ফাইল চিত্র
তিন মাস ধরে বাড়িতে বসে রয়েছেন টিউবার কিউলোসিসে আক্রান্ত বছর পঞ্চাশের গৃহ-পরিচারিকা কনক হালদার। কাজ নেই তাঁর ছেলেরও। ‘‘লকডাউন-এ কাজটা চলে গেল। বাড়ি ভাড়া দিতে হয় মাসে ১,৮০০ টাকা। রেশনে যা পাই তাতে টেনেটুনে চলে। যেটুকু জমেছিল, বাড়ি ভাড়া দিতেই চলে যাচ্ছে। ধারদেনা করতে হচ্ছে। জানি না আর কত পরীক্ষা দিতে হবে," আক্ষেপ ঝরে কনকদেবীর গলায়। অবশ্য তিনি একা নন। তাঁর মতোই অবস্থা শহর ঘেঁষা দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা শর্মিলা মিদ্দার। বললেন, "তিন মাস কাজ নেই। মাসে ওষুধের খরচ ১,২০০ টাকা। ভাড়া বাড়িতে থাকি। ইলেকট্রিক বিলও দিতে হয়। হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগি। সঙ্গে হাজার অসুখ। এখন দেনা করে চালাচ্ছি। এর থেকে মরে যাওয়া ভাল।" কাজ হারিয়েছেন কালিকাপুরের জয়মণি গায়েনও। তাঁর আদি বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরে। জয়মণি বলেন, ‘‘শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে ঘর ছেড়েছিলাম। মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিলাম। সদ্য মা হওয়া আমার মেয়েটাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন ওদের নিয়ে যাই কোথায়?’’
শর্মিলা ও কনকদেবীর মতো হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা এবং কলকাতা-সহ বেশ কিছু জেলার বহু পরিচারিকাই কাজ হারিয়েছেন ‘লকডাউন’-পর্বে। গ্রামীণ উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে শহরে কাজ করতে আসেন বহু পরিচারিকা। তাঁদের বড় অংশ-ও কাজ হারিয়েছেন লকডাউন-এ। সেই তালিকায় থাকা হুগলির উত্তরপাড়ার বাসিন্দা চন্দনা দেওয়ানের কথায়, ‘‘এমন একটা সময়ে কাজ গেল যখন মেয়ে সন্তানসম্ভবা। রোজগারের কোনও পথ খোলা নেই। দিশেহারা লাগছে।’’
জীবিকায় ‘লকডাউন’-এর প্রভাব বুঝতে গত মাসের শেষদিকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পরিচারিকার সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষা চালিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কাজ হারিয়েছেন ৫৬ শতাংশ পরিচারিকা। কাজ রয়েছে মাত্র ছয় শতাংশের। আংশিক কাজ রয়েছে বাকি ৩৬ শতাংশের। সংগঠনের কার্যকরী সমিতির সদস্যা স্বপ্না ত্রিপাঠীর দাবি, "করোনায় ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে পাঁচ জন পরিচারিকার। আক্রান্ত কমবেশি ৮০ জন। শুধু জীবিকা নয়, আক্রান্ত জীবনও," বলছেন স্বপ্নাদেবী।
বিপন্নতার কথা লিখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে পরিচারিকাদের সংগঠন। তাতে লেখা হয়েছে, 'বয়স্ক, বিধবা এবং একাকী গৃহ পরিচারিকাদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। হাজার হাজার পরিচারিকা আজ কর্মহীন। গত তিন মাস ধরে মজুরি পাচ্ছি না। অস্তিত্বরক্ষাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
স্বপ্নাদেবী বলেন, "সমীক্ষায় আমাদের বিপন্নতার আংশিক ছবি ধরা পড়েছে মাত্র। সার্বিক ছবিটা আরও ভয়ঙ্কর। যোগাযোগের সমস্যার কারণে আমরা কেবল মাত্র পাঁচ হাজার পরিচারিকার থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি। গোটা রাজ্যের সমীক্ষা হলে প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে।"
পরিচারিকাদের ছাঁটাই না করার আবেদন জানানো হয়েছে বাড়ি মালিকদেরও। সংবাদপত্রের মধ্যে লিফলেট গুঁজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন আবাসনে। আবেদন করা হয়েছে, পরিচারিকাদের যেন ছাঁটাই করা না হয়।
স্বপ্নাদেবী বলেন, ‘‘এমন অনেক পরিচারিকা রয়েছেন, যাঁদের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্তান নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন ঝুপড়িতে বাস করেন। রেশন কার্ডও নেই। সকল পরিচারিকার জন্য ১০ কেজি করে চাল, ৩ কেজি ডাল-সহ কিছু খাদ্যসামগ্রী এবং কাজ হারানো পরিচারিকাদের জন্য মাসে ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার আর্জি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছি আমরা।"