ও পার বাংলার স্মৃতি উস্কে দিতে নৌ-বাইচের টক্কর বাগদার গ্রামে

সত্তর বছরের বৃদ্ধ চাষি মনোরঞ্জন বিশ্বাস চেয়ার পেতে বসেছিলেন ইছামতী নদীর পাড়ে। জন্ম, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। পনেরো বছর বয়সে ভিটে ছেড়ে বাবা-ঠাকুরদার হাত ধরে এসেছিলেন এ দেশে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০১৫ ০১:০৩
Share:

হাল ছেড়ো না বন্ধু...। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

সত্তর বছরের বৃদ্ধ চাষি মনোরঞ্জন বিশ্বাস চেয়ার পেতে বসেছিলেন ইছামতী নদীর পাড়ে। জন্ম, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। পনেরো বছর বয়সে ভিটে ছেড়ে বাবা-ঠাকুরদার হাত ধরে এসেছিলেন এ দেশে। স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন, ‘‘ও দেশে বাড়ির কাছেই ছিল দশরথ নদী। সেখানেই হতো নৌ-বাইচ প্রতিযোগিতা। এক-একটা নৌকায় থাকত ১০০-১৫০ জন। তীব্র প্রতিযোগিতা হতো। হাজার-হাজার মানুষ দেখতে আসতেন। নিজেও ওই প্রতিযোগিতায় নেমেছি বার দু’য়েক। পুরস্কারও জিতেছিলাম।’’এ দেশে চলে আসার পরে আর কখনও নৌ-বাইচ প্রতিযোগিতায় নামা বা দেখার সুযোগ হয়নি। তাই শুক্রবার সকালে যখন গ্রামেই বাইচ প্রতিযোগিতার আসর বসেছিল, তিনি আর থাকতে পারেননি। চলে আসেন নদীর ধারে।

Advertisement

বাগদার সিন্দ্রানী পঞ্চায়েতের চরমণ্ডল গ্রামে এ দিন আয়োজন করা হয়েছিল নৌ-বাইচ প্রতিযোগিতার। স্থানীয় ‘চরমণ্ডল পল্লি উন্নয়ন সংস্থা’ কালীপুজোর আয়োজনের পাশাপাশি ওই প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছিল। সংস্থার তরফে জয়দেব বাইন ও রসময় বিশ্বাসেরা বলেন, ‘‘এই গ্রামে নিরানব্বই শতাংশ মানুষই ওপার বাংলা থেকে আসা। ও দেশে তাঁদের অন্যতম প্রিয় খেলা ছিল নৌ-বাইচ। ওপার বাংলার সেই ক্রীড়া-সংস্কৃতি তুলে ধরে এখানকার মানুষদের স্মৃতি ফিরিয়ে দিতেই আমাদের এই আয়োজন।’’

তবে নৌ-বাইচের প্রতিযোগিতা এ বারই প্রথম নয়। ২০১৩ সালেও বাইচের আসর বসেছিল। কিন্তু গত বছর ইছামতী নদী কচুরিপানায় ভরে থাকায় বাইচের প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হয়নি। গ্রামবাসীরা জানালেন, নদী এখন স্রোতহীন। বছরের বেশির ভাগ সময়ই কচুরিপানায় ভরা থাকে। এ বার অবশ্য দুর্গা পুজোর আগের ভারী বৃষ্টিতে নদী থেকে কচুরিপানা চলে গিয়েছে। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল ফরিদপুর জেলায়। বাকিরা এসেছিলেন বরিশাল থেকে। তবে বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগই জন্ম এখানে। তাঁরা বাবা-জেঠাদের কাছ থেকে ওদেশের বাইচের গল্প শুনেছেন। তাঁদের মধ্যেও বাইচ দেখার আগ্রহ রয়েছে।

Advertisement

বেলা পৌনে একটার সময় বাইচ প্রতিযোগিতা শুরু হলেও সকাল ১০টা থেকে গ্রামের মহিলা-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কচি-কাঁচারা নদীর পাড়ে ভিড় জমাতে শুরু করেছিলেন। একটা বড় মোটরচালিত নৌকায় মাইক বাঁধা হয়েছিল। তাতে চলছিল বাইচের ধারাবিবরণী। চারটি দল যোগ দিয়েছিল এ বার। প্রতিযোগিতার সূচনা করেন স্থানীয় ক্রীড়া প্রশিক্ষক গৌর রায়। নদীর বুকে প্রায় দু’কিলোমিটার প্রতিযোগীদের পেরোতে হয়েছে। পাড়ের জনতা সমানে হাততালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইতে স্থানীয় পারমাদন এলাকার জয়দেব হালদারের দল জেতে।

বাইচ দেখতে দেখতে অতীতে ফিরে গিয়েছিলেন গৌরাঙ্গ বিশ্বাস, শৈলেন মজুমদার, ছবিরানি মজুমদারের মতো ওপার বাংলা থেকে আসা বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। গৌরাঙ্গবাবু বলেছিলেন, ‘‘ওপার বাংলায় আমিও পুরস্কার পেয়েছিলাম পিতলের কলসি, মেডেল ও নগদ টাকা। বহু দিন পর সে কথা মনে পড়ছিল।’’ শৈলেনবাবু ওপার বাংলা ছাড়াও বছর দুই আগে গ্রামে আয়োজিত বাইচ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। তাঁর এব‌ং ছবিরানি বিশ্বাসের স্মৃতিচারণ, ‘‘ছোটবেলায় ওপার বাংলার নদীতে বাইচ দেখতাম। এখানেও বাইচ দেখে আনন্দ হচ্ছে।’’

এই আনন্দের স্মৃতিটুকুই তো ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement