গাছের ডালে চড়ে ‘দূরের জিনিস’ দেখছেন যুবক

দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁরা চলে গেলে বন্ধুরাই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যুবককে নামিয়ে আনতে পারবেন বলে বাবা-মা দাবি করেছেন।

Advertisement

নির্মাল্য প্রামাণিক

শেষ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০২১ ০৫:০৬
Share:

গাছের ডালে যুবক। নিজস্ব চিত্র।

বন্ধুরা উপরে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, কী করছিস ওখানে?উত্তর মিলছে, ‘‘উঁচু থেকে অনেক দূরের জিনিস ভাল দেখা যাচ্ছে।’’

Advertisement

কত উঁচু? তা প্রায় ৭০ ফুট হবে। সেখানেই চড়ে বসেছেন বাগদার গ্রামের যুবক। কেউ বলছেন, মানসিক সমস্যার জন্যই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন। কেউ বলছেন, প্রেমে দাগা পেয়ে মাথা বিগড়েছে।কারণ যা-ই হোক, শিরীষ গাছ থেকে নামার লক্ষণ নেই বছর ছাব্বিশের যুবকের।

সোমবার ভোর থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত চলছে এই কাণ্ড। নিজেকে গাছের ডালের সঙ্গে গামছা দিয়ে বেঁধে রেখেছেন যুবক। ফলে আছেন আরামেই। আর নীচে আত্মীয়-পরিজন গ্রামবাসীদের হৃদকম্প বাড়ছে। পুলিশ এসেও সুবিধা হয়নি। দমকলকে খবর দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ওই যুবক। বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাবা ছোটখাট কাজ করেন। কলেজে প্রথমবর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিন যুবক। ভাল ফুটবল খেলতেন। কয়েক বছর আগে ভিন্‌ দেশে কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন। বছরখানেক পরে অবশ্য ফিরে আসেন। নানা ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়েন। মাথার কিছুটা গোলমাল দেখা দেয়।

বাবা বলেন, ‘‘চিকিৎসার জন্য রানাঘাটের একটা হোমে পাঠানো হয়েছিল ওকে। মাস তিনেক হল ফিরেছে। শরীরটা আবার খারাপ হওয়ায় রবিবার হোমের লোকজনকে ডাকা হয়েছিল। তাদের দেখেই ও পালায়।’’

পাড়াপড়শিরা জানাচ্ছেন, রবিবার হোমের লোকজনকে দেখে বাড়ির ছাদে উঠে গিয়েছিলেন যুবক। সিঁড়ি না থাকায় হোমের লোকেরা যুবকের নাগাল না পেয়ে ফিরে যান। সোমবার ভোরে একটা ব্যাগে মুড়ি, জলের বোতল, দড়ি আর একটা ছুরি নিয়ে বাড়ির উঠোনের শিরীষ গাছে উঠে পড়েন যুবক। বাবা বাধা দিতে গেলে ছুরিতে তাঁর আঙুল কেটে গিয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, গাছের মগডালে হনুমান টুপি পরে, কম্বল জড়িয়ে বসে যুবক। মাস্কও পরেছেন। গাছের নীচে গ্রামবাসীদের ভিড়। হাজির বাগদা থানার পুলিশও। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, কেন উঠেছো গাছে? বেশিরভাগ সময়েই চুপ করে থাকছেন। কখনও উত্তর দিচ্ছেন, উপর থেকে চারদিকটা ভাল দেখা যায়। কখনও আবার বলছেন, ‘‘বাবা আমার জন্য আঘাত পেয়েছেন। আমার সাজা হওয়া উচিত। আমার নামে কেস ফাইল করা হোক।’’এ কথা শুনে নীচ থেকে পুলিশকর্মীরা চেঁচিয়ে বললেন, ‘‘কেস করা হয়েছে। তোমার বাবার কাছে কাগজটা আছে। নীচে নেমে এসে সই করে দিয়ে যাও।’’

যুবকের উত্তর, ‘‘দড়ি দিয়ে বেঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দিচ্ছি। তার মধ্যে মামলার কাগজ আর একটা কলম দিয়ে দিন। সই করে পাঠিয়ে দেব।’’

পুলিশ জানিয়েছে, ছেলেটির কাছে ছুরি থাকায় কাছে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাচ্ছে না। নিজেকে বা অন্যদের জখম করতে পারে।

দমকলকে খবর দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ বনগাঁ থেকে দমকলের একটি ইঞ্জিন গ্রামে পৌঁছয়। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের চেষ্টাতেও দমকলকর্মীরা যুবককে গাছ থেকে নামাতে পারেননি। বরং দমকল কর্মীদের দেখে তিনি আরও উপরের ডালে উঠে বসেন।

দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁরা চলে গেলে বন্ধুরাই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যুবককে নামিয়ে আনতে পারবেন বলে বাবা-মা দাবি করেছেন। তাঁরা দায়িত্ব নেওয়ায়, তাঁদের ‘অনুরোধে’ ফিরে আসে দমকল। কিন্তু বিপদ-আপদ কিছু একটা ঘটে না যায়, চিন্তায় আছেন গ্রামের অনেকেই।

পাড়ার লোকজন জানাচ্ছেন, এক যুবতীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল যুবকের। তাঁর বিয়ে হয়েছে অন্যত্র। তারপর থেকেই অসংলগ্ন আচরণ করেন তিনি। তবে হোমে থেকে অনেকটা সুস্থ হয়ে ফিরেছিলেন। একটা দোকানে কাজও করছিলেন। দিন কয়েক আগে ওই যুবতী গ্রামে আসেন। স্থানীয় কারও কারও দাবি, তারপর থেকে যুবকের আচরণে অসংলগ্নতা বাড়ে।

‘শোলে’ ছবিতে ‘বিরু’ জলের ট্যাঙ্কে উঠে ‘স্যুসাইড’ করবে বলে শাসানি দিয়েছিল। বাগদার গ্রামের যুবক সে রকম হুমকি অবশ্য দিচ্ছেন না। তবে ‘বাসন্তী’ না ‘মৌসিজি’— কে যে তাঁর অভিমান ভাঙাবে, তা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না গাঁয়ের লোকজন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement