দুরন্ত: নিউ জার্সিতে জার্মানির বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলের পরে উল্লাস ইকুয়েডরের জয়ের নায়ক প্লাটার। ছবি: রয়টার্স।
টাইমস স্ক্যোয়ার এত দিন হলুদের দখলে ছিল। ব্রাজ়িলের হলুদ। এ বার তা অন্য হলুদের দখলে চলে গেল। ইকুয়েডরের হলুদ। আমেরিকায় অন্তত আট লক্ষ ইকুয়েডরের মানুষের বাস। যার গরিষ্ঠ অংশ থাকেন নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সিতে। গত বার ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে চেলসির হয়ে খেলা তাঁদের দেশের কাইসেদোর জন্য গলা ফাটাতে হাজার, হাজার মানুষ হাজির হয়ে গিয়েছিলেন।
কে জানত, সেটা শুধু ঝলক ছিল। আরও ঐতিহাসিক ছবি তাঁরা তৈরি করবেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। জার্মানিকে ২-১ হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অঘটন ঘটানোর পরে টাইমস স্ক্যোয়ারকে ব্রাজ়িলের হলুদ থেকে ইকুয়েডরের হলুদে পাল্টে দিলেন তাঁরা। ও দিকে, দেশের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া জাতীয় ছুটি ঘোষণা করে দিয়েছেন। ‘‘এই মুহূর্তটা সারা দেশের জন্য গর্বের, একতার। সারা দেশ একসঙ্গে এই জয়ের উৎসব করবে,’’ শুক্রবার সারা দেশে ছুটি থাকবে, ঘোষণা করে বিবৃতি প্রেসিডেন্টের।
এক-এক সময় মনে হচ্ছে, চলতি বিশ্বকাপে তারকাদের নিয়েই সকলে ব্যস্ত। লিয়োনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, কিলিয়ান এমবাপে, লামিনে ইয়ামাল, নেমার, আর্লিং হালান্ড। বড় বড় দলগুলির দিকেই যত নজর। তার মধ্যেই তথাকথিত ছোট দলগুলি তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতির কথা জানান দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে কেপ ভার্দের স্পেনকে রুখে দেওয়া। গ্রুপ পর্ব শেষ হয়ে নক-আউটের দিকে এগোচ্ছে প্রতিযোগিতা। সকলে যে ভেবেছিল, ছোট দলগুলির দৌড় গ্রুপ পর্বেই থেমে যাবে, তা কিন্তু হচ্ছে না।
জাপানের নক-আউট পর্বে যাওয়া হয়তো খুব আশ্চর্যের নয়, তবু মনে রাখতে হবে তাদের কেউ কেউ ডার্ক হর্স আখ্যা দিয়ে রেখেছেন। এর পর ব্রাজ়িলের বিরুদ্ধে খেলবে সামুরাই ব্লু এবং অনেকে এখন থেকেই সাবধান করে দিচ্ছেন কার্লো আনচেলোত্তির দলকে যে, হাল্কা ভাবে নিলে ঠকতে হতে পারে। চার বছর আগে ফুটবলের সুপারপাওয়ার হওয়ার জন্য তারা একটি প্রকল্প তৈরি করে। যার নামকরণ করা হয় ‘‘দ্য জাপান ওয়ে’। চার-পাঁচ বছরে ফাটিয়ে দেব, বাজিমাত করে দেব মার্কা নকল হুঙ্কার সেখানে নেই। বরং ধীরেসুস্থে কী ভাবে এভারেস্টে ওঠা যায়, তার বাস্তবসম্মত রাস্তা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে, ২০৫০ সালে বিশ্বকাপ জিততে চাই আমরা। ২০৩০, ২০৩৪-এর মতো কিছু টার্গেট দেওয়া হয়নি যে, রাতারাতি চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলাম। সেখানে আরও একটি অসাধারণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। জাপান কী চায়? না, ফুটবলের মাধ্যমে এক খুশির দেশ! জাপানের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে কতটা রক্ষণাত্মক হতে হবে, কতটা আগ্রাসী— এ রকম গভীর আলোচনাও ‘জাপান ওয়ে’-তে বর্ণনা করা রয়েছে। হাজ়িমে মোরিয়াসুর দল বিশ্বকাপে এসেছে ব্রাজ়িল ও ইংল্যান্ডকে ফ্রেন্ডলিতে হারিয়ে। বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে যে ব্রাজ়িলকে খেলতে হবে, তা নিশ্চয়ই ফ্রেন্ডলির চেয়ে আলাদা। তবু কে তাদের খাটো করে দেখবে?
উচ্ছ্বাস: সুইডেনের বিরুদ্ধে জাপানকে এগিয়ে দিয়ে মায়েদা। ছবি: রয়টার্স।
দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে প্রথম বার বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচটা যখন শুরু হয়, তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ভোর তিনটে। যারা বেশি পরিচিত ক্রিকেট ও রাগবির জন্য, সেই দেশ পাজামা পরা অবস্থায় রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল বিজয়োৎসব করতে। ২০১০-এ নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করেও নক-আউট পর্বে যেতে পারেনি বাফানা বাফানা। অ্যালান ডোনাল্ড, জাক কালিস, এ বি ডিভিলিয়ার্সের দেশকে এত দিন এই ব্যর্থতা তাড়া করছিল যে, তারাই একমাত্র আয়োজক যারা গ্রুপ পর্বের বাধা পেরতে পারেনি। এ বারে সেই জ্বালা কিছুটা অন্তত জুড়োল চার বারের চেষ্টা প্রথম নক-আউটে গিয়ে।
কিন্তু ইকুয়েডর? কেউ ভেবেছিল তারা জার্মানিকে হারিয়ে দেবে?
যারা ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে অবশ্য ইকুয়েডর খুব হেলাফেলা করার মতো দল নয়। তাদের ফিফা র্যাঙ্কিং ২৩। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যোগ্যতা অর্জন পর্বের শেষে দ্বিতীয় হয়েছিল তারা। ব্রাজ়িল, কলম্বিয়া, উরুগুয়ে সকলকে পিছনে ফেলে দিয়ে। ১৮টি যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচের মাত্র দু’টি হেরেছিল। মাত্র পাঁচটা গোল খেয়েছিল তারা, তা থেকেই প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে ইকুয়েডরের রক্ষণ কতটা মজবুত। তাদের হাতে বিশ্বমানের ফুটবলারও আছে। চেলসির কাইসেদো ছাড়াও দু’টি পরিচিত মুখ হচ্ছে প্যারিস সঁ জরমঁ-র উইলিয়ান পাকো এবং আর্সেনালের পিয়েরো হিনক্যাপি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে এঁরা মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবু কেউ তাদের খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে রাখেনি। আইভরি কোস্টের কাছে হার এবং কুরাসাওয়ের সঙ্গে ড্র আরও তাদের সম্ভাবনাকে তুবড়ে দিয়ে যায়। এর পর নক-আউটে যেতে গেলে জার্মানিকে হারাতেই হত। দিয়েগো মারাদোনার সেই বিখ্যাত উক্তির কথা কি ইকুয়েডরের এই দলের ফুটবলারেরা জানেন? ‘‘জার্মানিকে হারানোর উপায় হচ্ছে ওদের মেরে ফেলা,’’ বলেছিলেন দিয়েগো। ইকুয়েডর যে সেই অসাধ্য সাধন করে ফেলবে, কে ভেবেছিল!
তা-ও আবার কী, দুই মিনিটের এমন একটা গোলে তারা পিছিয়ে পড়ল যা নিয়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এমন একটা গোল যা দেখে সকলের মনে হয়েছে, রেফারির ভুলে এগিয়ে গেল জার্মানি। তার পরেও মনোবল হারায়নি ইকুয়েডর। সান্ডারল্যান্ডের ২৩ বছরের উইঙ্গার নিলসন আঙ্গুলো গোল শোধ দিলেন, তার পর জয়সূচক গোল করে দেশের নায়ক গঞ্জালো প্লাটা, যিনি ব্রাজ়িলের ফ্ল্যামেঙ্গো ক্লাবে খেলেন। কিন্তু এই ইকুয়েডর দলের সব চেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবলারের নাম কেভিন রদ্রিগেস। বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের খেলার সময় ক্লাব থেকে ফুটবলারদের ছাডছিল না। সেই সময় কেভিন খেলছিলেন ইকুয়েডরের দ্বিতীয় ডিভিশনে। পুরো দল গড়া যাচ্ছে না দেখে তাঁকে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এতটাই জানপ্রাণ দিয়ে লড়েন তিনি যে, সেই তীব্রতা দেখে বিশ্বকাপের দলে নেওয়া হয় কেভিনকে, যিনি জার্মানদের সঙ্গে শারীরিক ভাবে সেয়ানে-সেয়ানে লড়ে গেলেন।
ম্যাচ শেষে ইকুয়েডরের ফুটবলারেরা নানা ভাবে উৎসব করছিলেন। কিন্তু সেরা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাচেসের কাছ থেকে। লম্বা চুলের কোচ দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে গ্যালারিতে উঠে পড়লেন প্রায় পরিবারের সঙ্গে বিজয়োৎসব করবেন বলে। ইকুয়েডরে কোচ হিসেবে টেকা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। কোপা আমেরিকায় একবার আর্জেন্টিনাকে তারা প্রায় হারিয়ে দিচ্ছিল। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, ইকুয়েডর হেরে যায়। ড্রেসিংরুমেই বরখাস্ত করা হয় কোচকে। কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ড্র করার পরে সেবাস্তিয়ান বেকাচেসেও চাপে ছিলেন। জার্মানির কাছে হেরে বিদায় মিলে তাঁর কপালেও একই ‘পুরস্কার’ জুটত।
জার্মানির অধিনায়ক জোশুয়া খিমিচ হয়তো সেরা মন্তব্যটা করে গেলেন। হারের পরে বললেন, ‘‘দু’দলের মধ্যে তফাত ছিল একটাই। ওরা আমাদের চেয়ে বেশি জেতার বাসনা নিয়ে এসেছিল!’’ জাত্যাভিমানের জন্য বিখ্যাত জার্মানদের মুখ থেকে একদিন এ রকম কথা শোনা যাবে, কেউ ভাবতে পেরেছিল! ইকুয়েডর সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেখাল!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে