কলেজে চলছে ছাত্রছাত্রীদের ঘেরাও। নিজস্ব চিত্র।
অশান্তি থামছেই না রাজ কলেজে।
মঙ্গলবার জনা চল্লিশেক ছাত্রছাত্রী দুপুর ১২টা থেকে পৌনে সাতটা পর্যন্ত কলেজের পরিকাঠামো সংক্রান্ত দাবিদাওয়া নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অশিক্ষক কর্মচারীদের ঘেরাও করে রাখেন। পরে প্রশাসন ও তৃণমূলের কাউন্সিলরের হাজিরায় ঘেরাও ওঠে। সন্ধ্যায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা নিরুপমা গোস্বামী আন্দোলনকারীদের নামে এফআইআরও করেছেন।
মাস কয়েক আগেই তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তারকেশ্বর মণ্ডলের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি, শিক্ষিক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, তোলা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে অন্য অধ্যক্ষ নিবার্চনও হয়। কিন্তু কলেজে শান্তি ফেরেনি। কখনও ছাত্রছাত্রীদের নানা দাবিদাওয়া, কখনও অশিক্ষক কর্মচারীদের বিক্ষোভ চলছেই।
এ দিন কলেজের অফিসঘরের কোলাপ্সিববল গেটের সামনে পোস্টার হাতে ঘেরাও শুরু করে ছাত্রছাত্রীরা। আটকে রাখা হয় নিরুপমাদেবী, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষিকা নুপূর নাগ ও জনা পনেরো শিক্ষাকর্মীকে। ঘেরাওকারীরা নিরুপমাদেবীর পদত্যাগ দাবি করে। তাঁদের অভিযোগ, কলেজের মাঠ জঙ্গলে ভর্তি, ছাত্রীদের জন্য হস্টেল তৈরি হলেও চালু হয়নি, কমনরুম সংস্কার করতে হবে। প্রথমে দাবিপত্র না দিলেও পরে সই ছাড়া একটি দাবিপত্র দেয় তারা।
তবে শিক্ষকদের একাংশের দাবি, পড়ুয়াদের অভিযোগগুলি দীর্ঘদিনের। নিরুপমাদেবী দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এই সমস্যাগুলি রয়েছে। কোনও এক জন শিক্ষকের মদতে এগুলি চলছে বলেও তাঁদের ধারনা। তাঁরা জানান, এ দিন যারা ঘেরাও করেছে এতদিন ছাত্র সংসদের সঙ্গে জড়িত সেই টিএমসিপি ছাত্রদের ভয়েই কার্যত সিঁটিয়ে থাকতেন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা। কিছুদিন আগে একই রকম ভাবে কলেজের অশিক্ষক কর্মচারীরা আন্দোলন করেন। তার পিছনেও কোনও এক শিক্ষকের মদত রয়েছে বলে তাঁদের দাবি। যদিও টিএমসিপি নেতাদের দাবি, ছাত্র সংসদই নেই ওই কলেজে। আন্দোলন সাধারণ পড়ুয়ারা করেছে।
কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, বিক্ষোভ বিকেল ছাড়ানোয় নিরুপমাদেবী বিষয়টি ফোন করে কলেজ পরিচালন সদ্য দায়িত্ব নেওয়া জেলাশাসক সৌমিত্র মোহন ও তৃণমূলের বিভিন্ন নেতাকে জানান। টিএমসিপি-র রাজ্য সভানেত্রী জয়া দত্ত নিরুপমাদেবীকে ফোন করে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি। বিকেলের পরে জেলাশাসক ঐতিহ্যবাহী কলেজে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে তৃণমূলের কাউন্সিলর খোকন দাসকে ফোন করেন। ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি কল্পতরু মাঠের বৈঠক ছেড়ে খোকনবাবু কলেজে আসেন। বাইরে তখন বর্ধমান থানার পুলিশ দাঁড়িয়ে। খোকন দাস পড়ুয়াদের বলেন, ‘‘কার মদতে এ সব হচ্ছে আমরা জানি। কলেজের শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট করা যাবে না। কোনও দাবিদাওয়া ছাড়া এ ভাবে ঘেরাও করে রাখলে আমি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে বাধ্য হব।’’ এরপরেই ছাত্রছাত্রীরা গুটি গটি পায়ে কলেজ চত্বর ছাড়ে। তবে টিএমসিপি ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ সিংহ (রাহুল) বলেন, ‘‘কলেজে যে দুর্নীতি চলছে, কথায়-কথায় পুলিশ ডাকা হচ্ছে তারই প্রতিবাদ করেছি। সাধারণ পড়ুয়া হিসেবে আমরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি করেছি। আমাদের দাবি মানার আশ্বাস পেয়েই আন্দোন তুলেছি। না হলে আরও বৃহত্তর আন্দোলন করা হবে।’’
ঘেরাও ওঠার পরে বর্ধমান সদর (উত্তর) মহকুমাশাসক মুফতি মহম্মদ শামিম, আইসি ও নিরুপমাদেবীর মধ্যে একটি বৈঠক হয়। ঘেরাওকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন নিরুপমাদেবী। জেলাশাসক বলেন, ‘‘এসডিওকে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পরে বলতে পারব।’’ নিরুপমাদেবী বলেন, ‘‘কেউ কেউ ইন্ধন দিয়ে কলেজের পরিবেশ নষ্ট করতে চাইছেন। কিন্তু উপর থেকে নীচ, সবাই চাইছেন, কলেজের ঐতিহ্য রক্ষা করতে। আমরাও তা করতে বদ্ধপরিকর।’’
আর যাঁর মদতে এই গোলমাল বলে অভিযোগ সেই তারকেশ্বর মণ্ডল বলেন, ‘‘কলেজে কি হচ্ছে আমি বলতে পারব না। আমি কলেজে যাই, পড়াই বাড়ি চলে আসি।’’