অটোতে গ্যাস ভরার ‘দোকানে’ গার্হস্থ্য সিলিন্ডার। জয়নগরে। নিজস্ব চিত্র
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে। এক দিকে গৃহস্থালির গ্যাসের দাম বেড়েছে, অন্য দিকে গ্যাস সিলিন্ডারের জোগান নিয়েও অভিযোগ উঠছে বিস্তর। হেঁশেলের পাশাপাশি গ্যাস-সঙ্কটে সমস্যা তৈরি হয়েছে অটো চলাচলে। বর্তমানে ডিজ়েলের বদলে প্রায় সর্বত্রই এলপিজি (লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) চালিত অটোই চলাচল করে। এই পরিস্থিতিতে বহু রুটে ভাড়া বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ। তারপরেও গ্যাস না মেলায় অনেক জায়গায় অটো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন চালকেরা।
রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি দাম বেড়েছে এলপিজির। স্থানীয় সূত্রের খবর, নামে এলপিজি হলেও দুই জেলার অধিকাংশ অটোই চলে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসে। বেআইনি ভাবেই রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে অটোয় জ্বালানি ভরে চালানো হয়। অনেক জায়গাতেই এই ‘কাটা গ্যাস’-এর আলাদা কাউন্টারও তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতে সেই গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রেও কালোবাজারি শুরু হয়েছে।
চালকেরা জানাচ্ছেন, এলপিজি অটো চালু হলেও, সর্বত্র এলপিজি পাম্প এখনও চালু হয়নি। ফলে রান্নার গ্যাস দিয়ে চালানো ছাড়া উপায় থাকে না। স্থানীয় সূত্রের খবর, এক লিটার এলপিজির দাম ৫০ টাকার আশেপাশে। যেটা বর্তমানে বেড়ে ৭০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। অন্য দিকে, ‘কালো বাজারে’ রান্নার গ্যাস মেলে কেজি প্রতি ৬০-৬৫ টাকায়। বর্তমানে সেটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০-১৫০ টাকা। চালকদের দাবি, এলপিজির থেকে রান্নার গ্যাসে মাইলেজ মেলে বেশি। তাই দাম কিছুটা বেশি হওয়া সত্ত্বেও এলপিজির বদলে রান্নার গ্যাসে অটো চালান বহু চালক।
জয়নগরের ঢোসা থেকে চরণ রুটে কয়েকশো অটো চলাচল করে। এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, রাস্তার ধারে একাধিক ‘গ্যাস ভরার দোকান’ রয়েছে। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকেই অটোয় গ্যাস ভরা হচ্ছে। দোকানের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি জানালেন, আগে ৬০ টাকা প্রতি কেজি গ্যাস বিক্রি করতেন। এখন ১২০ টাকায় বিক্রি করছেন। বর্তমানে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। তা-ও সব সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকছে না। অটো পিছু দু’কেজির বেশি গ্যাস দিচ্ছেন না বলেও জানালেন তিনি। রুটের এক চালকের কথায়, “এলপিজি পাম্প অনেক দূরে। এ ভাবে গ্যাস নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
ভাঙড়ের গার্লস স্কুল পাড়া থেকে মিলন বাজার পর্যন্ত রুটে প্রায় ১৪০টি অটো চলাচল করে। বর্তমানে ৩০টি অটো চলছে। রুটের অটো ইউনিয়নের সভাপতি মোবারক মোল্লা বলেন, “চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক বেশি টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে অটো তুলে নিচ্ছেন।” ক্যানিং-হেড়োভাঙা রুটের অটো চালক নিতাই সরকার বলেন, “পর্যাপ্ত এলপিজি পাম্প নেই। কাটা গ্যাসের উপরেই নির্ভর করতে হয়। তার দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অনেকে রাস্তায় গাড়ি নামাচ্ছেন না। যাঁরা নামাচ্ছেন, তাঁরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন।”
বারাসত দত্তপুকুর রুটের এক অটো চালকের কথায়, “এই এলাকায় প্রায় সব রুটেই কাটা গ্যাসে অটো চলে। কিন্তু তারও যা দাম বেড়েছে, অটো চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।” হিঙ্গলগঞ্জের লেবুখালির অটোচালক সুখেন দাস বলেন, “বাড়িতে রান্নার গ্যাসের জোগান নেই, আবার অটো চালানোর গ্যাসেও কালোবাজারি হচ্ছে।”
আইএনটিটিইউসি-র বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি নারায়ণ ঘোষ জানান, গোটা সাংগঠনিক জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার অটো চলাচল করে। গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ইতিমধ্যেই প্রায় সাড়ে তিনশো অটো রাস্তায় নামা বন্ধ করে দিয়েছে।
গ্যাস-সঙ্কটের মধ্যেও রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে অটোয় গ্যাস ভরা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। পদক্ষেপ শুরু করেছে প্রশাসন। দিন দু’য়েক আগে উত্তরে রান্নার গ্যাস থেকে অটোয় গ্যাস ভরার অভিযোগে এক জনকে গ্রেফতার করেছিল গোপালনগর থানার পুলিশ। শুক্রবার রাতে দক্ষিণে জয়নগরের ঢোসায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভাবে রান্নার গ্যাস বিক্রির অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের নাম মানস মণ্ডল, সুব্রত মণ্ডল ও ইসরাফিল লস্কর। একাধিক সিলিন্ডারও উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, গ্যাসের কালোবাজারির বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে