চাষের-কাজে: বনগাঁয়। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক
বনগাঁ–বাগদা সড়কের পাশের পাটখেতে দুপুর ১২টা নাগাদ কাজ করেছিলেন নানা বয়সের জনাছয়েক খেতমজুর। প্রত্যেকের মাথায় টোকা, রোদে পুড়ছে শরীর। এ ভাবেই সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাঁদের।
মাথাপিছু কত রোজগার হয় জানতে চাইলে ওঁরা বললেন, ‘‘১৮০–২০০ টাকা। কিন্তু বছরের বেশির ভাগ দিনই কাজ থাকে না।’’
একশো দিনের কাজ করেন না? ওঁরা জানালেন, ‘‘এ নিয়ে কিছু বললে গ্রামে থাকতে পারব না।’’ পরিচয় গোপন রাখা হবে আশ্বাস দিলে একজন বললেন, ‘‘গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই একশো দিনের প্রকল্পে কাজ পান না।’’ অন্য জন জানালেন, ‘‘সাতমাস আগে একশো দিনের কাজ করেছি। ২ হাজার টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা আজও পাইনি।’’ ওই খেতমজুরদের মধ্যে একজনের ছেলে কেরলে গিয়েছিলেন রুজির টানে। ছেলেটি সম্প্রতি বাড়ি ফিরেছেন। যাঁর ছেলে তিনি বললেন, ‘‘এখানে কাজ থাকলে ছেলেরা বাড়িতেই থাকে। কাজ না থাকলে অন্য রাজ্যে যেতেই হয়।’’
গ্রামে সারা বছর কাজ না থাকাটা অবশ্য এই অঞ্চলে ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। বনগাঁ মহকুমার বাগদা-গাইঘাটা, গোপালনগর-গাইঘাটা থানা এলাকার বহু যুবক কাজের জন্য বরাবরই ভিন রাজ্যে পাড়ি দেন। এলাকায় কাজ থাকলে ফিরে আসেন। বনগাঁর মণিগ্রাম এলাকা থেকে যুবকেরা দল বেঁধে কেউ অন্ধ্রপ্রদেশ, কেউ তামিলনাড়ু যান ধান কাটতে। এককালীন মোটা টাকা নিয়ে তাঁরা ফেরেন। কেউ আবার ছুতোর মিস্ত্রির কাজ করেন, কেউ রাজমিস্ত্রির। কথা হচ্ছিল বাগদার রামনগর এলাকার যুবক দীপঙ্কর মণ্ডলের সঙ্গে। কিছুদিন আগে তিনি সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। সেখানে ছুতোরের কাজ করেন। ভোট মিটে গেলে ফের বাইরে যাবেন। এ বার গন্তব্য মরিশাস। এখানে থাকলে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তাতে প্রতিদিন রোজগার আড়াই শো টাকা। বলছিলেন, ‘‘এখানে যা আয় করি তাতে ভাল ভাবে সংসার চালানো সম্ভব হয় না। বিদেশে রোজগার মন্দ হয় না। তবে এখানে কাজের সুযোগ থাকলে কারই-বা আর ঘরসংসার, আত্মী-পরিজন ছেড়ে ভিন দেশে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে?’’ তরুণ শ্যামল তরফদার ও স্বপন জোয়ারদারেরাও কাজের জন্য অন্য রাজ্যে গিয়েছিলেন। বললেন, ‘‘অন্য রাজ্যে কাজ করলে দিনে ৩০০ টাকা পাওয়া যায়। এখানে দেড়শো টাকা। তার ওপর আবার মাসে দিন-পনেরো কাজ থাকে না।’’ পঞ্চায়েত ভোটের পর ফের তাঁরা ভিন রাজ্যে যাবেন।
ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এ রাজ্যের কয়েকজন শ্রমিক মারা গিয়েছেন। অশোকনগরের এক যুবকেরও মৃত্যু হয়েছে। বাগদার এক ব্যক্তির দুই ছেলে ভিন রাজ্যে। কিছুদিন আগে সেখানে তাঁদের মারধরও করা হয়েছে বলে জানালেন ওই ব্যক্তি।
এত কিছুর পরও তাঁরা কেন বাইরে যান কাজে?
ভোটের জন্য বাড়ি ফেরা কয়েকজন যুবক জানালেন, ‘‘ওই ভয় করলে তো আর আমাদের পেট চলবে না।’’ এঁদের সকলেরই অবশ্য আশা, সুদিন ফিরবে। এ রাজ্যেও যথেষ্ট কাজ পাবেন তাঁরা। তখন আর রুজির টানে অন্য রাজ্যে যেতে হবে না। সেই আশাতেই এ বারেও ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন তাঁরা। ভোট দেবেন।