পরিমল ভট্টাচার্য। ছবি: শুভেন্দু চাকী।
একটিমাত্র নির্বাচন নিয়েই কি মানুষ মশগুল থাকবেন? যে-নির্বাচনে পাঠক মুখোমুখি বসবেন বইয়ের সঙ্গে একা, চিনতে চেষ্টা করবেন লেখকের অন্তর্জগৎ, তার জন্যও তো খানিক সময় বের করে নিতে হবে। আর স্রষ্টার সেই জগতে যদি ধরা থাকে সাতশো বছরের ইতিহাস, যদি বাস্তবতার ইন্দ্রজাল আর ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা পরতে-পরতে খুলে যেতে থাকে কথকতার পোশাকে, যদি স্থানিক আর কালিক দূরত্ব মুছে যায় মুহুর্মুহু, স্মৃতি হয়ে ওঠে সত্তার স্বাভাবিক অংশ—তেমন এক সৃষ্টির কাছে তখন এসে দাঁড়াতে হয় পারিপার্শ্বিক হইহট্টগোল থেকে সরে এসে। অথবা চারপাশটাকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখার জন্যও তখন অ-পরিহার্য হয়ে ওঠে সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা-র মতো উপন্যাস, যে-গ্রন্থকে সম্মানিত করা হল ১৪৩২ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার-এ।
উপন্যাসের লেখক পরিমল ভট্টাচার্যকে কি বলা যায় ‘শিকড়লগ্ন বিশ্বনাগরিক’? তাঁর লেখা থেকে শব্দ ধার নিয়েই এ-কথা বলা যায় নিশ্চিত, কারণ সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা-র বুননে-মননে যদি কোথাও থেকে থাকেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কিংবা হোর্হে লুইস বোর্হেস, হয়তো ততখানিই থাকবেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়; আন্তর্জাতিক ঔদার্যের পাশাপাশি এখানে সম্পৃক্ত হয়ে আছে দেশজ সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাসের উর্বর ভূমি। লেখকের পাঠবিশ্বে হুলিও কোর্তাসার বা আলেহো কার্পেন্তিয়ের-এর পাশেই থাকেন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর সমরেশ বসু।
“মহানগর কলকাতা, উনিশ শতক আর তার অবধারিত সংজ্ঞার্থে ফিরে-ফিরে আসা বেঙ্গল রেনেসান্স—কেবল এইটুকু দিয়েই কি ধরা যায় বঙ্গদেশের বিস্তৃত ইতিহাস? নাকি তা কেবলই দেড়শো-দুশো বছরের পুরনো কুয়ো খনন করে যাওয়া? শহরকেন্দ্রিক গল্পগুলো সব প্রায় একই রকম হয়ে যায় না কি?” প্রশ্ন তোলেন লেখক, আর প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা বলেই সরে আসেন সেই বদ্ধ অবস্থান থেকে, সাতগাঁর আকাশ-বাতাসেই সন্ধান করেন কসমোপলিটানিজ়ম-এর। উপন্যাসের এই জগৎটি পুষ্ট হয় কেবল সাহিত্যের বোধ থেকে নয়; পোড়ামাটির মন্দিরের শিল্পকর্ম, সূত্রধরের পালাগান, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ফ্রন্টিয়ার পেরোনো গল্পগাছাও নির্মাণ করে ‘হারানো স্বদেশভূমির স্মৃতিযাপনের’ পরিসর। যে-ইতিহাস মোছা যায় না, যে-ভূমিখণ্ড হারিয়ে যায় না, তাকেই স্থায়িত্ব দেওয়ার কাজ করে চলেছেন পরিমল ভট্টাচার্য, তাঁর অন্যান্য কয়েকটি নন-ফিকশনের মতো, সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা-ও নিজেই অনুবাদ করছেন ইংরেজিতে, গড়ে তুলছেন ‘দ্য মিস্টউইভার্স’ মিউজ়িয়ম’—একাধারে শিল্প-কর্মশালা এবং মহাফেজখানা। এমন এক প্রকল্পের অনুষঙ্গে অবধারিত মনে পড়ে যায় অরহান পামুক-এর উপন্যাস দ্য মিউজ়িয়ম অফ ইনোসেন্স-এর কথা, পামুকের গড়ে তোলা সংগ্রহশালার কথাও। ‘হারিয়ে যাওয়া দেশ’ প্রবন্ধে পরিমল ভট্টাচার্যও বিস্তারে লিখেছিলেন এই ‘নিষ্কলুষতার জাদুঘর’ সম্পর্কে।
এ ভাবেই সংরক্ষিত হয় শিকড়ের সংস্কৃতি, ভাষার নিজস্ব ঘরবাড়ি। পরিমল ভট্টাচার্য আস্থা রাখেন কবি চেসওয়াফ মিয়োশ-এর বিশ্বাসে—‘ল্যাঙ্গোয়েজ ইজ় দি ওনলি হোমল্যান্ড’। ভাষার কাছে ফিরে আসা মানেই নিজস্ব সংস্কৃতিকে আরও গভীর ভাবে বুঝতে শেখা। সেই টানেই বুঝি উপন্যাসে প্রজন্মের পর প্রজন্মের চরিত্ররা এক ‘আমি’ আর-এক ‘আমি’র সঙ্গে মিলিত হতে চায়। হয়তো সেই টানেই অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ফিরে আসে একটি কাকাতুয়া হয়ে! ভাষা, অক্ষরপুঞ্জ এই উপন্যাসের ছায়াপথ—তারই ভিতর আবর্তিত নদী গির্জা পাখি বিগ্রহ জাহাজঘাটা ঘড়িঘর...। টেক্সটে ব্যবহৃত যে-ভাষা, তার দু’-একটি নমুনা আমরা পড়ে নিতে পারি—“বিশুকা মাটির হাঁড়িতে গঙ্গাজলে আঙুল ডুবিয়ে কয়েক ফোঁটা ফেলে দিল বন্ধ ঠোঁটের ওপর। বাপ্পা দেখে, চিবুকের বলিরেখা বেয়ে ব্যাগাটেলির গুলির মতো গড়িয়ে পড়ছে জলবিন্দু”।
বাপ্পাদিত্য এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলা যেতে পারে, তার সূত্র ধরেই কাহিনি এগোতে থাকে কিংবা পিছিয়ে যায়, বিস্তার পায় বহুদূর পর্যন্ত, আবার কখনও সঙ্কুচিত হয়ে ঢুকে পড়ে একেবারে তার মনের ভিতর, সেই ‘স্মৃতিযাপনের’ অংশ হয়ে। বাপ্পার দুঃখের উপলব্ধিতে ছুঁয়ে থাকে সাতগাঁ আর কলকাতা—“নাকি দুঃখটা এই কারণে যে ঘুম ভেঙে সে টের পেয়েছে সাতগাঁয় নয়, সে রয়েছে কলকাতায়? এখানে ম্যাওবেড়ালের গির্জার ঘণ্টাধ্বনি নেই, ঘুপচি ঘরে মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা খড়কাটা কলের মতো শব্দে বাতাস কাটছে। আবার সে ঘুমিয়ে পড়বে আর জেগে উঠবে সকালবেলায়, যে সকালের স্বাদ হরলিক্সে ডোবানো থিন অ্যারারুট বিস্কুটের মতো অপরিবর্তনীয়, আর সারাদিন ধরে ওকে দেখবে দম-দেওয়া একলা টিনের ভাল্লুকটা, যার নীল পুঁতির চোখ, দু হাতে খঞ্জনি, রঙ চটে গিয়েছে।”
উপন্যাসের স্বাপ্নিক চলাচলের পরিসরে লেখকের এমন ভাষা উপমা চিত্রকল্প অবিচ্ছেদ্য সংশ্লেষে বেঁধে রাখে টেক্সট। পরিমল ভট্টাচার্য বিশ্বাস করেন, “বিশুদ্ধ ফিকশন কিংবা নন-ফিকশন বলে কিছু হয় না, পরস্পরের আলাপচারিতা আমরা পাঠক হিসেবে শুনতে পারি কেবল”। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা উপন্যাসের শরীরেও স্বতশ্চল থাকে মার্ক্স মহিষাসুরমর্দিনী মেটিরিয়া মেডিকা মেটামরফোসিস! এ সবের মধ্য দিয়েই নির্মিত হয় উপন্যাসের স্বতন্ত্র জগৎ, সাড়ে ছশো পৃষ্ঠার আয়তন ছাপিয়ে যে-জগৎ ক্রমপ্রসরমাণ, যেখানে স্বপ্নের ভিতর আধো-অন্ধকার এক প্যাসেজ হয়ে যায় অনন্ত সিঁড়ি, এশার-এর ছবির মতো পাঠক সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করতে থাকেন, পৌঁছে যান অনন্য অভিজ্ঞতার এক-একটি স্তরে।
সুমিতা চক্রবর্তী।
প্রসাদরঞ্জন রায়।
প্রমিতা মল্লিক।
কোভিড মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের সেই ভয়াবহ মুহূর্তগুলিতে পরিমল ভট্টাচার্যের কেবলই মনে হত, আমি কি থাকব? অস্তিত্বসঙ্কটের সেই আবহেই চলেছে সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা লেখার কাজ, ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা থেকে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণও লেখালিখির জন্যই। পরিমল ভট্টাচার্যের দেড় বছরের নিবিড় পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দিলেন এ বারের আনন্দ পুরস্কারের স্বনামখ্যাত পাঁচ বিচারক— অধ্যাপক-প্রাবন্ধিক সুমিতা চক্রবর্তী, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব ও প্রাবন্ধিক প্রসাদরঞ্জন রায়, রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী প্রমিতা মল্লিক, কথাসাহিত্যিক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশের উদ্যোগপতি ও প্রাবন্ধিক ইফতেখারুল ইসলাম।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী।
ইফতেখারুল ইসলাম।
“বইটাকে ভাল হতে হবে”—এই ধারণাতেই আস্থা রাখেন পরিমল ভট্টাচার্য। আস্থা রেখেছেন পাঠকও। ‘শো! ডোন্ট টেল!’—শব্দগুলি ফিরে-ফিরে এসেছে সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা উপন্যাসে। লেখকও হাঁটছেন সেই পথ ধরেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে