West Bengal SIR

দু’বছর পরে আতঙ্ক ফিরল বিশাখাদের

জামালপুরের জৌগ্রামের পদ্মপুকুর গ্রামের পাশ দিয়ে গিয়েছে সেচখাল। পাকা রাস্তা থেকে বিশাখাদের পাড়ায় পৌঁছতে ভরসা মাটির পথ।

সৌমেন দত্ত

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০০:০১
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

গাছের ফাঁক দিয়ে একফালি রোদ এসে পড়ছে মাটিতে। সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন বিশাখা মণ্ডল। কথা বলার ফাঁকে চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে বললেন, “অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে এক রাতেই স্বামী ও কোলের শিশুকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলাম। শুধু আমি নয়, গ্রামের অনেকেই পালিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এত এখানে বাস করার পরে এই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, ভাবিনি!”

জামালপুরের জৌগ্রামের পদ্মপুকুর গ্রামের পাশ দিয়ে গিয়েছে সেচখাল। পাকা রাস্তা থেকে বিশাখাদের পাড়ায় পৌঁছতে ভরসা মাটির পথ। তাঁর স্বামী স্বপন ও ছেলে সাধন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে ডাব বিক্রি করেন। বছর দুয়েক আগে আধার নিষ্ক্রিয় হওয়ার চিঠি পেয়েছিলেন বিশাখারা। তার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাশে থাকার বার্তা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এসআইআরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যেতে, আবার তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। মুখ্যমন্ত্রী সেই চিঠি, আধার কার্ড-সহ নানা নথি হাতে নিয়ে বিশাখা বলেন, “এ সব কি মিথ্যে হয়ে গেল? কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের পাশে থাকবে বলেছিল। তারই বা কী হল? আবার কী দেশান্তর হতে হবে?”

এখানকার বাসিন্দা শম্ভু তালুকদার ১৯৯৩ সালে জমি কিনে তিন কামরার একতলা বাড়ি করেন। শম্ভু ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা কলকাতায় বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। তাঁদের ছেলে সুরজিতের কথায়, “আধার কার্ড বাতিলের চিঠি এসেছিল। সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া আটকাতে পারলাম কোথায়?” কল্পনার কথায়, ‘‘এত আতঙ্ক আর ভয় নিয়ে কী থাকা যায়? আমাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে না তো?”

পদ্মপুকুর থেকে এক্সপ্রেসওয়ের আন্ডারপাস পেরিয়ে কিছুটা দূরে কোলেপুর। সাড়ে তিন বছরের ছেলে কোলে নিয়ে মমতা মিস্ত্রি বলছিলেন, “আধার কার্ড বাতিল হওয়া আটকে যাওয়ার পরে, মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া চিঠি যত্ন করে রেখেছিলাম। সব নথি দেওয়ার পরেও কেন ভোটার তালিকায় নাম উঠল না, বুঝতে পারছি না!” বছর দুই আগে জামালপুরের জৌগ্রামের তেলে, নুড়ি, কলিপুকুর, বাদপুকুর ও পদ্মপুকুরের মতো আবুঝহাটি ১ পঞ্চায়েতের যুথিহাটিতেও অনেকের কাছে আধার কার্ড বাতিলের চিঠি এসেছিল। শুক্রবার রাতে নবম অতিরিক্ত ভোটার তালিকায় দেখা যাচ্ছে, সেই বাসিন্দাদের মধ্যেই অনেকের নাম বাদ পড়েছে। তাঁদেরই এক জন মমতা অধিকারী বলেন, “আমার কাছে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের সঙ্গে এ দেশের পাসপোর্টও রয়েছে। তার পরেও নাম বাদ চলে গিয়েছে। কেন গেল, উত্তর কেউ দিচ্ছে না!” পাশে দাঁড়ানো সুষমা হাওলাদারের কথায়, “বাঁচার তাগিদে আমরা এক কাপড়ে রাতারাতি চলে এসেছিলাম। নানা জেলা ঘুরে জামালপুরে এসেছি। আমরা কী ভাবে প্রয়োজনীয় কাগজ দেব? তা হলে কী আমাদের ফের দেশছাড়া হতে হবে?” সিএএ-তে আবেদন করলেন না কেন? পদ্মপুকুরের বিবেকানন্দ বিশ্বাস বলেন, “আমাদের পাশেই সংখ্যালঘু প্রধান পাড়া। সেখানে কয়েক পুরুষের বাস, এমন বাসিন্দাদের নামও তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। সিএএ-তে আবেদন করলেই শংসাপত্র মিলবে, এমন নিশ্চয়তা আছে কি? বরং আবেদন করলে তো ভিন্-দেশি বলেই প্রমাণ হয়ে যাবে।”

তেলে গ্রামের লিপিরানি মল্লিকও আধার কার্ড নিষ্ক্রিয় হওয়ার চিঠি পেয়েছিলেন। এ বার তিনি ভোটার তালিকা থেকে বাদ। তাঁর কথায়, “গ্যাসের অভাবে ইট পেতে কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। গ্যাস সিলিন্ডার স্বাভাবিক সরবরাহ করা সরকারের দায়িত্ব। তা করতে পারছে না। উল্টে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে ব্যস্ত!’’ তাঁর ভাইঝি তন্বী কীর্তনিয়া প্রামাণিকের কথায়, ‘‘স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লাম। সব মিথ্যা হয়ে যাবে? এতটাই কি সহজ? আমরা কি এতটাই ফেলনা!’’

যাঁদের কাছে এর জবাব চাইবেন, তাঁরা এখন ভোটে ব্যস্ত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন