ইউরোয় ‘আইস এজ’ আটকানোর আগে দেশঁকে কামড়াচ্ছে হজসন আর ইতিহাসের পিরান্হা

ক্রুদ্ধ গর্জনটা ছেড়েছেন আইসল্যান্ড কোচ হেইমের হ্যালগ্রিমসন। ভদ্রলোক নাকি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, ফ্রান্সের কোথায় সমস্যা। কোথায় আঘাত করলে ফ্রান্সের জাতীয় স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকেই ধরাশায়ী করা যাবে।

Advertisement

রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০১৬ ০৩:৫৮
Share:

গোটা দেশ যাঁর দিকে তাকিয়ে। প্র্যাকটিসে ফরাসি কোচ। -রয়টার্স

ক্রুদ্ধ গর্জনটা ছেড়েছেন আইসল্যান্ড কোচ হেইমের হ্যালগ্রিমসন। ভদ্রলোক নাকি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, ফ্রান্সের কোথায় সমস্যা। কোথায় আঘাত করলে ফ্রান্সের জাতীয় স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকেই ধরাশায়ী করা যাবে। একেবারে সোজাসুজি কোচ বলাটা ভুল হল, আদতে টিমের যুগ্ম কোচ তিনি। কিন্তু ইংরেজদের উড়িয়ে দিয়ে যে উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস জমা হয়েছে, দেখলে কে বলবে তিনি পুঁচকে একটা দেশের কোচ? হুঙ্কার-আস্ফালনে-ধূর্ততায় তো সময়-সময় তাঁকে বর্তমানের জার্মানি বা পুরনো ব্রাজিল বাসিন্দা লাগছে!

Advertisement

হ্যালগ্রিমসন একটা বলছেন, একটা বলছেন না। বরফ-দেশের যুগ্ম-কোচের এটা বলতে অসুবিধে নেই যে, ফ্রান্সের উপর মহাচাপের আল্পস পর্বত তাঁরা দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছেন। তিন লক্ষ তিরিশ হাজার আইসল্যান্ডবাসী চরম সুখস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি ইউরো মহামঞ্চে তাদের শেষ আট উপত্যকায় জায়গা হবে। অতএব হ্যালগ্রিমসনের অভিমত হল, চাপটা আইসল্যান্ডের উপর বিন্দুমাত্র নেই। হেরে গেলে কেউ একটা টুঁ শব্দ করবে না। প্রসন্নহৃদয়ে প্রত্যেকে দেশে ফেরার ফ্লাইট ধরবে। কিন্তু উল্টোটা হলে? ফ্রান্সের কিন্তু লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়া ছাড়া তখন গতি নেই। বোঝা গেল। কিন্তু দ্বিতীয়টা? ফ্রান্সের বিপদটা আসতে পারে কোথা থেকে? আন্তর্জাতিক মিডিয়া জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু হ্যালগ্রিমসন পাত্তা দিচ্ছেন না। উল্টে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে শুনিয়ে রাখছেন, “কেন, সেটা আপনাদের বলতে যাব কেন? পেয়েছি আমরা খুঁজে ঠিকই। কিন্তু সেটা মোটেও মিডিয়াকে বলার জন্য নয়!”

প্রতিপক্ষের এত নাটকীয় নাচনকোঁদন দেখে প্যারিস একটু হতচকিত, কিছুটা অবাকই। প্যারিসের শ্যালিটন বলে জায়গাটা সঁজেলিজে বা আইফেল টাওয়ার চত্বরের মতো আভিজাত্যের চাদরে আষ্টেপৃষ্ঠে মোড়া না থাকলেও একটা ছিমছাম সৌন্দর্য আছে। পাঁচ পা হাঁটলে এক-একটা রেস্তোঁরা, বার, বাজারদোকান পেয়ে যাওয়া যায়। জায়গাটা বেশ শান্ত, কেউ হইহট্টগোল বড় একটা পছন্দ করে না। শনিবার সকালের দিকে ওই অঞ্চলে ঘুরতে-ঘুরতে এ দেশে বসবাসকারী এক ভারতীয় ডাক্তারকে পাওয়া গেল, যিনি শুষ্কং-কাষ্ঠং অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি নিয়ম করে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ খেলার আস্বাদও নিয়ে থাকেন। ইউরো দেখছেন, ফ্রান্সকে সমর্থন করেন, দিদিয়ের দেশঁ-র টিম নিয়েও সম্যক ধারণা আছে। রবিবার রাতে আইসল্যান্ড-উত্তরণ থামিয়ে দেশঁদের ফরাসি বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হবে কি না জানতে চাওয়ায় বললেন যে, হওয়া উচিত। “কেউ কেউ দেখছি, ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডকে গুলিয়ে ফেলছে। মনে রাখতে হবে, ইংল্যান্ড একটা গোল দিলে দু’টো হজম করতে পারে। কিন্তু ফ্রান্স কোনও দিন করবে না। আয়ারল্যান্ডের ম্যাচটা তো দেখলেন। একটা খেয়ে কেমন দু’টো দিল,” বলছিলেন সদানন্দ রাজকুমার নামের ওই ভদ্রলোক। ভারতীয় ডাক্তারের ধারণা, আইসল্যান্ড যতই টুর্নামেন্টে ভাল খেলুক, ফ্রান্স ফ্রান্স। ফুটবল ঐতিহ্য বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। অন্তত দু’গোলে নাকি জিতবে দেশঁর টিম!

Advertisement

মজার হল, স্বয়ং দিদিয়ের দেশঁ-ই অতটা গরগরে বিশ্বাস দেখাচ্ছেন না। যে মৃদু ঠকঠকানির কারণ একটা নয়, অনেকগুলো হতে পারে। একটা অবশ্যই মিডিয়া। আইসল্যান্ডের এক সাংবাদিক দিব্য এ দিন দেশঁকে যেন কলার ধরে আছড়ে ফেললেন আঠারো বছর পুরনো এক ঘটনায়! সে দিনও এ রকম ফ্রান্স বনাম আইসল্যান্ড ছিল, শুধু আজকেরটার বিচারে গুরুত্ব অনেক কম, আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি। ফরাসি কোচ সে দিন দেশের অধিনায়ক ছিলেন এবং তাঁর টিম নাকি আইসল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীতের সময় প্রবল হাসাহাসি করছিল!

অত হাসির কারণ কী ছিল সে দিন? আচম্বিতে এমন বেয়াড়া প্রশ্ন শুনে শনিবার বিভ্রান্ত হয়ে যান আঠারো বছর পরের দেশঁ। ফ্রান্স কোচ দ্রুত বলে দেন, “আপনি ভুল করছেন। আমাদের হাসির ভুল ব্যাখায় যাচ্ছেন। শুনুন, আইসল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে আমরা মোটেও হাসাহাসি করিনি সে দিন। আমাদের টিমেরই এক প্লেয়ার লা মার্সেই ভুল উচ্চারণে গাওয়ায় হাসছিলাম।” ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ এখানে শেষ হয় না। দেশঁ আরও বলতে থাকেন, “দেখুন, ওটা অতীত। ফ্রান্স তখন সবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সময়টাই আলাদা ছিল। আমরা কিন্তু আইসল্যান্ডকে প্রচণ্ড সম্মান করি। আপনাদের প্লেয়ারদের কেউ কেউ প্রিমিয়ার লিগ খেলে, আর আইসল্যান্ডকে মোটেও আমরা ছোট দেশ মনে করি না। বরং বলি যে, আইসল্যান্ড কপালজোরে এত দূর আসেনি। ভাল খেলে এসেছে।” লে ব্ল্যুজয়ের গোলকিপার অধিনায়ক হুগো লরিসকেও চূড়ান্ত সম্মানসহ ইউরোর ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’ নিয়ে এ দিন ভাল-ভাল কথা বলতে শোনা গিয়েছে।

উপায়ও কী? একে আঠারো বছরের পুরনো বিতর্ক। তার উপর আবার রয় হজসন! সশরীর নন, ইউরোতেও আর নেই, কিন্তু রয় হজসনের ছায়াকেও যে রবিবার স্তাদ দে ফ্রান্সে খেলতে হবে লরিসদের!

আইসল্যান্ড কোচ লার্স লেগারব্যাককে ফুটবল-কোচিংয়ের শস্ত্রশিক্ষায় কেউ যদি দীক্ষিত করে থাকেন, তিনি রয় হজসন। চাকরি চলে যাওয়া ইংল্যান্ড কোচ। সত্তর দশকের মাঝামাঝি ছোট টিম নিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলার যে জপমন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন হজসন, লেগারব্যাক আজ তাই করে যাচ্ছেন। লোকে নাম দিয়েছিল ফ্যান্সি-ফ্রি ফুটবল। দেখনদারির বিলাসিতা বাদ দাও। ৪-৪-২ খেলো। বল পেলে সেটা প্রতিপক্ষের বক্সের দিকে পাঠিয়ে দাও, যাতে তারা নিজেদের দুর্গে ব্যস্ত থাকে। গুরুমারা বিদ্যে বলে বাংলায় একটা কথা আছে। ওয়েন রুনিদের বিরুদ্ধে লেগারব্যাক স্বয়ং হজসনের উপরেই ওই ফ্যান্সি ফ্রি ফুটবলের দাওয়াই নিয়ে চড়াও হন, এবং জিতেও যান। লেগারব্যাকের মনে হয়, ছোট টিমগুলোর ক্ষেত্রে এ হেন হজসন-দর্শন একেবারে অব্যর্থ। জাদুগরির কাজ করে। এবং বোঝা যায়, আতঙ্কিত বাকারি সায়না কেন বলছেন, আইসল্যান্ড বধ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে ফ্রান্সকে। কেন দিদিয়ের দেশঁকে কাগজে-কলমে একটা সহজ ম্যাচের আগে এতটা টেনশনাক্রান্ত দেখাচ্ছে।

এরিক কঁতোনা থেকে রয় হজসন, ইতিহাসের পিরান্হা সাদা চুলের বিশ্বজয়ীর যন্ত্রণার কি আর শেষ আছে?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement