিকেট ম্যাচ আসছে। মাঠে নামলে সেরা মানসিকতা নিয়ে খেলতে চাই। জয়ের মানসিকতা থাকতে হবে। শুধু আমরা নই, তরুণদের মাথাতেও এখন বিশ্বজয়ের ভাবনা ঢুকে পড়েছে।”