দফতরে বিরাজকৃষ্ণবাবু।
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা। বনগাঁ বিডিও অফিসে গিয়ে দেখা গেল অফিস গেটের বাইরের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন সরকারি দুই কর্মী।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। অফিস চত্ত্বরেই শীতের রোদ গায়ে মেখে নিজেদের মধ্যে খোঁস মেজাজে গল্প করছেন দুই সরকারি কর্মী।
অথচ গাইঘাটা বিডিও অফিস চত্ত্বরে পরপর দুদিন গিয়ে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনও সরকারি কর্মী বাইরে নেই। সকলেই নির্দিষ্ট ঘরে বসে কাজ করছেন। কিন্তু কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই অফিসটির চিত্রও বনগাঁ বিডিও অফিসের মতোই ছিল। আর ব্লক অফিসে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হত।
নির্দিষ্ট সময়ে কেউ অফিস আসতেন না। প্রায়শই দেরীতে অফিস ঢুকতেন অনেকে। আবার বিকেলে তাড়াতাড়ি বাড়িও চলে যেতে দেখা যেত। বহুদিন ধরেই এটা ছিল গাইঘাটা বিডিও অফিসের অতিপরিচিত ছবি। সকলে এই পরিস্থিতির সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সম্প্রতি সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে অফিসের কর্মীরা হাজির হচ্ছেন। দুপুরে টিফিন খাওয়ার সময় ছাড়া কর্মীদের আর অফিসের বাইরেও দেখা যাচ্ছে না। অফিসে নিজেদের কাজ নিয়ে এখন সকলেই ব্যস্ত। এখন বিকেল প্রায় সাড়ে ৫টা নাগাদই সবাই বাড়ি ফেরেন। সাধারণ মানুষকেও আর অফিসের বাইরে অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে না।
এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র নতুন বিডিও-র জন্য বলে জানা গিয়েছে। গত অগস্ট মাসে বিডিও হিসাবে কাজে যোগ দিয়েছেন বছর ত্রিশের যুবক বিরাজকৃষ্ণ পাল। বিডিও অফিস সূত্রে খবর, সবকিছু দেখে শুনে তিনি প্রথমেই অফিসের সব কর্মীদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন। সেখানে সাফ জানিয়ে দেন, সকলকে সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে অফিসে আসতে হবে। আর বিকেল পাঁচটা পনেরো মিনিটের আগে অফিস ছাড়া যাবে না। বিষয়টি সকলের মেনে চলাটা বাধ্যতামূলক বলেও তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি অফিসের সময় বাইরে থাকা চলবে না। চা খেতে হলে চেয়ারে বসেই খেতে হবে। ওই সিদ্ধান্তের পর জানা গিয়েছে, একদিন দু’জন কর্মী দেরি করে অফিসে ঢুকেছিলেন। তাঁদের শো-কজ করে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে।
এখন বিডিও-র সিদ্ধান্ত মেনেই সকলেই কাজ করছেন। ফলে ফিরে আসছে কাজের মনোভাব। বিরাজকৃষ্ণবাবু নিজেও নির্দিষ্ট সময় মেনে অফিস করেন। এমনকি রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্তও তাঁকে অফিসে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, দিনের কাজ দিনেই শেষ করতে হবে কর্মীদের। কাজ শেষ না হলে এখন অনেক কর্মীকেই রাত ৮টা পর্য়ন্ত কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে সন্ধ্যা ৬টার পর যাঁরা অফিসে কাজ করছেন তাঁদের চা খাওয়াচ্ছেন বিডিও।
সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে অফিস আসাটা বাধ্যতামূলক ঠিকই। কিন্তু পথে অবরোধ বা নান কারণে যদি কোনও কর্মীর আসতে দেরি হয় সেটা অবশ্য সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করছেন তিনি। কারও আসতে দেরি হলে তাঁরা এখন সরাসরি ফোনে বিডিওকে জানাতে পারছেন।
শুধু ব্লক অফিসের সরকারি কর্মীদের জন্যেই ওই নিময় চালু হয়েছে যে তা নয়। ব্লকে যে তেরোটি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে সেখানকার সরকারি কর্মীদের জন্যেও একই নিয়ম চালু করেছেন বিডিও। চালু করেই থেমে নেই তিনি। মাঝে মধ্যেই পঞ্চায়েত অফিসগুলিতে হাজির হচ্ছেন বিডিও। ফলে সেখানেও কাজের গতি এসেছে।
নিয়মিত ব্লকের প্রাথমিক স্কুল, আইসিডিএস কেন্দ্রে বা কোনও সরকারি প্রকল্পের কাজ দেখতেও যাচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যে মিড-ডে মিলের গুণগত মান খারাপের হদিসও পেয়েছেন বিরাজকৃষ্ণবাবু। স্থানীয় ইছাপুর ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ প্রধান আনারুল মণ্ডল বলেন, ‘‘আগে পঞ্চায়েতে কাজের জন্য বার্ষিক টেণ্ডার ডাকা হত। নতুন বিডিও প্রকল্প ধরে ধরে টেণ্ডার ডাকার ব্যবস্থা করেছেন। তাতে ঠিকাদারদের দাপট ভেঙে যাচ্ছে। কাজে স্বচ্ছতা আসছে।’’ গাইঘাটা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুব্রত সরকার বা সহ-সভাপতি ধ্যানেশ নারায়ণ গুহ জানান, নতুন বিডিও আসার পর উন্নয়নমূলক কাজে গতি এসেছে। তিনি নিজেই এলাকা ঘুরে সবকিছু খেয়াল রাখছেন। আর সরকারি কর্মীরাও চেয়ার ছেড়ে উঠছেন না। ব্লকের সরকারি কর্মীরা বিডিও-র ওই পদক্ষেপকে সাধুবাদ দিচ্ছেন। এক কর্মীর কথায়, ‘‘বিডিও কর্মসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনছেন। কাজের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন। আমরা কর্মীরাও তাঁকে সহযোগিতা করছি।’’ অন্য এক কর্মী জানান, প্রয়োজনে রাতেও এখন কাজ করতে হচ্ছে।
কী বলছেন বিডিও?
বিরাজকৃষ্ণবাবুর কথায়, ‘‘সরাকারি নিয়মের মধ্যে থেকেই প্রশাসনিক কাজে গতি আনবার চেষ্টা করছি।’’ স্থানীয়রা জানান, সরকারি নিয়মটুকু যদি সকলে ভালভাবে পালন করতেন তা হলে আমরাও ভাল পরিষেবা পেতাম।