FIFA World Cup 2026

ফুটবল বিশ্বকাপে রাজনীতির আঁচ, ট্রাম্প প্রশাসনের নানা নীতিতে অনিশ্চয়তা, আশঙ্কার আবহ, চ্যালেঞ্জের মুখে ফিফা

বলা হয়, ‘কিপ স্পোর্টস ক্লিন অফ পলিটিক্স’। খেলাধুলোকে রাজনীতি মুক্ত রাখার আবেদন আসন্ন বিশ্বকাপে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময় বলবে। সন্দীহান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ১৭:৪১
Share:

ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বিশ্বকাপ ফুটবল। গোটা বিশ্ব চার বছর অপেক্ষা করে থাকে এই প্রতিযোগিতার জন্য। জনপ্রিয়তম খেলার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। বিশ্বজয়ের লড়াইয়ের বাইরে থাকা দেশগুলির ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যেও উত্তেজনা, উন্মাদনা কম থাকে না। বিশ্বকাপ ঘিরে মাঠের লড়াই, গ্যালারির উত্তেজনা নতুন নয়। এ বারও আছে। সঙ্গে আছে ফুটবলের উত্তাপের আড়ালে রাজনীতির আঁচ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব ফিফা আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকোকে দেওয়ার পর থেকেই রাজনীতির চোরাস্রোত বইছে। সুষ্ঠু ভাবে বিশ্বকাপ উতরে দেওয়া এ বার ফিফার চ্যালেঞ্জ।

Advertisement

বিতর্কের ভরকেন্দ্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্ত। ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযান, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি, বিদেশ নীতি, বাণিজ্য শুল্ক, কানাডা এবং মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্ত বিতর্কের মতো নানা বিষয় জড়িয়ে গিয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে আমেরিকার স্বাস্থ্য নির্দেশিকা ‘ইবোলা কোয়ারেন্টইন’।

বলা হয়, ‘কিপ স্পোর্টস ক্লিন অফ পলিটিক্স’। খেলাধুলোকে রাজনীতিমুক্ত রাখার আবেদন আসন্ন বিশ্বকাপে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময় বলবে। বিশ্বকাপ কি আদৌ রাজনীতিমুক্ত হবে? সন্দীহান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল। নানা বিতর্কেও আমেরিকার মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত থেকে সরেনি ফিফা। ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সুসম্পর্ক অনেকটাই আড়াল করছে আমেরিকাকে।

Advertisement

রাজনীতি, ক্ষমতা এবং অর্থশক্তি

যে কোনও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ক্ষমতা এবং অর্থশক্তি। ফুটবল ব্যতিক্রম নয়। এ কারণেই এ বারের বিশ্বকাপ আলাদা। দুই প্রতিবেশী কানাডা এবং মেক্সিকোর সঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে আমেরিকা। দু’দেশের সঙ্গেই আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মধুর নয়। এ বারের বিশ্বকাপ তাই ফুটবলের ইতিহাসে রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে জটিল প্রতিযোগিতা বলে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভাল হলেও অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। অনুপ্রবেশ, মাদক পাচারের মতো কিছু বিষয় নিয়ে আবার কূটনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতিও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে। তিক্ততা তৈরি হয়েছে বাণিজ্য সম্পর্কে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কানাডা এবং মেক্সিকো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। তিন আয়োজক দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েন বিশ্বকাপে প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশ নীতি

বছরের শুরুতেই কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মোরোস এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আমেরিকায় তুলে নিয়ে যান ট্রাম্প। তার পর কিউবা এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুঁশিয়ারি দেন। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বশাসিত অঞ্চল। স্বাভাবিক ভাবেই ডেনমার্কও প্রয়োজনে সামরিক প্রতিরোধের কথা জানিয়েছে। হুঁশিয়ারি দেয় নেটোও। যে কোনও সদস্য দেশের উপর সামরিক হামলা বা আগ্রাসনের পরিস্থিতি তৈরি হলে নেটো আসরে নামে। ডেনমার্কের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি।

ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়ে জার্মানি, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেনের মতো দেশ বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি দেয়। যুক্তরাজ্যের সংসদ এক ধাপ এগিয়ে আমেরিকাকেই বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে। ট্রাম্পের আগ্রাসী বিদেশ নীতির বিরুদ্ধে সরব রাশিয়া, চিন-সহ বিশ্বের একাধিক দেশ। তার মধ্যে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দেশও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি আঁচ করে আসরে নামতে হয় ফিফাকে। জার্মানি, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ সরে দাঁড়ালে বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে জৌলুস হারাবে। মুখ ফেরাতে পারে স্পনসরেরা। আমেরিকার প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে ফিফা কর্তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার করার চেষ্টা করেন।

আমেরিকা-ইরান সংঘাত

ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনা কমার আগেই ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক হামলা চালায় আমেরিকা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই হামলার পাল্টা জবাব দেয় ইরানও। পশ্চিম এশিয়ায় তৈরি হয় যুদ্ধপরিস্থিতি। সংঘর্ষ বিরতি হলেও উত্তেজনা রয়েছে যথেষ্ট। সামরিক সংঘাতের ফলে ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যা আরও বাড়িয়ে দেয় ট্রাম্পের একটি মন্তব্য। সমাজমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, “বিশ্বকাপে ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে স্বাগত। কিন্তু আমি মনে করি না, এই পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওদের এখানে আসা উচিত।” জবাবে ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমদ দোনিয়ামালি বলেন, “এই দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে। সেটা মাথায় রেখে কোনও পরিস্থিতিতেই আমরা বিশ্বকাপে খেলতে যাব না। আমাদের শিশুরা নিরাপদ নয়। স্বাভাবিক ভাবেই এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ খেলার কথা মাথায় রাখাই উচিত নয়।”

পরিস্থিতি সামলাতে আবার আসরে নামতে হয় ফিফাকে। সভাপতি ইনফান্তিনো নিজে বৈঠক করেন ট্রাম্পের সঙ্গে। আমেরিকার মাটিতে ইরানের বিশ্বকাপ খেলতে যাতে সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করেন। তার পরও আমেরিকা থেকে চূড়ান্ত প্রস্তুতি শিবির মেক্সিকোয় সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে ইরান। ট্রাম্পের দেশে ফুটবলারদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে করছেন ইরানের ফুটবল কর্তারা। ইরানের ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বকাপের সময়ও ঢুকতে না দেওয়ার কথা জানিয়েছে আমেরিকা।

আমেরিকার অভিবাসন নীতি

বিশ্বকাপের খেলা দেখতে গোটা বিশ্বের লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী হাজির হন আয়োজক দেশে। আমেরিকার অভিবাসন নীতি ভিনদেশি ফুটবলপ্রেমীদেরও আশঙ্কায় রেখেছে। জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে। বলা হয়েছে, বিশ্বকাপের সময় অল্প দিনের জন্য ছাড় দেওয়া হবে। তবে এই তালিকায় নেই বিশ্বকাপের চার দেশ হাইতি, আইভোরি কোস্ট, সেনেগাল এবং ব্রাজিল! বিশ্বকাপের সফলতম দেশের সমর্থকদের রাজনৈতিক কারণে আমেরিকায় ঢুকতে দিতে রাজি নন ট্রাম্প। অথচ ব্রাজিলের সমর্থকেরা প্রতি বিশ্বকাপেই আলাদা রং যোগ করেন। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু দেশের ফুটবলপ্রেমীরা উদ্বিগ্ন। আশঙ্কা আমেরিকায় বিশ্বকাপ দেখতে গেলে হেনস্থার শিকার হতে পারেন তাঁরা।

আমেরিকার বিভিন্ন নীতির কারণে বিশ্বকাপ ঘিরে অনিশ্চয়তা, আশঙ্কার আবহ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইবোলার আতঙ্ক। মধ্য আফ্রিকার দুই দেশ ডিআর কঙ্গো এবং উগান্ডায় ইবোলার প্রকোপ নিয়ে চিন্তিত প্রায় সব দেশ। বিশ্বকাপে খেলবে ডিআর কঙ্গো। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি শিবির তারা সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে বেলজিয়ামে। ইবোলা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলি থেকে আসা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়েছে বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement