—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগেই, বাম আমলের শেষভাগে পাথরপ্রতিমায় তৃণমূলের উত্থান শুরু হয়েছিল। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে পঞ্চায়েত সমিতি দখল করে তৃণমূল। সে বছর ১৫টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ১২টিতেই জয় পায় তারা। সিপিএম জেতে মাত্র তিনটি পঞ্চায়েতে। সে সময় থেকে এলাকায় কার্যত একাধিপত্য বজায় রেখেছে ঘাসফুল শিবির।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। গত কয়েক বছরে এলাকায় শক্তি বাড়িয়েছে বিজেপি ও আইএসএফ। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনে সন্ত্রাসের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিরোধীরা উল্লেখযোগ্য ভাল ফল করেছে। ১৫টি পঞ্চায়েতের ৩০৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ৬৬টি আসন দখল করে বিরোধীরা। পঞ্চায়েত সমিতির ৪৫টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস ২টি, সিপিএম ১টি, বিজেপি ১টি এবং আইএসএফ ১টি আসন পায়।
তৃণমূলের অন্দরে গোষ্ঠীকোন্দল ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। গোপালনগর, দুর্বাচটি, রামগঙ্গা, দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর, ব্রজবল্লভপুর ও জি প্লট পঞ্চায়েত এলাকায় একাধিকবার এই কোন্দল সামনে এসেছে। সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক পদ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন স্থানীয় নেতারা। দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর ও ব্রজবল্লভপুর এলাকায় তৃণমূল একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের খবর।
এই পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করতে শুরু করেছে বিরোধীরা। একদিকে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল, অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রচারে আক্রমণ শানাচ্ছে তারা। বিরোধীদের দাবি, একশো দিনের কাজ, বাঁধ মেরামতি, খেয়াঘাটের টেন্ডার এবং আবাস যোজনার অর্থ বণ্টন— সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, গদামথুরাপুর গ্রামীণ হাসপাতাল-সহ ব্লকের আরও তিনটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিকাঠামো বেহাল, জেটিঘাট ভাঙা, নদীবাঁধ দুর্বল।
আইএসএফও এলাকায় নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করেছে। দক্ষিণ গঙ্গাধরপুর, দক্ষিণ রায়পুর ও লক্ষ্মীজনার্দনপুর পঞ্চায়েত এলাকায় তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বহু আসনে প্রার্থী দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে জয়লাভও করেছে তারা। তৃণমূলের অভিযোগ, পঞ্চায়েত ভোটে তাদের রুখতে বাম, কংগ্রেস, বিজেপি ও আইএসএফ একজোট হয়েছিল। যদিও বিরোধীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, বিজেপির অন্দরেও সম্পূর্ণ ঐক্য নেই বলে জানা যাচ্ছে। ব্লক স্তরে সাংগঠনিক পদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে চাপা দ্বন্দ্ব রয়েছে।
এই আবহে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে নদী-সমুদ্রঘেঁষা পাথরপ্রতিমা কেন্দ্রে। তৃণমূল জয় নিয়ে আশাবাদী হলেও দলের অন্দরের গোষ্ঠীকোন্দল, দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিরোধীদের ক্রমবর্ধমান শক্তি— এই সবই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
গত ৩০ বছর ধরে ছ’বার তৃণমূলের টিকিটে লড়াই করেছেন সমীরকুমার জানা। এবার সপ্তম বার ভোটে লড়ছেন। তিনবার জয়লাভও করেছেন। শাসক দলের একাংশ জানাচ্ছে, নতুন প্রজন্ম কাউকে তৈরি না করে, নিজের ক্ষমতা কায়েম রাখতে সাতবার তৃণমূলের টিকিটে প্রার্থী হয়েছেন সমীর। অন্য কাউকে সেই সুযোগ তিনি তৈরি করে দেননি, যা নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে ব্লকের নেতাদের অনেকের মধ্যে। ২০২১ সালে ভোটে ২২ হাজার ভোটে জয়লাভ করে তৃণমূল।
সিপিএম ও আইএসএফ জোট প্রার্থী সত্যরঞ্জন দাস বলেন, ‘‘তৃণমূলের দুর্নীতিই প্রধান বিষয় এখানে। এলাকায় উন্নয়ন বলে তেমন কিছু হয়নি। দীর্ঘদিন বিধায়ক থেকে স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত তৈরি করতে পারেননি সমীরবাবু। মানুষ পরিবর্তন চাইছে।’’
বিজেপি প্রার্থী অসিত বরণ হালদারের কথায়, ‘‘পাথরপ্রতিমা বিধানসভায় বেশ কয়েকটি দ্বীপ এলাকা নিয়ে গঠিত। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। নদীবাঁধ কংক্রিটের হয়নি, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বেহাল। শাসক দলের দুর্নীতিতে মানুষ নাজেহাল।’’
পাথরপ্রতিমা ব্লক কংগ্রেস সভাপতি তথা কংগ্রেস প্রার্থী শুভ্রাংশু নায়েকের বক্তব্য, ‘‘তৃণমূল ও বিজেপি— দু’দলই টাকার জোরে রাজনীতি করছে। আমরা সাধারণ মানুষের হয়ে লড়াই করছি এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছি।’’
শাসক শিবির অবশ্য উন্নয়নকেই মূল হাতিয়ার করে ভোটের ময়দানে নেমেছে। সমীরের দাবি, ‘‘মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সরকারের জনমুখী প্রকল্পই আমাদের জয়ের মূল চাবিকাঠি। বিজেপিকে সারা বছর মানুষের পাশে পাওয়া যায় না। ঝড়-দুর্যোগে তৃণমূল কর্মীরাই মানুষের পাশে থাকেন। ভোট এলে এদের দেখা মেলে, সিপিএম-কংগ্রেসকে তো দেখাই যায় না!’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে