মায়ের খোঁজে বাড়িতে কিছুতেই মন টেঁকে না ভোলার

ভোলার দিদা জানান, ছোটবেলায় দিদি রেবেকার হাত ধরে ভোলা দৌড় দিত কাছেই মাটনিয়া-অনন্তপুর স্টেশনে। ট্রেনে চেপে একদিন ফিরে আসবে মা, বিশ্বাস করত ভাই-বোনে। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামত। মায়ের জন্য অপেক্ষা শেষ হতো না ঘোনা গোঠরার ‘অপু-দুর্গার’।

Advertisement

নির্মল বসু

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০১৭ ০৩:৫৬
Share:

নানির সঙ্গে ভোলা। নিজস্ব চিত্র।

ট্রেনের কামরায় মাকে খুঁজে ফেরে ভোলা।

Advertisement

খুঁজতে খুঁজতে ট্রেনেই ঘুমিয়ে পড়ে। বাড়ি ছেড়ে চলে যায় নাম না জানা কোন সব স্টেশনে। নেমে পড়ে। এ দিক ও দিক ঘোরে। আর তারপর ফেরার পথ আর মনে থাকে না তার। কখনও সখনও নিজেও ফিরে আসে। না এলে বৃদ্ধা নানি নাতির খোঁজে থানা-পুলিশের কাছে দরবার করেন।

বার বারই ঘটে এই ঘটনা। বুধবার পুলিশ আনারুল গাজি ওরফে বছর বারোর ভোলাকে বসিরহাট স্টেশন থেকে উদ্ধার করেছে। পুলিশ কাকুকে সে কথা দিয়েছে, আর পালাবে না বাড়ি ছে়ড়ে। নানির কথা শুনে চলবে।

Advertisement

ভোলার বাড়ি ঘোনা গোঠরা গ্রামে। পলিথিন দেওয়া দু’চালার ঘরে বাস করেন বৃদ্ধা সামসুন নাহার। ভোলা জন্মানোর কয়েক দিন পর মারা যায় তার বাবা রশিদ গাজি। ভোলা যখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, একদিন তার মা নুননেহার বিবি চলে যান। ভোলা জানে, তার মা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে ট্রেনে চেপেছিল। ওইটুকু তথ্যই ভরসা করে ট্রেনের কামরায় মাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে ছেলেটা।

ভোলার দিদা জানান, ছোটবেলায় দিদি রেবেকার হাত ধরে ভোলা দৌড় দিত কাছেই মাটনিয়া-অনন্তপুর স্টেশনে। ট্রেনে চেপে একদিন ফিরে আসবে মা, বিশ্বাস করত ভাই-বোনে। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামত। মায়ের জন্য অপেক্ষা শেষ হতো না ঘোনা গোঠরার ‘অপু-দুর্গার’।

এরই মধ্যে ভিক্ষা করে ভাইবোনকে বড় করে তোলার লড়াই চলে বিধবা সামসুন নাহারের। বিয়ে দেন রেবেকার। চতুর্থ শ্রেণির গণ্ডী টপকায় ভোলা। কিন্তু ট্রেনে চেপে দিদি শ্বশুরবাড়ির দিকে রওনা দেওয়ার পর থেকে একলা হয়ে যায় ছেলেটা। দিদি সংসার পেতে ব্যস্ত হয়। মায়ের জন্য খোঁজ শেষ হয় না ভোলার। কখনও পনেরো দিন, কখনও একমাস বাড়ি থেকে বেপাত্তা। মাঝে মধ্যে দু’এক দিনের জন্য বাড়ি আসে। দু’দিন কাটিয়ে আবার মাকে খুঁজবে বলে বেরিয়ে পড়ে। আর ভোলাকে খুঁজতে ভিক্ষার ঝুলি হাতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান তার নানি। থানায় গিয়ে নাতিকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানান। বুধবার বসিরহাট স্টেশন চত্বর থেকে পুলিশ ভোলাকে উদ্ধার করে খবর দেয় বৃদ্ধাকে।

নাতিকে পেয়ে খুশি সামসুন। কিন্তু উদ্বেগ কমে কই! বলেন, ‘‘শুনেছি পাচারকারীরা ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে গিয়েছে আমার মেয়েটাকে। নাতিটা এখনও খুঁজে ফেরে মাকে। আবার কখন বেরিয়ে পড়বে বাড়ি ছেড়ে, কে জানে।’’

কী বলে ভোলা?

তার কথায়, ‘‘বাবার তো মুখটাই মনে পড়ে না। কিন্তু মায়ের জন্য মন কেমন করে। স্বপ্নে মায়ের সঙ্গে কথা হয়। পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু টাকা কোথায়?’’

ভোলা জানায়, জামাইবাবুর দেওয়া ইটভাটায় ভ্যান ঠেলার কাজে মন বসে না তার। কথা বলতে বলতে ভোলা অন্যমনস্ক। বলে, ‘‘আর পালাব না। নানিকে কষ্ট দেবো না। কিন্তু মাকে এক দিন ঠিক খুঁজে বের করবই।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement