Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

লাচুং-ইয়ুমথাং-লাচেন-গুরুদোংমার

নীলে-সাদায় অপরূপ গুরুদোংমার লেক।

লাচুং-ইয়ুমথাং:

পর্যটকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় উত্তর সিকিমের এই সফর। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অত্যধিক বরফের জন্য। আর বর্ষাকালটা (জুলাই-অগস্ট) রাস্তা প্রায়শই ভেঙে যাওয়ার কারণে, এই সফর কিছুটা অনিশ্চিত হলেও, বছরের বাকি সময় দিব্যি উপভোগ করা যায় এই সফর। এপ্রিল-মে মাসে ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার’ ইউমথাং উপত্যকা ভরে থাকে বিভিন্ন রঙের রডোডেনড্রনে, সঙ্গে প্রিমুলা ও অন্য নানান প্রজাতির ফুলও শোভা বাড়ায় সেই অসাধারণ সৌন্দর্যে। বছরের বাকি সময় চোখজুড়োনো সবুজ উপত্যকা, তার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নীল নদী, তুষারমুকুট মাথায় পড়া পাহাড়শ্রেণি দারুণ ভাবে আকর্ষণ করে ভ্রমণার্থীকে।

বরফের চাদরে মুখ ঢেকেছে সুন্দরী ইয়ুমথাং

গ্যাংটক থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে কাবি, ফোদং, মংগন, সিংঘিক, চুংথাং হয়ে পৌঁছে যাবেন লাচুং-চু নদীর পাশেই অবস্থিতি এই পাহাড়ি গ্রামে। গ্রামের কার্পেট বুনন কেন্দ্র ও গুম্ফাটিও দেখে নিন সময় নিয়ে। রাতটা লাচুং-এ কাটিয়ে পর দিন সকালে যাত্রা শুরু করুন ইযুমথাং-এর দিকে। লাচুং থেকে দূরত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার। ১১,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ইউমথাং উপত্যকা শীতকালে পুরোপুরি ঢেকে যায় শ্বেতশুভ্র বরফচাদরে, তখন তার এক অন্য রূপ। বাকি সময় সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া এই উপত্যকা, আর নীলরঙা নদীর বয়ে চলা মুগ্ধ করবে ভ্রমণপিপাসু মানুষজনকে। উপত্যকার শুরুতেই রয়েছে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ, সেটাও দেখে নিতে ভুলবেন না।

প্রহরী...

ইউমথাং উপত্যকা দেখে এ বার শিবমন্দির পেরিয়ে পৌঁছে যান ইয়ুমেসামডং বা জিরো পয়েন্ট। ইয়ুমথাং থেকে দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। চিন সীমান্ত কাছাকাছি বলে সাধারণ পর্যটকদের এই পর্যন্তই যাওয়ার অনুমতি মেলে। ১৫০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ইয়ুমেসামডং-এর অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নজর কাড়বেই।

লাচুং থেকে অন্য একটি রাস্তা (নদীর উপর ব্রিজ পেরিয়ে) ধরে পৌঁছনো যায় তুষারসাম্রাজ্য কাটাও (দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার)। কিন্তু চিন সীমান্তের নৈকট্য ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিধিনিষেধের দরুণ অনেক সময়েই এ পথে এগোনোটা মুশকিল হয়ে পড়ে।

যাত্রাপথ:

গ্যাংটক থেকে প্যাকেজ ট্যুরেই ঘুরে নিতে হবে এই সফর। সাধারণত ১ রাত্রি ২ দিনের এই সফরে মাথাপিছু খরচ (যাতায়াত, থাকা-খাওয়া নিয়ে, গাড়িতে ৮ জন যাবে এই ভিত্তিতে) পড়বে ২০০০-৩০০০ টাকা। হোটেল ও গাড়ির বিভিন্ন মানের ভিত্তিতে দামের তারতম্য ঘটে।

রাত্রিবাস:

লাচুং-এর হোটেলে রাত্রিবাস করেই ঘুরে নিতে হবে ইয়ুমথাং, ইয়ুমেসামডং। থাকা-খাওয়ার খরচ ধরা থাকে প্যাকেজ রেটের মধ্যে।  গ্যাংটকের বহু ট্রাভেল এজেন্ট প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা করে দেন।

 

লাচেন, গুরুদোংমার:

 

উত্তর সিকিমের এই সফরটিও যে খুবই জনপ্রিয়, তার প্রধান কারণ হল অসম্ভব সুন্দর গুরুদোংমার লেক দর্শন। ইয়ুমথাং সফর শেষ করে ফেরত আসতে হবে আবার চুংথাং-এ। দু’দিক থেকে বয়ে আসা লাচুং-চু আর লাচেন চু নদীর মিলনে, তিস্তা নদীর জন্মও হচ্ছে চুংথাং-এই।

চুংথাং থেকে লাচেন চু নদীর ধার দিয়ে পৌঁছে যাবেন লাচেন। উচ্চতা ৯৪০০ ফুট। গ্যাংটক থেকে চুংথাং-এর দূরত্ব ৯৬ কিলোমিটার, চুংথাং থেকে লাচেন-এর দূরত্ব ২৯ কিলোমিটার। দেখে নিতে পারেন লাচেন গুম্ফাটিও। লাচেন-এর হোটেলে রাত্রিবাস করে পর দিন কাকভোরেই বেরিয়ে পড়তে হবে গুরুদোংমার যাত্রীদের।

পাইনের ফাঁকে এক টুকরো সোনা

কারণ এইসব জায়গার খামখেয়ালি আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে, দুপুরের মধ্যেই লেক দর্শন সাঙ্গ করে লাচেন ফিরে আসা উচিত। লাচেন থেকে বেরিয়ে থাঙ্গু-তে (উচ্চতা ১৩৫০০ ফুট) ইচ্ছে করলে প্রাতরাশ সেরে নিতে পারেন। কিছু খাবার দোকান রয়েছে এখানে সাধারণ মানের। থাঙ্গু থেকে মূল রাস্তা ছেড়ে আলাদা হওয়া আর একটি রাস্তা ধরে ঘুরে আসতে পারেন অনতিদূরেই অবস্থিত চোপতা ভ্যালি।

থাঙ্গু থেকে আবার যাত্রা শুরু করে তিব্বতীয় রুক্ষ মালভূমির সৌন্দর্যমণ্ডিত রাস্তা ধরে এ বারে পৌঁছে যান গুরুদোংমার সরোবরে। থাঙ্গু থেকে দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। ১৭,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত নীল জলের অনিন্দ্যসুন্দর এই সরোবর প্রথম দর্শনেই অভিভূত করে দেবে। তুষারশৃঙ্গে ঘেরা প্রেক্ষাপটে (যার ছায়া পড়ে সরোবরের জলে) অপূর্ব এই সরোবরের চারপাশ দিয়ে আছে প্রদক্ষিণের রাস্তাও।

গুরুদোংমার থেকে... যেন আধখানা বরফের কেক

তবে, অতিরিক্ত উচ্চতায় ও সময়ের স্বল্পতা হেতু, বেশির ভাগ সময়েই সেই প্রদক্ষিণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাতে কী? পাড়ে দাঁড়িয়ে এই অসাধারণ সৌন্দর্য দেখাটাই হয়ে উঠবে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। গুরু পদ্মসম্ভবের স্মৃতিবিজড়িত এই সরোবরটি হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। সরোবর দর্শন শেষ হলে এ বারে ফিরে আসুন লাচেন-এ, এবং সেখান থেকে গ্যাংটক।

চির উন্নত শির...

 

যাত্রাপথ:

গ্যাংটক থেকে ২ রাত্রি ৩ দিন, কিংবা ৩ রাত্রি ৪ দিনের প্যাকেজেই মূলত গুরুদোংমার লেক ঘোরানো হয়। ২ রাত্রি ৩ দিনের প্যাকেজে (ইয়ুমথাং সমেত) মাথাপিছু খরচ পড়ে ৩৫০০-৪৫০০ টাকা (থাকাখাওয়া, যাতায়াত, সব খরচই ধরা থাকে এর মধ্যে), আর ৩ রাত্রি ৪ দিনের প্যাকেজে (ইয়ুমথাং সহ) মাথাপিছু খরচ পড়ে ৫০০০-৬০০০ টাকা (থাকাখাওয়া, যাতায়াত নিয়ে)। গাড়িতে  ৮ জন যাত্রী যাবে, এই ভিত্তিতে প্যাকেজ ট্যুরের খরচ ঠিক হয়। গ্যাংটকের বহু ট্রাভেল এজেন্ট প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা করে দেন।

রাত্রিবাস:

লাচেন-এর হোটেলে রাত্রিবাস করেই (যেখানে থাকাখাওয়ার খরচ ধরা থাকে প্যাকেজের খরচের মধ্যে) দেখে নিতে হয় গুরুদোংমার লেক।

জরুরি তথ্য:

ক) উত্তর সিকিম যাত্রীদের অনুমতিপত্র নিতে হয় গ্যাংটক থেকেই। ভোটার কার্ডের এক কপি জেরক্স ও ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে আবেদন করলে সহজেই মেলে এই অনুমতিপত্র। গ্যাংটকের হোটেল বা যে কোনও ট্রাভেল এজেন্টের অফিসে ডকুমেন্টগুলি জমা দিলে, তারাই আনিয়ে দেবে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র।

খ) গ্যাংটক থেকে (উচ্চতা ৫৫০০ ফুট) প্রথমেই গুরুদোংমার(১৭৮০০ ফুট)সফর না করাই ভালো। উচ্চতাজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। লাচুং, ইয়ুমথাং (১১৮০০ ফুট) ইত্যাদি ঘুরে উচ্চতার সঙ্গে শরীর ধাতস্থ হওয়ার পরই গুরুদোংমার যাত্রা উচিত হবে।

গ) অধিক উচ্চতার জায়গায় বেশি দৌড়ঝাঁপ না করাই ভাল, শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাওয়ার আগের দিন থেকে হোমিওপ্যাথি কোকা-৬ ওষুধটি খেয়ে দেখতে পারেন। উচ্চতাজনিত সমস্যার সমাধান হতে পারে।

(লেখক পরিচিতি: ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখালেখি বছর কুড়ি। পেশা ভিন্ন হলেও ভ্রমণের টানে গোটা ভারত ঘুরে বেড়ান বছরভর। পছন্দের দিক থেকে পাল্লা ভারী পাহাড়ের। ভ্রমণ ছাড়াও প্যাশন রয়েছে অভিনয়ে। অভিনয় করছেন বড় পর্দা, ছোট পর্দা, মঞ্চ, বেতার— সব মাধ্যমেই।)

(ছবি: লেখক)


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper