শশাঙ্ক মনোহর কখনও ফ্রন্টফুটে, কখনও ব্যাকফুটে। বৃহস্পতিবারের নাটকীয় ২৪ ঘণ্টা এ ভাবেই সামলাতে হল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসি়ডেন্টকে। যেখানে লোঢা কমিশন নিয়ে বিসিসিআইকে চরমপত্র দিয়ে রাখল সুপ্রিম কোর্ট।
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে দুবাইয়ে বৃহস্পতিবার নিজের প্রথম বৈঠকেই নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসনকে তুলে স্ট্যান্ডে ফেলে দিলেন মনোহর। এবং প্রায় একই সময় বিসিসিআইকে আবার সামলাতে হল সুপ্রিম কোর্টের ভয়ঙ্কর বাউন্সার।
শ্রীনির প্রভাব যখন আইসিসি থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিচ্ছিলেন মনোহর, তখন প্রায় একই সময় নয়াদিল্লিতে লোঢা কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার ব্যাপারে বক্তব্য রাখছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা। বোর্ডের আইনজীবীকে এ দিন প্রধান বিচারপতি টিএস ঠাকুর এবং বিচারপতি খলিফুল্লা বলেন, লোঢা কমিশনের সুপারিশকে আপনাদের সম্মান করতে হবে। এবং তা মেনে বিসিসিআইয়ে প্রয়োজনীয় বদল আনতে হবে। সেই সময় বোর্ড নিযুক্ত আইনজীবী শেখর নাফাড়ে যুক্তি দেন, ‘‘সব সুপারিশ মানতে গেলে প্রচুর জটিলতার সৃষ্টি হবে বোর্ডে।’’ এও বলা হয়, বিসিসিআই তামিলনাড়ু সোসাইটি অ্যাক্টের আওতায় নথিভুক্ত। সুপারিশগুলো মানতে গেলে সেটা বাতিল হয়ে যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এখন সে সব যুক্তি শুনতে আগ্রহী নয়। বরং তাদের বক্তব্য, নতুন কিছু করতে গেলে জটিলতা তৈরি হয়েই থাকে। প্রধান বিচারপতি ঠাকুর বলেন, ‘‘সুপারিশগুলো সব খুব সোজাসাপ্টা, সহজবোধ্য এবং যুক্তিপূর্ণ। আপনারা যদি এগুলো কার্যকর করতে না পারেন, তা হলে আমরা কমিটিকে বলব আপনাদের রাস্তা দেখাতে।’’ এর পরে আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘‘বিসিসিআইয়ের হাতে কিন্তু আর দ্বিতীয় ইনিংস নেই।’’
আদালত আগামী তেসরা মার্চ আবার শুনানির তারিখ দিয়েছে। যে দিন বোর্ডের পাল্টা যুক্তি শোনা হবে। বিসিসিআই আইনজীবী এ দিন বলেছেন, ‘‘আমরা সংস্কারের বিপক্ষে নই। তবে আমূল সংস্কার করতে গেলে কিছু টেকনিক্যাল এবং আইনগত সমস্যা আছে। আমাদের লিগ্যাল কমিটি এই নিয়ে বসবে।’’
সুপ্রিম কোর্ট এ দিন যতই কঠোর মনোভাব নিক না কেন, বোর্ডের একটা অংশ কিন্তু আশায়, তাদের যুক্তি শোনার পর সব সুপারিশ মানার ব্যাপারে এতটা কঠোর হবে না শীর্ষ আদালত। আগামী রবিবার মুম্বইয়ে বোর্ডের আইনি কমিটির মিটিং ডাকা হয়েছে। সেখানেই যাবতীয় খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করা হবে। মনোহর দেশে ফিরলে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলেই চূড়ান্ত গেমপ্ল্যান ঠিক করা হবে। তবে জানা গিয়েছে, স্পেশ্যাল জেনারেল মিটিং ডাকা ছাড়া রাস্তা নেই বোর্ডের। বোর্ডের এক শীর্ষকর্তা এ দিন ফোনে বললেন, ‘‘যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে করে এসজিএম ডাকতেই হবে। তিন দিনের নোটিশেও মিটিং ডাকা যায়।’’ জানা যাচ্ছে, বোর্ডের লিগ্যাল কমিটির মিটিংয়ে ঠিক হবে, সুপ্রিম কোর্টের কাছে সব সুপারিশ না মানার পক্ষে কী কী আইনগত যুক্তি দেওয়া হবে, তার খসড়া। এর পর বোর্ডের এসজিএমে চূড়ান্ত গেমপ্ল্যান ঠিক করা হবে।
আইসিসি-তে অবশ্য তিনি কী ভাবে খেলবেন, তার গেমপ্ল্যান আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন মনোহর। সেই মতোই এ দিন ঝোড়ো ইনিংস খেলে গেলেন। গত বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিসিসিআইয়ের দায়িত্ব নতুন করে নেওয়ার দিনই মনোহর বলেছিলেন, শ্রীনির ছায়া তিনি মুছে দেবেন। বিসিসিআই থেকে শ্রীনির প্রভাব আগেই দূর হয়েছিল। এ বার আইসিসি থেকেও হল। মনোহর এ দিন বৈঠকে প্রস্তাব দেন, ২০১৪ সালে আইসিসি-তে যে সব গঠনতান্ত্রিক বদল হয়েছিল, তা পুরোপুরি রিভিউ করে দেখা হোক।
বছর দেড়েক আগে আইসিসি-র দায়িত্বে এসে শ্রীনিবাসন নিজের হাতেই প্রায় সমস্ত ক্ষমতা তুলে নিয়েছিলেন। তৈরি করেছিলেন ‘বিগ থ্রি’-র জোট। যেখানে আইসিসি-র ভাগ্যনিয়ন্তা ছিল ভারত-ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া বোর্ড। শ্রীনির জায়গায় চেয়ারম্যান হয়ে তাঁর প্রথম বৈঠকেই এই ত্রিপাক্ষিক জোটকে মুছে দিলেন মনোহর। স্থায়ী সদস্য হিসেবে আইসিসি-তে আর কোনও অস্তিত্ব রইল না বিগ থ্রি-র। বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট এ দিন দুবাইয়ে পরিষ্কার বলে দিলেন, ‘‘কোনও সদস্যই অন্য সদস্যের চেয়ে বড় নয়। কারও হাতেই অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকবে না।’’
শ্রীনি জমানায় ঠিক হয়, ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিরা আইসিসি-র ফিনান্স কমিটি এবং এগজিকিউটিভ কমিটিতে স্থায়ী সদস্য হিসেবে থাকবেন। এবং তিনটি বোর্ডই বিশেষ আর্থিক সুবিধা ভোগ করবে। এ দিন মনোহর বিগ থ্রি-র সেই ক্ষমতা মুছে দিলেন। একই সঙ্গে ঠিক হল,স্বার্থ-সংঘাত এড়াতে কেউ আইসিসি চেয়ারম্যান হলে তিনি আর দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কোনও পদে থাকতে পারবেন না। শ্রীনির জায়গায় আসা মনোহরের এ বছরই মেয়াদ ফুরোচ্ছে। ২০১৬ সালের জুন মাসে যিনি চেয়ারম্যান পদের জন্য লড়বেন, তাঁকে পড়তে হবে এই নতুন নিয়মের আওতায়। যে নিয়ম আরও বলছে, চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচনে লড়তে গেলে প্রার্থীকে হয় প্রাক্তন বা বর্তমান আইসিসি বোর্ড ডিরেক্টর হতে হবে আর অন্তত দু’জন পূর্ণ সদস্য ডিরেক্টরের সমর্থন পেতে হবে।
এ দিন আবার লোঢা কমিশনের বিশেষ বিশেষ যে সুপারিশগুলো সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সমর্থন পেল, তা হল, এক রাজ্য এক ভোট। একবার পদে আসার পর তিন বছর ‘বিশ্রাম।’ মন্ত্রী, সরকারি পদাধিকারীরা ক্রিকেট প্রশাসনে নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট সংখ্যা পাঁচ থেকে এক। প্রক্সি ভোটিং বন্ধ। সব সুপারিশ মানা হলে পওয়ার-জেটলিদের সামনে বোর্ডের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আবার এক রাজ্য এক ভোট মানে মহারাষ্ট্র থেকে হয়তো মুম্বই ছাড়া কারও ভোট থাকবে না, প্রশ্ন উঠবে গুজরাত থেকে কোন সংস্থা ভোট দেবে। বাংলা থেকে ভোটাধিকার হারাবে এনসিসি।
লোঢা কমিশনের সুপারিশ নিয়ে তাদের অবস্থান জানতে চেয়ে এর আগে রাজ্য সংস্থাগুলোকে চিঠি পাঠিয়েছিল বোর্ড। যার জবাবে বেশ কিছু রাজ্য সংস্থা জানিয়ে দিয়েছে, সব ক’টা সুপারিশ তারা মানতে রাজি নয়। সিএবি যেমন লোঢা কমিশনের দশটা সুপারিশে সায় দেয়নি। এ দিন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যাকে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন, ‘‘আমি এখনও এ ব্যাপারে কিছু শুনিনি। আগে সব জানি, তার পর এ নিয়ে কথা বলব। তবে শীর্ষ আদালতের নির্দেশ তো সবাইকেই মেনে চলতে হয়।’’
আগামী তেসরা মার্চের পর বিসিসিআইয়ের ভাগ্য কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা মতের সৃষ্টি হয়েছে। ললিত মোদী যেমন টুইট করে বলেছেন, ‘‘সময় এসেছে খেলাটাকে পরিচ্ছন্ন করে ঘর পরিষ্কার করার।’’ বোর্ডের কেউ কেউ আবার মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু সব সুপারিশের উপর আলাদা আলাদা করে জোর দেয়নি, তাই শেষমেশ একটা মধ্যপন্থী রাস্তা ঠিক বার করা যাবে। তবে সরকারি ভাবে বোর্ডের কোনও কর্তা এখনও মুখ খোলেননি। বোর্ড প্রেসিডেন্ট দুবাইয়ে। বোর্ড সচিব অনুরাগ ঠাকুরকে অনেকবার ফোন করে পাওয়া যায়নি। তবে আজ, শুক্রবার নয়াদিল্লিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ভারতীয় দল ঘোষণা। সেখানে সাংবাদিকদের সামনে পড়তে হতে পারে অনুরাগকে।
অস্ট্রেলিয়াকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৩-০ হারানোর মতোই আইসিসি-তে সহজে ম্যাচ বার করে নিয়েছেন মনোহর। এ বার বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট ও এক জন দুঁদে আইনজীবী হিসেবে তিনি সুপ্রিম কোর্টের ভয়ঙ্কর বাউন্সারটা কী ভাবে সামলান, সেটাই দেখার।