ছুটি কাটুক লাদাখের পথে প্রান্তরে

লেহ-র বুকে সোনালী সন্ধ্যা।

ঘন নীল আকাশের পটভূমিকায় ভেসে থাকা সাদা মেঘের টুকরো, সোনালি, হলুদ, বাদামি রঙের পর্বতের সারি, সামনে সাদা স্তূপ আর চোরতেন-এর দৃশ্যে লাদাখ এখন আমাদের সুপরিচিত। রুক্ষ পার্বত্য উপত্যকা, উচ্ছ্বল নদী, পর্বতের গায়ে ঝুলে থাকা গুম্ফা, তুঁতে নীল জলের সুবিশাল হ্রদের বিস্তার আর সহজ সরল মানুষের আতিথেয়তা দুর্গম এই অঞ্চলকে পর্যটক মহলে করে তুলেছে জনপ্রিয়।

লাদাখ উপত্যকায় পৌঁছনো মানে হিমালয় পর্বতমালাকে উল্টো দিক থেকে দেখা। পরিচিত সুজলা সুফলা সজীব পার্বত্যভূমি এ দিকে বন্ধুর। বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে এখানের ভূপ্রকৃতি, গড়ন, মানুষজন, সংস্কৃতি— সবই যেন একটু অন্য রকম। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে প্রাচীন কাল থেকেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত সিন্ধুনদের তীরে অবস্থিত লেহ একটি আধুনিক শহর ও এই উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র। তবে নাগরিক জীবনের অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ছন্দের দিক থেকে তা যেন ধরে রেখেছে এক অদ্ভুত স্থির মজবুত অতীতকে। লেহ, শ্রীনগর এবং মানালির সঙ্গে সড়কপথে এবং দিল্লি, শ্রীনগর জম্মুর সঙ্গে বিমানপথে যুক্ত। লেহ শহর থেকেই আমরা লাদাখ ভ্রমণ শুরু করতে পারি।

লেহ শহরের উচ্চতা প্রায় ১১৫০০ ফুটের কাছাকাছি। সিন্ধু তীরের এই শহরের ইতিহাস অতি প্রাচীন। মহাকাব্যিক অস্তিত্ব ছাড়াও কুশান যুগে, পরবর্তী কালে হিউয়েন সাং-এর বর্ণনায় এবং আরও পরে, অর্থাৎ মোগল পরবর্তী শিখ সাম্রাজ্যের যুগে জেনারেল জোরাওয়ার সিংহ লাদাখ জয় করে তাকে জম্মু-কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত করেন ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তী কালে ১৯৯৫ সালে লাদাখ স্বয়ংশাসিত পার্বত্য পরিষদে পরিণত হয়।

পাহাড়ের কোলে অসাধারণ শ্যে

লেহ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথটির নাম মেন বাজার রোড। ওপরে লেহ প্রাসাদ, তার নীচে জামে মসজিদ থেকে পথটি সোজা গিয়ে প্রধান দু’টি ভাগে ভাগ হয়েছে আর মসজিদ থেকে ডান দিকে গেছে আরও একটি চওড়া রাস্তা। এই চত্বর এবং আশ পাশ টাই সবচেয়ে জমজমাট । নানা দোকানপাট, শপিং সেন্টার, সাইবার কাফে, পার্লার, জেনারেল স্টোরস, বেশির ভাগ ব্যাঙ্ক এবং এটিএম, সবই এখানে। এখানেই লেহ গুম্ফা, বয়সে নবীন কিন্তু বিস্তারে চিত্তাকর্ষক। তাকে দেখে মসজিদের পেছনের পথ ধরে হাল্কা চড়াই পথে পায়ে হেঁটে পৌঁছনো যায় লেহ প্রাসাদে। পপলার উইলো কাঠের বাঁধুনিতে মাটির তৈরি সপ্তদশ শতকের প্রাসাদ। ভগ্নপ্রায় এই স্থাপত্যকে সংস্কার করে দর্শনযোগ্য করে তোলা হয়েছে। পাশেই একটি গুম্ফা। এই প্রাসাদের আশপাশ থেকে লেহ শহরের দৃশ্য চমৎকার। প্রাসাদ থেকে নেমে এসে কিছু জলযোগ সেরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ভাড়া করে শ্যে, থিকসে, হেমিস গুম্ফা ঘুরে আসা যায়। মোটামুটি সারাদিনের ভ্রমণ, বিকেলে গাড়িকে বলুন শান্তিস্তূপে নামিয়ে দিতে। শেষ বিকেলে বা সন্ধ্যায় শান্তিস্তূপের ওপর থেকে শহর ও উপত্যকার দৃশ্য মনে থাকবে চিরদিন।

লেহ থেকে শ্যে প্রায় ১৪ কিলোমিটার। ১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে টিলার ওপর তৈরি গুম্ফা ও প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ যদিও এখন প্রায় অনেকটাই সংস্কার করা হয়েছে। লেহ শহর থেকে মানালি-লেহ জাতীয় সড়ক ধরে পৌঁছন যায় এখানে। গাড়ি থেকে নেমে সামান্য চড়াই ভেঙে বড় সিঁড়ি তোরণ পেরিয়ে যাওয়া যায় ভেতরে। ধ্বংসপ্রাপ্ত এই প্রাসাদের ভেতরের ঘেরা বারান্দা থেকে নীচের পথঘাট, নাবাল জমি, উপত্যকার দৃশ্য ও আশে পাশে র পাহাড়ে র ওপর আরও কিছু গুম্ফার দৃশ্য মনে রাখার মত।

থিকসে গুম্ফায় ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ

শ্যে দেখে গাড়ি চেপে এগিয়ে যেতে হবে আরও ৫ কিলোমিটার দূরে থিকসে গুম্ফা দেখতে। এই অঞ্চলের সম্ভবত সব থেকে সুন্দর ও বিস্তৃত এই গুম্ফাটিকে দেখা যায় পৌঁছবার বেশ খানিকটা আগে থেকেই পাহাড়ের মাথায়। একটি ছোট পাথুরে পাহাড়ের ওপর ধাপে ধাপে ঘর-বাড়ি দিয়ে সাজানো অদ্ভুত সুন্দর এর দৃশ্য। একটি ছোট গ্রামই যেন গড়ে উঠেছে ছোট পাহাড়টিকে ঘিরে। একেবারে উপরে রয়েছে ত্রিস্তরবিশিষ্ট গুম্ফা, অধিষ্ঠিত রয়েছেন বুদ্ধ। সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে পায়ে হেঁটে চড়াই ভেঙে গ্রামের ভেতর দিয়ে পৌঁছন যায় গুম্ফার প্রধান দরজায়, কষ্টসাধ্য এই পথের বদলে পাশের পথ দিয়ে সোজা গাড়ি চেপেও পৌঁছনো যায় সেখানে। ভেতরে প্রাচীন মন্দির, প্রার্থনাকক্ষ ও লামাদের আবাসস্থল। মূল গর্ভগৃহতে সোনালী রঙের মৈত্রেয় বুদ্ধর সুবিশাল উপবিষ্ট মূর্তি অদ্বিতীয়। ওপরের তলা থেকে দেখা যায় মূর্তিটির মাথা সমেত ঊর্ধ্বাংশ আর বাকিটা ভাল করে দেখতে হলে নামতে হবে নীচের তলায়। ভেতরে দেওয়াল জোড়া ফ্রেসকোর কাজ, যার অনেকগুলোই পুনরুদ্ধার করা হয়েছে নতুন করে। থিকসে গুম্ফার সামনে রয়েছে সুন্দর রেস্তোরাঁ, সেরে নেওয়া যেতে পারে মধ্যাহ্নভোজ।

এর পর হেমিস গুম্ফা। থিকসে থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কারু। সেখান থেকে বাঁ দিকের পথ গিয়েছে বিখ্যাত প্যাংগং হ্রদের তীরে আর ডান দিকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দুরে সম্ভবত লাদাখের সব থেকে বিখ্যাত গুম্ফা হেমিস। দ্রুকপা সম্প্রদায়ের এই প্রাচীন গুম্ফার অবস্থান অতি চমকপ্রদ। একেবারে কাছে না পৌঁছন পর্যন্ত বোঝাই যায় না কী ভাবে পর্বতের খাঁজে লুকিয়ে রয়েছে এই সুবিশাল স্থাপত্য। প্রতি বছর জুন মাসের প্রথম অর্ধে গুরু পাদ্মসম্ভবের স্মরণে অনুষ্ঠিত হয় হেমিস উৎসব। প্রার্থনা, নাচ, গান নিয়ে এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান দেখতে দেশ-বিদেশের প্রচুর পর্যটক সমাগম হয়। এই গুম্ফাকে কেন্দ্র করেই রাশিয়ান সাংবাদিক নিকোলাস নটোভিচের বিতর্কিত গ্রন্থ The Unknown life of Jesus Christ পণ্ডিত মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিল একসময়।

শ্যে দেখে গাড়ি চেপে এগিয়ে যেতে হবে আরও ৫ কিলোমিটার দূরের থিকসে গুম্ফায়

ভাল করে দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে আসবে হেমিসে। এর পর ফিরতি পথে বাঁ দিকে সিন্ধুর অপর পারে পড়বে স্টাকনা গুম্ফা। যেতে হবে সিন্ধুর ওপরের লোহার সেতু পেরিয়ে। এটিও দ্রুকপা সম্প্রদায় পরিচালিত। স্টাকনা শব্দের অর্থ নাকি বাঘের নাক, বাঘের নাকের মতো আকৃতির টিলার ওপরে অবস্থানের জন্যই হয়তো তার এই নাম। গুম্ফাটি ষোড়শ শতকে তৈরি, অভ্যন্তরে অবোলকিতেশ্বরের সুন্দর মূর্তি। রয়েছে নানা ধরনের ফ্রেস্কোর অলংকরণ। জনা তিরিশেক লামার বাস এখানে। গুম্ফার খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বেলার লালচে হলুদ আলোতে সিন্ধু উপত্যকার দৃশ্য, পেছনে ছোট্ট গ্রামের জীবনচক্রের ছবি নয়নাভিরাম।

 

তথ্যপঞ্জী:

মানালি এবং শ্রীনগর থেকে সড়কপথে এবং দিল্লি ও জম্মু বা শ্রীনগর থেকে বিমানপথে লেহ পৌঁছন যেতে পারে। মানালি থেকে হিমাচল পর্যটনের বাসে একরাত কেলং-এ কাটিয়ে পর দিন বারলাচা পাস অতিক্রম করে সারচু, পাং, তাকলাং লা পেরিয়ে লেহ পৌঁছয় দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায়। প্রায় ৪৭৪ কিলোমিটার অসাধারণ বৈচিত্রে ভরা এই যাত্রাপথ সারা জীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকবে। কেলং-এ তাঁবুতে থাকা, নৈশভোজ, পরদিনের প্রাতরাশ সমেত মাথাপিছু ভাড়া ২৯০০ টাকা। এ ছাড়া প্রাইভেট গাড়ি বা শেয়ার জিপ এই পথে চলে। হিমাচল পর্যটনের বাস সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চালু থাকে। দিল্লি থেকে বিমানে লেহ আসা বেশ জনপ্রিয়, তবে হঠাৎ অতিরিক্ত উচ্চতায় পৌঁছে যাবার ফলে শরীরকে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রথম দিন হোটেলেই শুয়ে বসে বিশ্রাম নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই অঞ্চলের উচ্চতা বেশি এবং বায়ুর চাপ কম। হৃদযন্ত্রের কোনও অসুখ থাকলে বা উচ্চ রক্তচাপজনিত কোনও সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আসা উচিত। অতিরিক্ত শুকনো আবহাওয়ার জন্য প্রচুর জল বা জলীয় পানীয় খাওয়া জরুরি।

লেহ শহরে নানা দামের ও মানের প্রচুর হোটেল, গেস্ট হাউস আছে। হোমস্টে-ও রয়েছে পর্যাপ্ত। নুব্রা, পাংগং বা সোমোরিরি-র কাছেও রয়েছে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত। makemytrip, yatra প্রভৃতি মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে সংরক্ষণ করা যায় থাকা খাওয়ার জায়গা, অন্য পর্যটকদের মতামত দেখে আগেই জেনে নেওয়া যায় তাদের গুণগত মান।

লেহর হোটেল –

শান্তি স্তূপের কাছে শান্তি গেস্ট হাউস, প্যানোরামা ইকো হোটেল, ওল্ড রোডে চোস্ পা হোটেল, এ ছাড়া দামি হোটেলের মধ্যে (১০০০০ টাকা) Gomang Boutique Hotel, The Druk Ladakh, Ladakh Sarai,

মাঝারিদের মধ্যে (২০০০ – ৫০০০) Hotel Nalanda Ladakh , khan manjil ,Hotel Chube,Yarab Tso, Hotel Caravan Centre, Ladakh Continental

নুব্রা উপত্যকার ডিসকিটে বা হুণ্ডারে – ৪০০০ থেকে ১০০০০ টাকা ২ জনের থাকা খাওয়া প্রতিদিন

Hotel Olthang, Diskit/Phone: 01980 220 025, Royal Deluxe Camp, hunder village/Phone: 094192 17460, Himalayan Eco Resort, Village Hunder/Phone: 01980 200 444, Double Humped Camp – Hunder, Hunder/Phone: 094192 25839, Cold Desert Camp, Hunder/Phone: 096501 19494

সোমোরিরি হ্রদের একদম তীরে থাকার অনুমতি নেই তবে নিকটবর্তী কোরজোক গ্রামে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে। দুজনের একদিনের সম্ভাব্য থাকা খাওয়ার খরচ ৩০০০ থেকে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত।

Hotel Lake View Phone: +91-9469457025, 9419345362

Email: tsomoririhotellakeview@gmail.com

Goose Homestay, Mentok Guesthouse, Lake View Guest House /Contact: 01982 – 264867, Crane Guesthouse, Nomadic Life Camp,Contact: 09419178984, 01982-267321

 

প্যাংগং হ্রদের কাছে বেশ কটি থাকার জায়গার মধ্যে কয়েকটি হল

Camp redstart /Phone:01982-258222/ +91-9419233499/+91-9419177245/+91-9797467330

E-mail: contact@campredstart.com

Camp Martsemik La /075030 33585

Phone : +91-1982-250303(O),+91-1982-253010(R)

Mobile : : +91-9419177658, +91-9906981777 or +91-9596967073

Email : :martsemikcamp@yahoo.com

Pangong Delight Camp  /095968 11649

Highland Camps (Lukung Village) 094198 19078/ +91- 9716507246

খরচ খরচা দুজনের প্রতিদিন খাওয়া থাকা সমেত ২৫০০ থেকে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত।

লামায়ুরু তে থাকা খাবার জায়গা দু জনের ৪০০০ টাকার কাছাকাছি প্রতিদিন

Hotel Moonland

Mob : ( 91) 9419888508

Email : hotelmoonland@gmail.com

 

Hotel Fotola

Mobile : 09469048470

Landline : 01982-224528

Dragon Hotel & Guest House 

Phone: 094692 94037/+91 96 50 949347  / +91 94 69 294037

e-mail: dragonskyabu@gmail.com

 

লেহ থেকে সম্ভাব্য ট্যাক্সি ভাড়া , ১৫ থেকে ২০% বাড়তে পারে।

শ্যে – থিকসে – হেমিস – স্টাকনা – ৩০০০ টাকা

সমকর – শান্তিস্তূপ – লেহ প্যালেস ১২০০ টাকা

আলচি – লিকির – লামায়ুরু যাতায়াত ৬০০০ টাকা

দা যাতায়াত ৮০০০ টাকা

লেহ থেকে মানালি ২ দিন – ২৫০০০ টাকা

লেহ থেকে কারগিল ১ দিন ১০০০০ টাকা

নুব্রা উপত্যকা ২ দিন ৯০০০ টাকা

প্যাংগং ২ দিন ১১০০০ টাকা

প্যাংগং হয়ে সোমোরিরি ৩ দিন ২৫০০০ টাকা

(ছবি: লেখক)