বহরমপুরে বিজেপির আইন অমান্য কর্মসূচিতে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।
ভোগান্তিই বুঝি ভবিতব্য!
একটা করে জনসভা, আর তার জেরে দুপুর থেকে সন্ধ্যাতক আস্ত বহরমপুর শহরটা যানজটে কাহিল হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে রাতের দিকে তাকিয়ে আছে, অন্ধকার ঘন হলে একটু স্বস্তির শ্বাস নেবে বলে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মিছিল না হোক বহরমপুরকে এখন মিটিং নগরী বললে অন্তত অত্যুক্তি হয় না।
বুধবার দুপুরে বহরমপুর টেক্সটাইল কলেজ মোড়ে ছিল বিজেপি-র সভা। যার লেজ ধরে শুরু হয়েছে আইন অমান্য। বিজেপি জেলা নেতারা বলছেন, ‘‘জানি, মানুষের একটু অসুবিধা হচ্ছে। তা বলে রাজ্য জুড়ে কর্মসূচি এড়িয়ে যাাব কী করে।’’ যুক্তিটা প্রায় একই রকমের কংগ্রেস কিংবা বাম দলগুলিরও। আর কংগ্রেসের এক মাত্র গড়ে নির্বাচনের আগে নিজেদের শক্তি পরখ করতে শাসক দলের কথায় কথায় সমাবেশ তো প্রায় বাঁধাধরা হয়ে গিয়েছে—কখনও শুভেন্দু অধিকারীর হুঙ্কার, তো পরক্ষণেই জেলা নেতারা তার রেশ জিইয়ে রাখতে শহরের কোনও একটা মাঠ-ময়দান বেছে নিয়ে সমাবেশের ডাক দিয়ে বসছেন।
১৬ নভেম্বর বহরমপুরে জেলা প্রশাসনিক ভবন লাগোয়া রাস্তা আটকে সভা করেছিল কংগ্রেস। তারই পাল্টা সভার ডাক দিয়েছিল তৃণমূল, ৭ ডিসেম্বর, এফইউসি ময়দানে। তার পরেই এই আইন অমান্য কর্মসূচি।
পাশাপাশি, ছোটখাটো সমাবেশ-বিক্ষোভ-নিদেনপক্ষে স্মারকলিপি জমা দেওয়া নিয়ে মাঝারি মিছিলের তো অন্ত নেই। মুর্শিদাবাদ জেলায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার দাবিতে গত ২১ ডিসেম্বর স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশন অফ ইন্ডিয়া নামে একটি সংগঠন বহরমপুরে জেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে সভা করে। সেই সভায় জেলার প্রায় ২৬টি ব্লক থেকে বেশ কয়েকটি বাস ভাড়া করে হাজার কয়েক মানুষের ভিড় দেখল বহরমপুর। যানজট সে দিনও কম হয়নি। ১৭ নভেম্বর জেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনের রাস্তা আটকে অবস্থান-বিক্ষোভ করেছিল বাম ছাত্র সংগঠনগুলি। ছোট ম্যাটাডোরের উপরে দাঁড়িয়ে সে সভাতেও থমকে গিয়েছিল বহরমপুরের একটি বড়সড় অংশ।
এ দিন, বিজেপি নেতা-কর্মীদের আইন অমান্যের সূত্র ধরে গত এক মাসে শহরে তিন-তিনটি বড় মাপের সমাবেশ হল। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যার জেরটা শুরু হয় দিন কয়েক আগে থেকেই। বাস তুলে নেওয়া, পুলিশের অনুশাসন, সভার দিনে বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ— হয়রানির শেষ নেই। রাজনীতির কারবারিদেরই একাংশের মতে, এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের ঢাক পেটায় বটে তবে সঙ্গে পাওনা হয়ে যায় মানুষের ‘বিরক্তি।
বিজেপি-র আইন অমান্যকে ঘিরে কৃষ্ণনগর, রায়গঞ্জ, বারাসত নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল পুলিশ। ফলে তাদের বাড়তি সতর্কতার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। নেতা-কর্মী-সমর্থকরা যাতে জেলা প্রশাসনিক ভবন পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারেন সে জন্য মঙ্গলবার রাত থেকেই ল-ক্লার্ক অ্যাসোসিয়েশনের অফিসের সামনে লোহার ব্যারিকেড বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে গাড়ি থেকে মানুষ বিপাকে পড়ে সকলেই।
এক কদম এগিয়ে সভাস্থল থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে বিএসএনএল অফিসের গেটের সামনে এ দিন সকাল থেকে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে পড়ে পুলিশ। পুলিশের ওই কড়াকড়ির ফলে সব থেকে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে।
পুলিশের বাড়াবাড়িতে ক্ষুব্ধ বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বিরোধী দল রাজনৈতিক বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করবে তা কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশের সহ্য হয়!’’
অভিযোগটা একই রকম কংগ্রেসের। স্থানীয় নেতাদের এ নিয়ে ক্ষোভ একই সুরে বলছেন, ‘‘তৃণমূলের সব সমাবেশে সাত খুন মাফ।’’ বামেরাও পুলিশকে টিপ্পনি কাটতে ছাড়ছেন না—‘‘বহু পুলিশ কর্মীই তো তৃণমূলে নেতা-মন্ত্রী হয়ে গিয়েছেন। হয়তো সে লোভেই পুলিশ আমাদের সভা আটকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।’’
রাজনীতির কারবারিরা আকচাআকচিতেই ব্যাস্ত, সভা সমাবেশের নাছোড় ভিড়ে যে সাধারণের নাভিশ্বাস সে দিকে তাকানোর সময় কোথায় তাঁদের!