মা, বাবার স্বপ্ন পূরণ করে তাঁদের ছেলেমেয়েরা। এখানে অবশ্য মা, অনিতা সিংহ পূরণ করছেন ছেলের স্বপ্ন। মনিপালে এক মোটরবাইক দুর্ঘটনায় ছেলে অনুরাগ মারা গিয়েছেন পাঁচ বছর আগে। মায়ের কাছে জমা রেখে গিয়েছেন তাঁর স্বপ্ন।
রাঁচির ডোরান্ডা নর্থ অফিস পাড়ার বাসিন্দা অনিতা সিংহ জানতেন তাঁর ছেলে অনুরাগের সমাজ সেবার দিকে একটা টান আছে। ২৩ বছরের অনুরাগ তাঁকে মাঝে মধ্যেই বলতেন, চাকরি করে শুধু টাকাপয়সা উপার্জন নয়, এমন কিছু একটা করতে হবে যা সমাজের পিছিয়ে পড়া, দরিদ্র মানুষদের কাজে লাগে। অনুরাগ ওঁর সহপাঠীদেরও বলেছিলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরির পাশাপাশি গরিব বাচ্চাদের পড়ার জন্য একটি স্কুল খুলবেন। তাদের পড়াশোনার জন্য আর্থিক সাহায্য করবেন। বন্ধুদেরও আগাম সহায়তা চেয়ে রেখেছিলেন অনুরাগ।
ছেলের এই পরিকল্পনার কথা অনিতা জানতে পারলেন ছেলের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে। অনুরাগের বন্ধুদের কাছ থেকে। আর সেদিনই অনিতা ঠিক করে ফেলেন, ছেলের স্বপ্ন পূরণ তিনিই করবেন। ছেলের অন্তিম সংস্কার সেরে রাঁচিতে ফিরে বিনামূল্যে গরিব বাচ্চাদের পড়ানোর কাজ শুরু করলেন মা। সেই শুরু।
রাঁচির ডোরান্ডার একটি স্কুলের ক্লাসঘরে দাঁড়িয়ে অনিতা বলেন, “এই সব কচিকাঁচা পড়ুয়াদের মধ্যে আমি অনুরাগকে খুঁজি না। ওর কোনও বিকল্প আমার জীবনে কোনও দিন আসবে না। তবে ছেলের স্বপ্ন তো পূরণ করার চেষ্টা করতে পারি।’’ সেই কারণেই এই গরিব বাচ্চাদের শুধু পড়ানোই নয়, ওদের পড়াশোনার যাবতীয় খরচের দায়ভারও নিয়েছেন অনিতা। আর তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনুরাগের বন্ধুরা। তাঁরা সবাই এখন প্রতিষ্ঠিত।
৫২ বছরের অনিতাদেবীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে অনুরাগের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই। বাপের বাড়িতে ছেলেকে নিয়েই থাকতেন মা। পারিবারিক ব্যবসা ছিল তাঁদের। অনিতা বলেন, “অনুরাগকে একা হাতে মানুষ করেছি। রাঁচির সেন্ট জেভির্য়াস স্কুলে পড়ার পর ও চলে গেলে মনিপালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ছেলে বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেবে, এই ভেবেই টাকা জমাচ্ছিলাম তিলতিল করে।’’ ছেলেকে আকড়ে ধরেই বাঁচতে চেয়েছিলেন অনিতা। কিন্তু নিয়তির পরিহাস। জানতেন না, তাঁর জীবনে নেমে আসছে বিরাট বিপর্যয়। অনিতার কথায়, ‘‘২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারির এক বিকেল। মণিপাল থেকে ফোনে ছেলের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলাম।”
ডোরান্ডার জেএমজে উচ্চ বিদ্যালয়ের ছুটির পরে একটি ক্লাস ঘরে বাচ্চাদের পড়ান অনিতা। লোরেটো-রাঁচির ছাত্রী অনিতা নিজেও কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। এখন রাঁচির বিভিন্ন বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে দেখেন, কোন বাচ্চার পড়াশোনার আগ্রহ আছে। সেই রকম বাচ্চা নির্বাচন করে তার পড়াশোনার খরচের দায়িত্ব নেন তিনি। অনিতা বলেন, “গত চার বছরে ১০০ জন বাচ্চাকে পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছি। প্রতি বাচ্চার পড়াশোনার জন্য বছরে ৮ হাজার টাকা মতো খরচ হয়।”
ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে এত খরচ কীভাবে চালান তিনি? অনিতা জানালেন, তাঁদের পারিবারিক একটা ছোটো কারখানা ছিল। সেটা বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে সব থেকে বেশি সাহায্য আসে ছেলের বন্ধুদের কাছ থেকে। অনিতা বলেন, “অনুরাগের ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সহপাঠীরা এখন অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। অনেকে বিদেশে ভাল চাকরি করে। আমার উদ্যোগের কথা শুনে ওরা এগিয়ে এসেছে। ওরা আর্থিক সাহায্য করে। ওর বন্ধুরা বলেছে, আন্টি আমরা আছি তোমার সঙ্গে। অনুরাগের স্বপ্ন পূরণ করতে তুমি এগিয়ে যাও।’’ এখন ১০০টা বাচ্চা পড়ছে। আগামী দশ বছরে ২০০ বাচ্চার দায়িত্ব নেবেন অনিতা। তাঁর কথায়, ‘‘জীবনে ওদের দাঁড় করাতেই হবে। তবেই অনুরাগ শান্তি পাবে।’’