(বাঁ দিকে) পণ্ডিত হরানন্দ বিদ্যাসাগর। (ডানদিকে) দেবী জয়চণ্ডীর মন্দির। —নিজস্ব চিত্র।
বহু বছর আগে কলকাতার কালীঘাট এলাকা থেকে আদি গঙ্গা প্রবাহিত হয়ে মিশেছিল সাগরের মুড়িগঙ্গা নদীতে। প্রায় এক কিলোমিটার চওড়া ওই নদী পথের দু’ধারে ছিল জনবসতি ও গভীর জলা জঙ্গল। ১৪৫০ সালে ওই এলাকার জমিদার ছিলেন নীলকন্ঠ মতিলাল। ১৫৯৪ সালে বিশাল প্লাবনে এলাকা জনশূন্য হয়ে যায়। তারপরেই জমিদার মতিলালের বংশধরেরা জমিদারী ছেড়ে বাংলাদেশের যশোহরে ফিরে যান। ১৬০০ সালে ওই পরিবারেরই এক সদস্য গনানন্দ মতিলাল নৌকা করে গঙ্গাসাগরে তীর্থ করতে আসেন। সে সময় একদিন সন্ধ্যায় জয়নগরের রাজারগঙ্গা নামে এক জায়গায় নৌকা নোঙর করে। রাতে থাকার সময় গনানন্দ দেখেন, এক সুন্দরী নাবালিকা মাটির কলসি করে গঙ্গার জল নিয়ে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। ওই দিন রাতেই গনানন্দ স্বপ্নে জানতে পারেন ওই বালিকা কোনও সাধারণ বালিকা নয়, তিনি দেবী জয়চণ্ডী। সেই জয়চণ্ডীর আদেশে সেখানেই একটি বকুল গাছের তলা থেকে দেবীর মূর্তি উদ্ধার হয়। পরে সেখানে তিনি একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি সপরিবারে বসবাসও শুরু করেন। সেই থেকেই ওই এলাকা জয়চণ্ডীতলা নামে পরিচিত। কথিত আছে দেবী জয়চণ্ডীর নামানুসারেই জয়নগর নামকরণ হয়েছিল। আর গঙ্গা মজে গড়ে ওঠা জনপদের নাম হয়ে যায় মজিলপুর। যা এখন জয়নগর-মজিলপুর নামে খ্যাত।
১৮৬৪ সালে ইংরেজ শাসনকালে জয়নগর টাউন কমিটির গঠন হয়েছিল। ওই টাউন কমিটির সভাপতি ছিলেন পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর বাবা পণ্ডিত হরানন্দ বিদ্যাসাগর। ১৮৭৯ সালে বঙ্গীয় মিউনিসিপ্যাল আইন কার্যকর হওয়ার পর জয়নগর পুরসভার অনুমোদন পায়। সে সময় প্রথম নির্বাচিত পুরপ্রধান হন পণ্ডিত হরানন্দ বিদ্যাসাগর। তাঁর সঙ্গে ওই পুরসভায় আরও ১২ জন সদস্য ছিলেন। প্রথমে জমিদার বাড়িতে পুরসভার কাজকর্ম চলত। পরে ওই এলাকার এক জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মিত্র পুরসভার ভবন তৈরির জন্য এক বিঘা জমি দান করেন। সেই জমিতেই লাল রঙের একতলার পুরভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহের পরে ঠিক তার পাশেই তৈরি হয় জয়নগর থানা। তার আগে থানার কাজ চলেছিল ওই এলাকার ময়দা গ্রামে। সে সময় জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ হাজার।
জয়নগরের ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে অনেক মনীষী ও বিপ্লবীদের জীবন কথা। জয়নগরের মজিলপুরের এক সময়ের বাসিন্দা পণ্ডিত রামগোপাল তর্কালঙ্কার (ভট্টাচার্য) একজন বিখ্যাত বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ১৭৯৩-১৮৪৪ সালের দিকে বেদজ্ঞান তিমির নামে একটি সংস্কৃত ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় ওই গ্রন্থের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি কলকাতার ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির সভা পণ্ডিত ছিলেন। পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্কপঞ্চানন (ভট্টাচার্য) খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মজিলপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একটি সংস্কৃত ব্যকারণ রচনা করেছিলেন যা দেশ বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল। পণ্ডিত হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন মজিলপুর ভট্টাচার্য পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ বাল্মিকী রামায়ণ অনুবাদ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের তত্ত্বাবধানে তিনি কালীপ্রসন্ন সিংহর বিখ্যাত মহাভারতের অনুবাদক ছিলেন। ওই সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিলেন। ১৮২৭ থেকে ১৯১২ সালের দিকে যারা ধর্মীয় গোড়ামি ও কুসংস্কার মুক্তসমাজ গড়ার কাজ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মজিলপুরের বাসিন্দা হরানন্দ বিদ্যাসাগর। তিনিই প্রথম ১৮৬২ সালে মজিলপুরে বালিকা বিদ্যালয় গড়েছিলেন। সমস্ত রকম কুসংস্কার ও নিন্দা উপেক্ষা করে তার কন্যা ঠাকুরদাসী ওই স্কুলে পড়তেন। তাঁর সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এমনকী তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্কৃত শিক্ষক ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর লেখা একাধিক কাব্যগ্রন্থ বিদগ্ধ মহলে সমাদৃত।