টলমল পায়ে নদী পেরিয়ে পড়তে যায় ছেলেমেয়ের দল

ভোটের সময়ে অতি অবশ্য মেলে রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভোট মিটলে পরিস্থিতি যে কে সেই। বছরের পর বছর এমনটাই দেখতে অভ্যস্ত মানুষ। খোঁজ নিল আনন্দবাজার। এক হাঁটু জল পেরিয়ে যখন ডাঙায় উঠল ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, ততক্ষণে তাদের স্কার্ট, হাফ প্যান্টও ভিজে গিয়েছে। কারও কারও ব্যাগ থেকে গামছা বেরোতে দেখা গেল।

Advertisement

নির্মল বসু

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০১৬ ০১:৪৯
Share:

সাবধানে জলভেঙে...। নিজস্ব চিত্র।

দৃশ্য ১: এক হাঁটু জল পেরিয়ে যখন ডাঙায় উঠল ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, ততক্ষণে তাদের স্কার্ট, হাফ প্যান্টও ভিজে গিয়েছে। কারও কারও ব্যাগ থেকে গামছা বেরোতে দেখা গেল।

Advertisement

দৃশ্য ২: মহিলা প্রসূতি। দু’দিক থেকে তাঁকে হাত ধরে নদী পার করছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা। একবার পিছলে পড়তে পড়তেও টাল সামলে নিলেন তরুণী বধূ। পাড়ে উঠে ভিজে ধুতি, শাড়ি নিঙড়ে নিতে নিতে বধূর বাবা বললেন, ‘‘এ কী দুর্ভোগ রে বাবা!’’

দৃশ্য ৩: ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধাকে কোনও রকমে কোলে নিয়ে শীর্ণকায় ছেলেটি জল পেরিয়ে যাচ্ছিলেন এ পাড়ের হাসপাতালে। পা পিছলালে মা-ছেলে কেউ রেহাই পাবেন না।

Advertisement

এ ভাবেই দিনের পর দিন এক হাঁটু জলে নেমে হাসনাবাদের মানুষকে নদী পারাপার করতে হয়। এই এলাকার শুলকুনি, কাছারিঘাট, কুলিয়াডাঙা, চিমটাভবানীপুর ও পারভবানীপুর পঞ্চায়েত এলাকায় এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। সেতুর দাবিতে নদীতে নেমে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেতু হয়নি।

ভোটের সময়ে নেতা-নেত্রীরা এসে সেতু তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন প্রতিবারই। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ভোট শেষে সকলেই সব ভুলে যান— এমনই অভিজ্ঞতা স্থানীয় মানুষজনের।

হাসনাবাদের ভবানীপুর এলাকার দ্বীপভূমিতে ওই পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে লক্ষাধিক মানুষের বাস। শোনা যায়, ব্রিটিশ আমলে হাসনাবাদ থেকে ভবানীপুর যাওয়ার জন্য ইছামতী এবং ডাঁসা নদীর মাঝখানে খাল কাটা হয়েছিল। এখন সেই খালই এখন কাটাখালি নদী। বিদ্যাধরী, ডাঁসা, বেতনি এবং কাঠাখালি— এই চার নদী দিয়ে ঘেরা ভবানীপুর দ্বীপ। ওই দ্বীপের এক প্রান্তে শুলকুনি ফেরিঘাট। সেখান থেকে বেদেমারি, ভোলাখালি এবং পারভবানীপুর ফেরিঘাট থেকে মডেলবাজার, সন্দেশখালির কালীনগরে যাওয়া যায়। প্রায় ১৩ কিলোমিটার রাস্তা। ওই দ্বীপের মধ্যেই রয়েছে কয়েকটি স্কুল, কলেজ। দ্বীপে যেতে গেলে নদী পেরিয়েই যেতে হয়।

আবার হাসনাবাদ, সন্দেশখালি, বসিরহাটে আসতে হলে ভবানীপুরের মানুষকে বিদ্যাধরী, ডাঁসা, বেতনি বা কাঠাখালি নদী পার হতে হয়। কিন্তু দীর্ঘ সংস্কারের অভাবে কাঠাখালি নদীর নাব্যতা কমে গিয়েছে। ফলে ভাটার সময়ে কখনও হাঁটু সমান আবার কখনও কোমর সমান জলে নেমে যাত্রীদের নৌকোয় উঠতে হয়। নদীর এই অবস্থার জন্য ছাত্রছাত্রীরা প্রায়শই গামছা বা বাড়তি পোশাক সঙ্গে রাখে। স্থানীয় শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ মান্না, কমল ভৌমিকরা জানান, ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত নিয়ে তাঁরাও চিন্তিত। মহিলারা হাঁটুর উপরে কাপড় তুলে নৌকোয় উঠতে হয় বলে লজ্জা পান। অসুস্থদের দোলনা করে, আবার কখনও কোলে নিয়ে নৌকোয় তুলতে গিয়ে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে।

হাসনাবাদের ভবানীপুর, হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভার অর্ন্তগত। নির্বাচনের সময়ে বিভিন্ন দলের নেতা-মন্ত্রীরা নদী পার হয়ে ভবানীপুর যেতে গেলেই এই সমস্ত দৃশ্যের মুখোমুখি হন। তাঁদের প্রার্থীকে জেতালে তবেই মিলবে সেতু— এমন প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচন শেষ হলে সব শেষ, অভিযোগ এখানকার বাসিন্দাদের।

ক্ষিপ্ত বাসিন্দারা জানালেন, জল নেমে গেলে জোয়ারের অপেক্ষায় ফেরিঘাটে বসে থাকতে হয়। কখনও দিনে ৪-৫ ঘণ্টা নৌকো চলাচল বন্ধ থাকে। ওই সময়ে নদীর মধ্যে নেমে হেঁটে যেতে হয়। চোরাবালির ভয় তো থাকেই। তারমধ্যে যদি হঠাৎ জোয়ার আসে, তা হলে বড় বিপদও ঘটতে পারে। কায়ুম মণ্ডল, জুলফিকার গাজি, কমলিকা মাইতি, কাকলি পাত্ররা জানালে, সেতুর দাবিতে ইতিমধ্যেই এলাকার মানুষ মহকুমাশাসক থেকে শুরু করে সুন্দরবন উন্নয়ন দফতর-সহ বিভিন্ন মন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন। রাজ্যের প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী শ্যামল মণ্ডল আরআইডিএফ-র কাছে অর্থ মঞ্জুরের জন্য বলেছিলেন। এরপরে জমি জরিপ হয়েছিল মাত্র। তারপর সব চুপচাপ।

কয়েক মাস আগে হাসনাবাদে এসে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেছিলেন, ‘‘আমাদের একটু সময় দিন। কাঠাখালি নদীর উপরে সেতু হবেই।’’ কিন্তু কোথায় কী!

শুলকুনি গ্রামের রঞ্জিত হরি, গোবিন্দ মাইতি, বিশ্বনাথ বিশ্বাসরা জানালেন, সব পক্ষই সুন্দরবনের উন্নয়নের কথা বলে ভোট চায়। অথচ এই দ্বীপের মানুষের সমস্যার কথা কেউ ভাবে না। ফেরিঘাটে বসে থেকে থেকে এর আগে অসুস্থ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলারা হাসপাতালে পৌঁছনোর আগে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু নদী পেরোনোর সহজ রাস্তা অধরাই।

ভোট বয়কটের কথাও ভাবেন মানুষ। তাতেও বিপত্তি। ভোটের আগের কয়েক রাত নাকি রাজনৈতিক দলের ধমকধামক চলে। ভোট দিতে যাওয়ার জন্য প্রলোভন দেওয়া হয়।

এ ভাবেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement