জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার ওরা, বিশ্বাস হচ্ছে না পড়শিদের

বসিরহাটের আঁকিপুর গ্রাম থেকে বন্দরের মেটিয়াবুরুজ ঘেঁষা রবীন্দ্রনগর এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছেন না। শুধু তা-ই নয়, আঁকিপুর গ্রামের মানুষ বরং হবিবুল হককে এক কথায় ‘ভাল ছেলে’ বলে অভিহিত করছেন।

Advertisement

নির্মল বসু ও শুভাশিস ঘটক

শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৬ ০১:৩৫
Share:

হবিবুলের বাড়ি। — নিজস্ব চিত্র

বসিরহাটের আঁকিপুর গ্রাম থেকে বন্দরের মেটিয়াবুরুজ ঘেঁষা রবীন্দ্রনগর এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছেন না। শুধু তা-ই নয়, আঁকিপুর গ্রামের মানুষ বরং হবিবুল হককে এক কথায় ‘ভাল ছেলে’ বলে অভিহিত করছেন। আর রবীন্দ্রনগরে মহেশতলা পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাসিনা বানু এনামুল মোল্লা সম্পর্কে বলছেন, ‘‘এনামুলকে ফাঁসানো হয়েছে। ও খুব ছোটবেলা থেকে ব্যবসা করছে। এখন তো এ সবই শুরু হয়েছে।’’

Advertisement

মঙ্গলবার বিকেলে এনামুল ও হবিবুলকে জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর চাঁই সন্দেহে গ্রেফতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। এমনকী, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্য, এনামুল দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জেএমবি-র প্রধান বা আমির এবং হবিবুল উত্তর ২৪ পরগনায় ওই জঙ্গি সংগঠনের আমির ছিল। তারা দু’জনেই খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’দের আশ্রয় দিয়েছিল বলে দাবি গোয়েন্দাদের।

কিন্তু দু’জনেরই প্রতিবেশীদের এখনও মানতে চাইছেন না সে কথা।

Advertisement

বুধবার আঁকিপুর গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় গিয়ে হবিবুরের নাম বলতেই সকলে দেখিয়ে দিলেন বাড়িটা। বড় রাস্তার পাশ দিয়ে কংক্রিটের রাস্তার শেষে ইটের রাস্তা ধরে একটু এগোলেই বাঁ দিকে পাকা বাড়িটা হবিবুলদের। তার মা রাইলা বিবি বললেন, ‘‘তিন ছেলের মধ্যে ছোট, হবিবুল চার বছর বাদুড়িয়ার নয়াবস্তিয়া গ্রামের এক মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছে। আর্থিক কারণে বনিবনা না হওয়ায় এক বছর আগে বাড়ি ফিরে আসে।’’ বৃদ্ধার কথায়, ‘‘কেন যে পুলিশ হবিবুলকে ধরল তা বুঝতে পারছি না।’’ পড়শি নাসিরউদ্দিন মণ্ডল, গিয়াসউদ্দিন নুর বলেন, ‘‘মনে হচ্ছে, কোথাও ভুল হচ্ছে।’’ বাদুড়িয়ার নয়াবস্তিয়ার ওই মসজিদ কমিটি সূত্রে অবশ্য জানা গিয়েছে, হবিবুলকে
ছাড়ানো হয়নি। সে-ই কাউকে কিছু না বলে চলে যায়।

এনআইএ-র দাবি, হবিবুলের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে জেএমবি বসিরহাটে দু’টি জেহাদি শিবির সংগঠিত করেছিল। মা রাইলা বিবি জানান, বছরখানেক ধরে হবিবুল কোনও জায়গায় পোশাক সেলাইয়ের কাজ নেয়। তবে কেন জায়গায়, বৃদ্ধা তা জানেন না বলে দাবি করেছেন। আর এনআইএ-র বক্তব্য, কলকাতার মেটিয়াবুরুজের কাছে রবীন্দ্রনগরে সেলাইয়ের ব্যবসার আড়ালেই জেএমবি জঙ্গি কার্যকলাপ ও জেহাদি প্রচারের কাজ চালাচ্ছিল। এবং সেখানে হবিবুলের নিয়মিত আনাগোনা ছিল বলেও গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন।

Advertisement

যে বাড়িতে হানা দিয়ে এনামুলকে গোয়েন্দারা ধরেন, সেটি একটি নতুন দোতলা বাড়ি। যার আয়তন দু’হাজার স্কোয়ার ফুট। এ দিন দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়ির একতলায় টিউব লাইট জ্বলছে। ঘরের মধ্যে সারি দিয়ে পরপর সেলাই মেশিন। মাথা নিচু করে সেলাই করে চলেছেন নানা বয়সের দর্জি। যাঁরা কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন এনামুল গ্রেফতার হওয়ার পরে। পরনে সবুজ চেক লুঙ্গি ও সাদা গেঞ্জির এক ব্যক্তি সেলাই মেশিন ছেড়ে উঠে এসে সোজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘এনামুলকে ছাড়ানোর কোনও ব্যবস্থা করতে পারবেন? তা হলে আপনার সঙ্গে কথা বলব। না হলে এখানে থেকে আর আমাদের সময় নষ্ট করবেন না। আমরা কাজ করছি।’’ হবিবুলের এলাকা বসিরহাটের হিঙ্গলগঞ্জ থেকেও বেশ কয়েক জন দর্জি ওখানে কাজ করছেন। কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্নে সবাই নিরুত্তর।

কলকাতায় এ দিন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শুভ্রা ঘোষের আদালতে হাজির করানো হয় এনামুল ও হবিবুলকে। কড়া নিরাপত্তায় তাদের কোর্টে তোলা হয়। তাদের পক্ষে কোনও আইনজীবী এ দিন দাঁড়াননি। কোর্ট লকআপে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিল হাবিবুল। পাশেই দাঁড়িয়ে এনামুল। প্রথমে বাংলা ও পরে হিন্দিতে বিচারক জিজ্ঞেস করেন, ‘‘তোমাদের কোনও আইনজীবী আছে?’’ উত্তর পাওয়া যায়নি। কয়েক জন আইনজীবীর প্রশ্নের উত্তরেও না। এনআইএ-র আইনজীবী শ্যামল ঘোষ বলেন, ‘‘বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে ফেরার তিন আসামী মওলানা ইউসুফ, কাদের কাজী ও জাহিরুল হককে আশ্রয় দিয়েছিল ধৃত হবিবুল হক ও এনামুল মোল্লা।’’ শ্যামলবাবুর সওয়ালের পরে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শুনানি শেষ হয়ে যায়।

বিচারক শুভ্রা ঘোষ ধৃতদের ২২ মার্চ পর্যন্ত এনআইএ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

(সহ প্রতিবেদন: মেহবুব কাদের চৌধুরী)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement