ম্যাজিক শো আর ক্রিকেটের ব্যাট-বল বদলে দিয়েছে আদিবাসী গ্রামের ছবি। ছবি বলতে সকাল-রাতে মাঠেঘাটে, বনেবাদাড়ে শৌচকার্য করার অভ্যাস। উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার শবরপাড়া গ্রামের ছেলে-তরুণ-যুবকদের একটা বড় অংশকে ম্যাজিক শো দেখিয়ে এবং ক্রিকেটের ব্যাট-বল দেওয়ার আশ্বাসে একজোট করে গ্রামবাসীকে সচেতন করে তোলার কাজে অনেকটাই সফল হয়েছে প্রশাসন।
প্রশাসনের খাতায় শবরপাড়া এগিয়ে থাকা গ্রাম নয়। গ্রামের মানুষের কাজ বলতে স্থানীয় নদী-খালে মাছ ধরা বা খেতমজুরের কাজ করা। সবক’টি পরিবারই বিপিএল তালিকার নীচে। অনেক বাড়িতেই তৈরি হয় চোলাই। অনেকের আয়ের একটা বড় অংশ যায় চোলাইয়ের পিছনে। এমন এক গ্রামে সরকারি শৌচাগার প্রকল্পের গুরুত্ব বোঝানো সহজ হয়নি। ইচ্ছুক পরিবার ৯০০ টাকা দিলে সরকার তার সঙ্গে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বাড়িতে পাকা শৌচাগার তৈরি করে দেবে—এ কথা কানেই তুলতে চায়নি কেউ।
মাসখানেক আগে বাগদার বিডিও মালবিকা খাটুয়ার নেতৃত্বে ব্লক প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল ওই গ্রামে যায়। উদ্দেশ্য ছিল— গ্রামের মানুষকে শৌচাগার ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করা। কিন্তু সে দিন শত অনুরোধ করেও বাড়ি থেকে কাউকে বার করতে পারেননি প্রশাসনের কর্তারা। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, গ্রামে একটি ম্যাজিক শোয়ের আয়োজন করে ঘর থেকে মানুষকে বার করতে হবে। দর্শকদের মধ্যে চালানো হবে সচেতনতা-প্রচার। সেই প্রচারের পরে মোট বারোটি পরিবার শৌচাগার গড়তে রাজি হয়। গ্রামে গিয়েছেন জেলাশাসক মনমীত নন্দা। প্রশাসন সূত্রের খবর, বিডিও-র কাছে গ্রামে ক্লাব-ঘর, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র গড়া এবং ক্রিকেট ব্যাট-বল, ফুটবল দেওয়ার দাবি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন গ্রামের কিছু কিশোর এবং যুবক। বিডিও তাঁদের বলেন, তিনি ওই দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন, কিন্তু সে জন্য ওই ছেলেদেরও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে শৌচাগার তৈরি করার উদ্যোগে সামিল হতে হবে।
ছেলেরা রাজি হতে বাবাই শবর, ভূতনাথ শবর, কালাচাঁদ শবরের মতো দশ জন কিশোর-যুবককে নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়, ‘আমডোব মুক্তধারা সঙ্ঘ’ নামে একটি কমিটি। কমিটি সদস্যদের কেউ লেখাপড়া, কেউ কাজ করেন।
বাবাই, ভূতনাথেরা জানালেন, সঙ্ঘের সদস্যেরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে বলছেন, খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করলে রোগ ছড়াবে। বিডিও বলেন, ‘‘গ্রামে ৯৫টি পরিবার বাস করে। সচেতনতা ছড়ানোর পিছনে গ্রামের কিশোর-যুবকদের ভূমিকা অনেক।’’ গ্রামের যাঁরা এখনও শৌচাগার গড়ার জন্য টাকা দেননি, তাঁদের বক্তব্য, সঙ্গতির অভাবেই টাকা দেওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ পেলে টাকা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তাঁরা। বিডিও জানান, যে পরিবার ন’শো টাকা দিতে পারবে না, তাদের ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজ দেওয়া হবে। যাঁরা বয়সের কারণে ওই প্রকল্পে কাজ করতে পারবেন না, পঞ্চায়েত সমিতির নিজস্ব তহবিল থেকে তাঁদের ওই টাকা দেওয়া হবে।