—ফাইল চিত্র।
প্রায় চার দশক আগে শিলংয়ের সেন্ট অ্যান্থনি স্কুলে কোচিং করাতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম সত্যটা। কেন যে আজও আমাদের দেশের ফুটবল পণ্ডিতরা সেটা বুঝতে পারলেন না, তা আমাকে অবাক করে।
আমাদের ফুটবলার জীবনে ভারতীয় ফুটবল বলতে সবাই বুঝত বাঙালিদের মস্তিষ্ক। প়ঞ্জাবিদের শক্তি। গোয়ানদের হার না মানা মনোভাব। আর দক্ষিণ ভারতীয়দের (হায়দরাবাদ, কর্ণাটক, কেরল) অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তি। এর বাইরেও টি আও, পূরণবাহাদুর, চন্দন সিংহরা এসেছেন। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরি।
সাতাত্তরে শিলংয়ে সে বার কোচিং করাতে গিয়ে প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম, ভারতীয় ফুটবলে উন্নতির বীজ লুকিয়ে রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতেই।
সেটা যে কতটা নির্ভুল ছিল, তা আজকের দিনে বোঝা যাচ্ছে ভালই। ফেডারেশন কাপের ফাইনালে গত কয়েক বছরে খেলতে দেখলাম লাজং এফসি, আইজল এফসি-র মতো টিমগুলোকে। জেজে, সুনীল, লিংডো, উদান্তা, লালরিন্দিকারা এখন ভারতীয় ফুটবলের এক-এক জন তারকা। এই আইএসএল-থ্রিতেও সব স্টেডিয়ামে দর্শক যখন আগের বছরগুলির তুলনায় কম হচ্ছে, তখন গুয়াহাটিতে শুক্রবারও এটিকে আর নর্থইস্টের ম্যাচে দেখলাম দর্শক ঠাসা স্টেডিয়াম!
কিন্তু প্রশ্ন এটাই, যেখানে ফুটবল নিয়ে এ রকম উন্মাদনা আর প্রতিভার ছড়াছড়ি, সেখানে ফেডারেশনের তরফে প্রতিভা তুলে আনার জন্য কোনও বিশেষ প্রকল্প আজ অবধি নেওয়া হয়েছি কি?
উত্তর—হয়নি।
নর্থইস্টে বেশ কয়েকবার যাওয়ার ফলে বুঝেছিলাম দেশের এই অঞ্চলের ছেলেদের মধ্যে যদি শৃঙ্খলার বাঁধনটা পরানো যায়, তা হলে জাতীয় দলের শক্তি বেশ কয়েকগুণ বেড়ে যেতে বাধ্য। কারণ এর পিছনে রয়েছে ভৌগোলিক এবং টেকনিক্যাল কারণ।
প্রথমত: নর্থইস্টের ছেলেদের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি দুরন্ত। শরীরের ভারসাম্যটা চমৎকার কাজে লাগায় ওরা। পঞ্জাবের ছেলেরা মাঠের মধ্যে বেকায়দায় পড়লে শক্তি দিয়ে যা মোকাবিলা করে, তা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি ছেলেরা স্রেফ সামলে দিতে পারে ভারসাম্য দিয়ে। ওদের ফুটবল সেন্সটাও তারিফ করার মতো। ফুটবলের যেটা মোদ্দা কথা—তোমাকে বলের কাছে যেতে হবে। সেটাও ওরা অনায়াসে করে কোনও ভয়ডর ছাড়াই। ফিফটি-ফিফটি বল তাড়া করে কেড়ে নিতে ওদের সাহস দেখলে চমকে যেতে হয়। বল কন্ট্রোল, ড্রিবলিংও চোখ জুড়িয়ে দেয়। ওদের মতো ক্ষিপ্রতা, টার্নিং, অ্যান্টিসিপেশন এবং ইন্টারসেপশন যে কোনও দলের সম্পদ। আর এ সবই ওদের মজ্জাগত। কারও কাছে ট্রেনিং নিয়ে নয়।
উত্তর-পূর্ব ভারতের গ্রামে গ্রামে ঘুরলে এ রকম কয়েক হাজার প্রতিভা চোখে পড়বে। যেটা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে একটা সময় ছিল। কিন্তু পাহাড়ি ছেলেদের তুলে আনবে কে? সাতাত্তরে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাচ্চাদের দেখার পর তাই চোখ চকচক করে উঠেছিল আমার। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে স্কাউটিং করে প্রতিভা তুলে আনার জন্য ফেডারেশনকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টও তৈরি করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ‘আপনি এগিয়ে যান, আমরা সঙ্গে আছি’—এ রকম আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। সে দিন কেউ শোনেনি আমার আর্জি বা পরিকল্পনার কথা।
পরে টিএফএতে যখন দায়িত্ব নিই তখন নিজে উদ্যোগ নিয়ে বেশ কিছু নর্থইস্টের সম্ভাবনাময় ছেলেকে তুলে এনেছিলাম। রেনেডি সিংহ, জেমস সিংহদের উঠে আসা সেখান থেকে। কিন্তু একটা টিএফএতে কতটুকু কাজ হবে! যদি তখনই উত্তর-পূর্ব ভারতে একটা পুরোদস্তুর অ্যাকাডেমি পেতাম, তা হলে আজ হয়তো আমরা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে পারতাম।
ফুটবলে আগের চেয়ে এখন অনেক টাকা এসেছে। ধন্যবাদ জন আব্রাহামকে। আইএসএলে টিম কিনতে গিয়ে নর্থইস্টের টিম নেওয়ার জন্য ওর সাহস আমায় মুগ্ধ করে। হয়তো ও বুঝেছে, নর্থইস্টটাই এই মুহূর্তে ভারতীয় ফুটবলের হাব।
এখনও সময় আছে। নর্থইস্টের ফুটবল নিয়ে ইতিবাচক কোনও পদক্ষেপ নিক ফেডারেশন। স্কাউটিং করে প্রতিভা তুলে আনুক। তা হলে আগামী দিনে আরও জেজে, সুনীলদের পাব আমরা। এতে আখেরে লাভ আমাদের দেশের।