ছবি: সংগৃহীত।
১০ বছর ধরে চলছে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা। স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ৮০টি মামলা করেছিলেন স্বামী। এক দশকের দীর্ঘ দাম্পত্য বিবাদকে ‘মহাভারতের মতো যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে রায় দিল দেশের শীর্ষ আদালত। বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করেছে সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে স্বামীকে পাঁচ কোটি টাকা খোরপোশ দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে দীর্ঘ মামলাটির নিষ্পত্তি করেছে।
সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, এই দম্পতি ২০১০ সালে বিয়ে করেন। তাঁদের দু’টি পুত্রসন্তান রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০১৬ সাল থেকে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন। বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন দু’জনে। স্ত্রীর অভিযোগ, স্বামী তাঁকে এবং দুই সন্তানকে ভরণপোষণ দেওয়ার সমস্ত দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছেন। মহিলা মুম্বইয়ের লোখন্ডওয়ালায় তাঁর শ্বশুরের একটি তিন কামরার ফ্ল্যাটে থাকতেন। সেই ফ্ল্যাটটির মালিকানা নিয়েও বিরোধ বাধে। স্ত্রীকে সন্তানদের নিয়ে ওই ফ্ল্যাট থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন যুবক। আদালত উল্লেখ করেছে যে, স্বামী শুধু স্ত্রী ও তাঁর আত্মীয়দের বিরুদ্ধেই নয়, তাঁর আইনজীবীদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করেছিলেন।
তরুণীর আইনজীবী আদালতকে জানান যে, তাঁর মক্কেলের স্বামী পেশাদার আইনজীবী। আইনি জ্ঞানের অপব্যবহার করে স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ৮০টিরও বেশি মামলা দায়ের করেছেন। ভরণপোষণের অর্থ প্রদান সংক্রান্ত মামলায় পারিবারিক আদালত এবং হাই কোর্টের আদেশ বার বার অমান্য করেছেন ওই তরুণ।
বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ মামলাটি পর্যবেক্ষণের পর দেখেছে যে, মামলাকারী ব্যক্তি বেশ কয়েকটি সংস্থায় পরিচালক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। আর্থিক দায়বদ্ধতা এড়ানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ভাবে সেই সমস্ত পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আদালতকে মামলাকারীর স্ত্রী জানিয়েছেন, খরচ চালাতে তিনি কলকাতায় চাকরি নিয়েছিলেন। তাঁদের বড় ছেলে শীঘ্রই দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে। বড় ছেলের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার জন্য তিনি মুম্বই চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তরুণীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জানিয়েছে, সংসারের খরচ চালাতে স্বামীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত এবং সুরক্ষিত আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন তরুণীর।
মামলার শুনানি চলাকালীন স্বামী তাঁর স্ত্রীর দায়ের করা ফৌজদারি মামলাগুলোর কথা উল্লেখ করেন। গার্হস্থ্য হিংসা থেকে নারীদের সুরক্ষা আইন, ২০০৫ এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারায় মামলা করেছিলেন স্ত্রী। সে কারণে তাঁকে কয়েক দিন হাজতবাস করতে হয়েছিল। স্বামীর দাবি, এর ফলে তিনি প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন। তাঁর পেশাগত সুনামেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
স্ত্রী পরিকল্পিত ভাবে সন্তানদের তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন বলে আদালতে পাল্টা অভিযোগ তোলেন স্বামী। স্বামীর বক্তব্য, তাঁর স্ত্রী একজন উচ্চশিক্ষিত, যথেষ্ট আয় রয়েছে তাঁর। তবুও তিনি ভরণপোষণের অন্যায় দাবিকে শক্তিশালী করার জন্য নিজেকে নিঃস্ব হিসাবে আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছেন। স্বামীর কঠোর সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ আদেশে বলেছে, মামলাকারী অসংখ্য আবেদন ও অভিযোগ দাখিল করে মামলাটিকে বহু গুণে জটিল করে তোলার চেষ্টা করেছেন। সে সব মামলার বেশির ভাগই প্রতিহিংসামূলক ও হয়রানি বলে মনে করেছে আদালত। আদালত রায় দিয়েছে, উভয় পুত্রের হেফাজত স্ত্রীর কাছে থাকবে, কিন্তু স্বামীর দেখা করার অধিকার থাকবে। স্বামীকে এক বছরের মধ্যে স্ত্রীকে এককালীন পাঁচ কোটি টাকা খোরপোশ দিতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্ত্রীকে এই মর্মে একটি অঙ্গীকারনামা দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছে যে, পাঁচ কোটি টাকা পাওয়ার পর তিনি দু’সপ্তাহের মধ্যে স্বামীর বাবার মালিকানাধীন ফ্ল্যাটটি খালি করে সেটি হস্তান্তর করবেন। স্বামীকে আদালত স্পষ্ট ভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে, তিনি স্ত্রী বা তাঁর আত্মীয়স্বজন, আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কোনও আদালতে আর কোনও দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করবেন না।