ভোট তখনও মাস কয়েক বাকি। তবে মাটি তাততে শুরু করে দিয়েছে তারই মধ্যে।
বুদবুদের দেবশালার বাজারে চায়ের দোকান ছিল আনোয়ার চৌধুরীর। তাঁর দাদা মোর্তজা চৌধুরী ছিলেন এলাকার সিপিএম নেতা। অভিযোগ, ২০০৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ডিসেম্বরের একেবারে শেষ দিকে এক সন্ধ্যায় আচমকা এক দল দুষ্কৃতী আনোয়ারের দোকানে হামলা চালায়। লাঠি, রড, তলোয়ার, টাঙ্গি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। পাশেই ছিলেন আনোয়ারের এক ভাই মোজাম্মেল চৌধুরী। দাদাকে বাঁচাতে গিয়ে মার খান তিনিও। হামলা চালিয়ে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা।
দোকানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা আনোয়ারকে বাড়ির লোকজন প্রথমে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের লোকজন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সেখান থেকে তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়। সপ্তাহ দুয়েক পরে ২০০৬-এর ১৩ জানুয়ারি সেখানেই মৃত্যু হয় বছর আটচল্লিশের আনোয়ারের। পরিবারের তরফে ৩০ জনের নামে খুনের অভিযোগ করা হয়।
পরিবারের দাবি, অভিযুক্তেরা ছিল বুদবুদের কলমডাঙা এলাকার সিপিআই (এমএল) সমর্থক। দেবশালা বাসস্ট্যান্ডে সিপিএম এবং সিপিআই(এমএল) সমর্থকদের বিবাদ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। তার জেরেই এই খুন। কিন্তু অভিযুক্তেরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ ধরেনি বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে রাজ্যে বিধানসভা হয়। বামেরাই আবার ক্ষমতায় আসে। তার মাস কয়েকের মধ্যে আবার অন্ধকার নেমে আসে রায়কোনার চৌধুরী পরিবারে।
২০০৬-এর ১৩ অক্টোবর ভাইকে খুনে অভিযুক্তদের চিনিয়ে দিতে পুলিশের সঙ্গে বুদবুদের কলমডাঙা গ্রামে যান মোর্তজা। দুপুরে গ্রামে ঢোকার পরেই এক দল দুষ্কৃতী তাঁর উপরে চড়াও হয়। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের সামনেই এই হামলা হয়। অথচ, পুলিশ তা রুখতে পারেনি। দুষ্কৃতীদের মারে মাথায় গুরুতর চোট পান মোর্তজা। তাঁকে বর্ধমানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ১৫ অক্টোবর সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।
মোর্তজা দেবশালা পঞ্চায়েতের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া এলাকায় সিপিএমের ডাকাবুকো নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। সিপিএমের অভিযোগ, সে জন্যই পরিকল্পনা করে খুন করা হয় তাঁকে। ১২ জনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। পুলিশ আট জনকে গ্রেফতারও করে। চার জন পলাতক ছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আনোয়ারের খুনের মামলায় এখনও চার্জগঠনই হয়নি। মোর্তজা খুনের মামলাটি প্রথমে ছিল দুর্গাপুরের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে। কিন্তু কিছু দিন পরে অভিযুক্তেরা আবেদন করায় মামলা জেলা আদালতে সরানো হয়। সেখানে দু’জনের গোপন জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল। মূল সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়েছিল বুদবুদের তৎকালীন ওসি-কেও। তবে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে ২০০৯ সালের ২৫ অগস্ট অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করে আদালত।
কয়েক মাসের মধ্যে বাড়ির দুই সদস্য খুন হয়ে গেলেও তাই এখনও কেউ সাজা পায়নি। এই আক্ষেপ শোনা যায় আনোয়ারের ছেলে হবিবুল চৌধুরীর গলায়। তাঁর কথায়, ‘‘আমার বাবা সিপিএমের সমর্থক হলেও সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কেন তাঁকে ও ভাবে খুন করা হল, আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।’’ আনোয়ার খুনের মামলা তোলার জন্য তাঁদের উপরে নানা ভাবে চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও বাড়ির লোকজনের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, কখনও হুমকি দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও টাকার লোভ দেখানো হয়েছে। পরিবারের আরও দাবি, মোর্তজা খুনের মামলায় জেলা আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু মামলা চালানোর জন্য যে টাকা দরকার তা তাঁদের নেই। সে জন্য মামলার অগ্রগতি হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই দুই খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের অনেকে পরে সিপিআই (এমএল) ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছে। সেই অভিযুক্তেরা অবশ্য এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ তৃণমূলের স্থানীয় নেতারাও।