খাতায়-কলমে এখন ‘ক্রাইম সিন’। মহারাষ্ট্রের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন দুর্গ। চারদিকে সবুজ। আর এমনই এক মনোরম জায়গায় হত্যাকাণ্ড! পুণের ব্যবসায়ী-পুত্র কেতনবিশাল অগ্রবালকে প্রায় ৪০০ ফুট নীচে গভীর গিরিখাতে ধাক্কা মেরে খুনের অভিযোগ তাঁর বাগ্দত্তা সিয়া গোয়লের বিরুদ্ধে। ভ্রমণের সুখস্মৃতি এক ঝটকায় বদলে গিয়েছে মর্মান্তিক ঘটনায়।
তার পর থেকে গোটা দেশে লোহাগড় দুর্গ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ১৮ জুনের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ত্রিকোণ প্রেমের রহস্য রয়েছে বলে দাবি পুলিশের। দম্পতি ট্রেক করতে গিয়েছিলেন সেই দুর্গে। অভিযোগ, তার পরই পূর্বপরিকল্পিত ভাবে হত্যা করেন সিয়া এবং তাঁর প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধরী। তবে জানেন কি, লোণাবলার এই লোহাগড় দুর্গের সঙ্গে নানা কাহিনি জুড়ে রয়েছে, যার খানিকটা অলৌকিক, খানিকটা ঐতিহাসিক?
এখন যে গড় নিয়ে এত আলোচনা, তা কিন্তু বহু দিন ধরেই ইতিহাসপ্রেমী, ট্রেকার এবং পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। আপনিও ঘুরে আসতে পারেন মহারাষ্ট্রের এই দুর্গ থেকে। কেবল দুর্গ নয়, সমুদ্রতল থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট উচ্চতা থেকে সমতলের দৃশ্য বড়ই প্রিয় অনেকের কাছে।
পুণে থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে লোহাগড় দুর্গের টিকিট কাউন্টার। সেখান থেকে টিকিট কেটে ট্রেকিং শুরু করতে হয়। সহ্যাদ্রি পাহাড়ে অবস্থিত দুর্গটি। পাহাড়ের তিন ধারে খাদ। যাঁরা সহজ রাস্তায় ট্রেকিং করতে চান, তাঁদের জন্য লোহাগড় উপযুক্ত। তবে বর্ষার সময়ে কখনও কখনও রাস্তা দুর্গম হয়ে যায়।
বর্ষার সময়ে দুর্গের চূড়া কুয়াশা ও মেঘাচ্ছন্ন থাকে। চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি। তবে শ্যাওলার কারণে রাস্তা বেশ পিচ্ছিল হয়ে যায়। সেই সময়ে ট্রেক করতে হলে অতি সাবধানতার প্রয়োজন। এমনই সময়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন কেতন-হত্যাকাণ্ডের তিন চরিত্র।
লোহাগড় কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই ‘লোহার গড়’। নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে তার শক্তি বোঝানোর প্রয়াস। এখানে চারটি বিশালাকার দরজা রয়েছে— হনুমান দরজা, গণেশ দরজা, নারায়ণ দরজা এবং মহা দরজা। প্রত্যেকটি দরজায় মরাঠি স্থাপত্যের চিহ্ন রয়েছে। চোখ কাড়বে পাথরের সূক্ষ্ম কাজ।
বহু বহু যুদ্ধ, সংঘর্ষের সাক্ষী এই দুর্গ। দেখেছে নানা রাজা-মহারাজা, যোদ্ধাকে। যুগের পর যুগ ধরে রক্ত ঝরতে দেখেছে এই গড় আর সহ্যাদ্রি পাহাড়। ফলে একে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের লোকবিশ্বাস।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, সূর্যাস্তের পর এই দুর্গ বেশ গা-ছমছমে। সামনে দিয়ে ঝুপ করে ছায়া সরে যাওয়া থেকে শুরু করে অদ্ভুত কিছু শব্দ শোনা— এমন নানা অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয় বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দুর্গের কিছু এলাকায় লুকোনো সুড়ঙ্গও রয়েছে। অনেকে বলেন, ভিড় কমে গেলেই দুর্গটি অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, আবার নির্জন পথ দিয়ে হাঁটার সময়ে কেউ কেউ অদ্ভুত এক অনুভূতি টের পান। এই দুর্গকে ঘিরে ভূত দেখার গল্প এবং বিভিন্ন রহস্যময় কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল, দুর্গের প্রথম দরজা অর্থাৎ গণেশ দরজার গল্প।
এই দুর্গের প্রবেশদ্বারের ভিতের নীচে এক পুরুষ ও এক নারীকে জীবন্ত পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও ইতিহাস ঘাঁটলে এই ঘটনার সত্যতার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবুও স্থানীয় গাইডদের মুখে মুখে আজও এই রহস্যময় গল্পটি ঘুরে বেড়ায়।
কেউ কেউ বলেন, সেখানে এক জন পাহারাদারের অবয়ব দেখা যায়। দুর্গে কখনও একা গেলে বা নির্জন জায়গায় দাঁড়ালে তাকে দেখতে পাওয়া যায়। সমাজমাধ্যমে একাধিক পর্যটক সেই কাহিনি শুনিয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, সেই অবয়বটি কিছুটা দূরে দেখা যায়, পর্যটকদের দিকে হাত নেড়ে ইশারা করে এবং কাছে গেলেই হঠাৎ মিলিয়ে যায়।
এ ছাড়াও কিছু শব্দ শোনা যায়। আলো পড়তে শুরু করলে নির্জন এলাকায় পায়ের আওয়াজ বা শিস দেওয়ার শব্দ শোনা যায়। দুর্গের চারপাশ যখন কুয়াশায় ঢেকে যায়, মায়াবী হয়ে থাকে, তখনই নাকি এমন সমস্ত শব্দ কানে আসে! ইতিহাস চর্চাকারীরা যদিও ফুৎকারে উড়িয়ে দেবেন, কিন্তু এমন রোমাঞ্চকর, গা-ছমছমে গল্প শুনেই লোহাগড় নিয়ে উৎসাহ বাড়ে পর্যটকদের মধ্যে।
এই দুর্গের ইতিহাস খুঁজতে গেলে প্রায় দু’হাজার বছর পিছিয়ে যেতে হবে। সবচেয়ে আদি উল্লেখ পাওয়া যায় লোহতমিয়া রাজবংশের আমলে, যাঁরা এই গড়টি বানিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী কালে বিভিন্ন রাজবংশের শাসনকালে দুর্গটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে। পরে এটি মরাঠা সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
বিশেষ করে, ১৬৪৮ সালে ছত্রপতি শিবাজীর সময়ে এই দুর্গের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। এই দুর্গটি মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে মরাঠা সাম্রাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে কাজ করত। তবে মোগল শাসকেরাও এই দুর্গের মালিকানা পেয়েছিলেন ৫ বছরের জন্য।
আজও লোহাগড় দুর্গে গেলে দেখা যায় ইতিহাস, প্রকৃতি এবং স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। তাই সাম্প্রতিক ঘটনার বাইরে গিয়ে এই দুর্গকে দেখলে বোঝা যায়, কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে।
মুম্বই অথবা পুণে থেকে ট্রেনে করে লোণাবলা পৌঁছোতে হবে। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে মলবলী স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে এই দুর্গ মাত্র ৫ কিমি। অটো বা ট্যাক্সি করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। নয়তো লোণাবলা থেকে ট্যাক্সি বুক করেও যাওয়া যায় দুর্গের কাছে, অথবা বিমানে পুণে পৌঁছে সেখানে থেকে ট্যাক্সি নেওয়া যেতে পারে। লোণাবলায় বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। শৈলশহর হিসেবে লোণাবলার আকর্ষণও কম নয়।
মূলত বর্ষার সময়েই পর্যটকের ভিড় হয় দুর্গে। তার মূল কারণ, সবুজে ঘেরা পাহাড় দেখার আকর্ষণ। কুয়াশা ও মেঘের খেলা দেখতে অনেকেই এই সময়ে লোণাবলা ও লোহাগড় ঘুরে আসেন। তবে ট্রেকিংয়ের জন্য খানিক দুর্গম হয়ে যেতে পারে রাস্তার কিছু অংশ। গরমের সময়ে তাপমাত্রা ২৩-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। ফলে খুব কষ্ট হবে না রোদ না থাকলে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস এই দুর্গে যাওয়ার সেরা সময়।